কৃপা কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ

শ্যামপুকুর বাটীতে সকাল। কলকাতার শীতের সকাল যেমন হয়। ঘিঞ্জি এলাকা।
গায়ে গায়ে বাড়ি। খোলা উনুনের ধোঁয়া ভারী বাতাসের সঙ্গে জড়িয়ে আচ্ছাদনীর
মতো ঝুলে আছে। ম্যাটম্যাটে রোদ। পল্লীর জেগে ওঠার মিলিত মিশ্রিত যাবতীয়
শব্দ। বারান্দায় কাকের কর্কশ চিৎকার। শ্রীরামকৃষ্ণ বিছানায় উঠে বসেছেন। কণ্ঠক্ষতের
চিকিৎসার জন্যে ঠাকুর দক্ষিণেশ্বর থেকে শ্যামপুকুর বাটীতে এসে উঠেছেন। বাড়ির
মালিক গোকুলচন্দ্র ভট্টাচার্য।ঠিকানা: ৫৫, শ্যামপুকুর স্ট্রিট। ঠাকুরের অন্তরঙ্গ ভক্তরাই
বাড়িটি ঠিক করেছেন।শ্যামপুকুর স্ট্রিট শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচিত। এই রাস্তায় তাঁর অনেক
ভক্ত থাকেন। নেপালের রাজপ্রতিনিধি বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, ঠাকুর যাঁকে কাপ্তেন বলে
সম্বোধন করেন। প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, ঠাকুরের মোটা বামুন। কালীপদ ঘোষ,
গিরিশচন্দ্রের অন্তরঙ্গ, ঠাকুরের বিশেষ কৃপাধন্য। নরেন্দ্রনাথ তাঁকে ‘দানা’বলে ডাকেন,
সেইজন্যে রামকৃষ্ণমণ্ডলীতে তিনি ‘দানাকালী’। সুগায়ক, বেহালা এবং বংশীবাদক।
এর বাঁশী শুনে ঠাকুর সমাধিস্থ হয়েছিলেন। এই ভাঙাবাড়ির দেখা-শোনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
রাখার, সাজানো গোছানোর যাবতীয় দায়িত্ব দানাকালীর। অদূরেই তাঁর বাড়ি, ২০,
শ্যামপুকুর লেন। এই সব ভক্তদের বাড়িতে ঠাকুর একাধিবার এসেছেন।
ঠাকুর তাকিয়ে আছেন দেয়ালে টাঙানো নানা ছবির মধ্যে বিশেষ একটি ছবির
দিকে-যশোদা ও বালগোপাল। পাশেই আর একটি ছবি-মনোরম সংকীর্তনের দৃশ্য।
যেদিন বলরামবাবুর বাড়ি ছেড়ে সন্ধ্যার সময় এই বাড়িতে এলেন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর
১৮৮৫, সেদিন ভক্ত রামচন্দ্র দত্ত লণ্ঠন তুলে তুলে ছবি দেখাচ্ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন
বাদুড়বাগানের নবগোপাল ঘোষ। তিনি বলেছিলেন, ‘ছবিতে আপনি আপনাকেই
দেখছেন।’ নবগোপাল ঠাকুরের মধ্যে শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করেছিলেন। ছবিটির দিকে
তাকিয়ে আছেন ঠাকুর। বাদুড়বাগানের স্মৃতি ভেসে আসছে। নবগোপালের বাড়ির
উঠনে সে কী নৃত্যগীত। ঠাকুর তাকিয়ে আছেন, ভাবছেন, কোথায় দক্ষিণেশ্বর আর

কোথায় উদ্যানবাটীর পরিবর্ত এই শ্যামপুকুর বাটা। শীত, শীত, ভিজে, ভিজে বদ্ধ
একটা পরিবেশ। ভাবছেন, সারদার জীবনে মা সাংসারিক শান্তি আর দিলেন না! এই
তো ছাতে ওঠার সিঁড়ি, ছাতের দরজার পাশে চাব হাত মতো আচ্ছাদিত চাতাল,
সেইখানে ভোর তিনটে থেকে রাত এগারোটা। রাত দুটোয উঠে স্নান, শৌচ সাবে;
কারণ একটি মাত্র শৌচালয়। ভক্ত সেবক অনেক। ঠাকুব সকালে আহার করেন,
ভাতের মণ্ড, ঝোল আর দুধ। সন্ধ্যায় দুধ আর যবেব মণ্ড। সবই তরল। মা সারাদিন
ওই জায়গাটিতে বসে এই সব পথ্য তৈবি করেন। অবসবে ধ্যান-জপ। সাহায্য কবেন
ভক্তিমতী সেবিকা গোলাপ-মা। দোতলাব পশ্চিম প্রান্তে ছোট্ট একটি ঘর মায়ের জন্যে
নির্দিষ্ট আছে। সেই ঘরে আসতে আসতে রাত এগারোটা। এত ভক্তের আসা-যাওয়া,
ডাক্তার-বদ্যি। কেউ জানেন না-মা কোথায়! তিনি অন্তরীক্ষে।
বেলা বাডল। গলার ক্ষতও বাড়ছে। মাঝে হোমিওপ্যাথিক ওষুধে কিছু ভাল ফল
পাওয়া গিয়েছিল। কলকাতার বিশিষ্ট কবিরাজবৃন্দ, গঙ্গাপ্রসাদ, গোপীমোহন, দ্বাবিকানাথ,
নবগোপাল আগেই রোগপরীক্ষা করে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কবিরাজীশাস্ত্রে এই ব্যাধিব
নাম রোহিণী, অর্থাৎ ক্যানসার। দৃশ্চিকিৎস্য। এখন দেখছেন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল
সরকার। তিনি ঠাকুরের নাড়ি পরীক্ষা করছেন। হাত ছেডে দিয়ে বললেন, ‘বাডল
কেন? কাল আবার রক্ত পড়েছে? তাহলে ক্ষত ক্রমশই বাড়ছে। ওষুধটা ধরেও ধবল
না! মনে হয় খাওয়াব কোনো অনিয়ম হয়েছে। ঝোল খাও?’
ঠাকুর বললেন, ‘ওই, যতটুকু গলা দিয়ে নামে।’
‘আচ্ছা বল তো, ঝোলে কি কি আনাজ পড়ছে?’
‘ওই তো, আলু, কাঁচকলা, বেগুন, দু এক টুকরো ফুলকপি!’
ডাক্তার সরকার আঁতকে উঠষলন, ‘অ্যাঁ-ফুলকপি খেয়েছ? ঠিক ধবেছি, খাওয়াব
অত্যাচার! ফুলকপি বিষম গরম, দুষ্পাচ্য! ক টুকরো খেয়েছ?’
ঠাকুর অপরাধী বালকের মতো মুখ করে বললেন, ‘একটুকরোও তো খাইনি,
তবে ঝোলে ছিল।’
ডাক্তার বললেন, ‘খাও আর নাই খাও, ঝোলে ওর সত্ত্ব তো ছিল-সেই জন্যেই
তোমার হজমের ব্যাঘাত হল, ব্যারামটা হঠাৎ বেড়ে গেল।’
ঠাকুর আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘সে কি গো! কপি খেলুম না, পেটের অসুখও হল
না, ঝোলে সামান্য একটু কপির রসের জন্যে ব্যারাম বেড়ে গেল! অবাক কথা,।
মানতে পারছি না।’
ডাক্তার বললেন, ‘ওই একটুতেই যে কত অপকার করতে পারে, তোমার ধারণা
নেই। আমার জীবনের একটা ঘটনা তাহলে শোনো। শুনলে বুঝতে পারবে। আমার
হজমশক্তিটা বরাবরই কম; মাঝে মাঝেই অজীর্ণে খুব ভুগতে হত; সেইজন্যে খাদ্য
সম্পর্কে আমি খুব সতর্ক। একটা নিয়ম মেনে চলি। দোকানের কোন জিনিস খাই

না। ঘি, তেল পর্যন্ত বাড়িতে করিয়ে নি। তবু একবার খুব সর্দি থেকে ব্রন্কাইটিস
হয়ে গেল, কিছুতেই সারতে চায় না। তখন মনে হল, নিশ্চিত খাবারে কোনো দোষ
হচ্ছে। সন্ধান করে কোনো দোষই খুঁজে পেলুম না। তারপর হঠাৎ একদিন চোখে
পড়ল, যে গরুটার দুধ খাই, সেই গরুটাকে কাজের লোক কতগুলো মাষকড়াই
খাওয়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানলুম, কোথা থেকে কয়েক মন ওই কড়াই পাওয়া
গিয়েছিল, সর্দির ভয়ে কেউ খেতে চায় না বলে কিছুদিন ধরে গরুকে খাওয়ানো হচ্ছে।
তখন দিন হিসেব করে পেলুম, যবে থেকে গরু মাষকড়াই খাচ্ছে, প্রায় সেই সময়
থেকেই আমাকে সর্দিতে ধরেছে। বন্ধ কর, বন্ধ কর। কড়াই খাওয়ানো বন্ধ করার
কয়েকদিন পরেই আমার সর্দি কমতে লাগল। অনেক দিন ভুগলুম। বায়ু পরিবর্তনে
হাজার পাঁচেক গেল। কি থেকে কি হয় বুঝলে তো!’
ঠাকুর খুব আনন্দ পেয়েছেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘ও বাবা, এ যে দেখছি
ওই তেঁতুলতলা দিয়ে গিয়েছিল বলে অম্বল হল, প্রায় সেইরকম।’
ঘরে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সবাই হাসছেন। বোঝার উপায় নেই অসুখ না উৎসব।
ওই যেমন বলে দিয়েছেন, রোগ জানুক আর দেহ জানুক। থাক শালার দেহ একা
প৬ে। মন তুই পালিযে আয় ভ্রমরের মতো মজে থাক শ্যামাপদ নীলকমলে। যেমন
বলেছিলেন, ‘থাক শালার ‘আমি’ দাস ‘আমি’ হয়ে।
ডাক্তাব চিন্তিত মুখে বললেন, ‘শুধু ওষুধ নয়, ওষুধ, পথ্য, পরিবেশ-ট্রিনিটি।
পরিবেশ পালটাতে হবে। এখানে চিকিৎসা হবে না। খোলামেলা, আলো ঝলমলে,
পরিচ্ছন্ন পরিবেশ চাই। দক্ষিণেশ্বরে যাঁর এত বছর কেটেছে, তাঁর পক্ষে এই জায়গা
আবোগ্যের প্রতিকূল। হবে না। দিস প্লেস ইজ আনসুটেবল! একটা বাগান বাড়ির
চেষ্ট। করো!’ কথা শেষ করে ঠাকুরের মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে
হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘বেশ আছ পরমহংস! রোগ জানুক আর দেহ জানুক!
এদিকে ভেবে ভেবে আমাদের রাতের ঘুম চলে গেল। শোনো, তুমি খুব দুর্বল হয়ে
পড়েছ। শবীরে রক্ত কমে গেছে। খাবো না বললে হবে না, তোমাকে কচি পাঁঠার
সুরুয়া খেতে হবে। আমি এখন যাচ্ছি, আবার আসব’ তোমার প্রেমে পড়ে গেছি
পরমহংস। মহেন্দ্র সরকারের এই রকম কখনো হয়নি!’
সুপুরুষ সায়েবি মেজাজের কট্টর যুক্তিবাদী ডাক্তার সরকার চলে গেলেন। নরেন্দ্রনাথ
ঠাকুরকে তরল পথ্য একটু একটু করে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। গিলতে পারছেন না। অতি
কষ্টে একটু! কপালে ঘাম ফুটে গেছে। ডাক্তার একদৃষ্টে দেখছিলেন! তাঁর মতো
কঠিন মানুষের মুখেও বেদনার ছায়া। তিনি চলে যাওয়ার পর নরেন্দ্রনাথ বললেন,
‘ডাক্তার খুব লোক।’
ঠাকুর বললেন, ‘খু-উব’!
গৃহী ভক্ত, মুরুব্বি মানুষ, রামচন্দ্র দত্ত মশাই এতক্ষণ দূরে বসেছিলেন, কাছে

এসে বললেন, ‘ডাক্তার সরকার তো বলে গেলেন, এবার তাহলে আপনার জন্যে
কলকাতার বাইরে একটা বাগানবাড়ি দেখি?’
ঠাকুর বললেন, ‘হ্যাঁ, এখানে হজম খিদে কিচ্ছু হচ্ছে না।’
রামবাবু মনে মনে ভাবছেন, শুধু বাড়ি নয়, বাগানবাড়ি। এমন বাড়ি কোথায়
মিলবে। বাগানবাড়ির মালিকরা অবশ্যই বড়লোক। শখের বাগানবাড়ি কোন দুঃখে
ভাড়া দিতে যাবে। রাম দত্ত মশাই হাত জোড় করে ঠাকুরকেই জিজ্ঞেস করলেন,
‘আজ্ঞে, বাড়ি কোন অঞ্চলে অনুসন্ধান করব?
ঠাকুর ঈষৎ হেসে বললেন, ‘আমি কি জানি? সে তো তোমরাই জানবে!’
রামবাবু মনে মনে বললেন, প্রভু! আমাদের সঙ্গে এখনও আপনার এইভাব!
বলে দিন কোন্দিকে যাব।সব জানেন আপনি। অনর্থক ঘুরিয়ে মারবেন না। প্রকাশ্যে
যা বললেন, ‘কাশীপুর, কি বরাহনগর অঞ্চলে চেষ্টা করব?’
ঠাকুর ইঙ্গিতে জানালেন, করো।
অঘ্রাণ শেষ হতে চলল, যা করার এই মাসেই করতে হবে। পৌষে ঠাকুর বাড়ি
বদলাতে চাইবেন না। ঠাকুরের আর এক পরমভক্ত মহিমাচরণ চক্রবর্তী। ছোট-খাটো
জমিদার। কাশীপুরে তাঁর বাড়ি। বেদান্তবাদী। বড় মজার মানুষ। নিজেকে অতিরিক্ত
জাহির করার দোষে হাস্যাস্পদ হতেন পদে পদে। ছেলের নাম রেখেছেন মৃগাঙ্ক-মৌলি
পুততুন্ডী। বাড়িতে একটা হরিণ আছে, তার নাম কপিঞ্জল। তাঁর দীক্ষাগুরুর নাম,
আগমাচার্য ডমরুবল্লভ। তিনি একতারা বাজিয়ে প্রণবোচ্চারণ, ওঁ, ওঁ করেন, মাঝে
মাঝে হুঙ্কারধ্বনি। কুলকুণ্ডলিনী জাগছে। বাড়িতে প্রতিষ্ঠিতা দেবী শ্রীশ্রীঅন্নপূর্ণা।
‘জগদ্ধাত্রী পূজাও হত। তিনি একটি ঘোড়ায়টানা গাড়িতে, যাকে ইংলন্ডে বলে ‘বগি’
চেপে যাতায়াত করতেন। সেই সময় অনবরত চিৎকার করতেন, ‘তারা তত্ত্বমসি, ত্বমসি
তৎ’। তাঁর একটি বাঘছাল ছিল। সেইটি পথশ্বটীতে বিছিয়ে গলায় বড় বড় রুদ্রাক্ষের
মালা ঝুলিয়ে, গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করে, হাতে একতারা নিয়ে সাড়ম্বরে সাধনায়
বসতেন। সুন্দর কান্তি, বিশাল বপু, চোখে না পড়ে উপায় নেই। সাধন শেষে ব্যাঘ্রাজিনটি
ঠাকুরের ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে চলে যেতেন। ঠাকুর তাঁকে এক আঁচড়েই
চিনে ফেলেছিলেন। কারণ ‘ওই বাঘের ছালটা কার’ একদিন ঠাকুরের এক অন্তরঙ্গ
ভক্ত প্রশ্ন করেছিলেন। ঠাকুর বলেছিলেন ‘ওটা মহিম চক্রবর্তীর। রেখে গেছে, কেন
জান? লোকে দেখে জিজ্ঞেস করবে ‘ওটা কার’ তখন আমি তার নাম করলে ধারণা
হবে মহিম চক্রবর্তী এক মস্ত সাধক।’ রাম দত্ত মশাই এই মহিমবাবুর যোগাযোগ
কাশীপুরের মতিঝিলের উত্তরে কাশীপুর রোডের ওপর রানী কাত্যায়নীর জামাই
গোপালচন্দ্র ঘোষের বাগানবাড়িটি ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় পেয়ে গেলেন। এগার
বিঘা চারকাঠার কিছু বেশি জমির ওপর এই উদ্যানবাটী। দুটি পুকুর। উত্তর-পূর্ব ধারেরটি
বিশাল। স্বচ্ছ টলটলে জল। প্রশস্ত শান বাঁধানো ঘাট। পশ্চিমেরটি একটু ছোট। দুটি

পুকুরের মাঝে প্রায় গোলাকার ইট বাঁধান পথ। অতিসুন্দর উদ্যান ঘেরা দোতলা একটি
বাড়ি। নিচে চারখানি, ওপরে দুখানি ঘর। দোতলায় রেলিংঘেরা স্বল্প পরিসর সুন্দর
একটি ছাত। দোতলায় ওঠার ঝকঝকে কাঠের সিঁড়ি।
প্রথমে ঠাকুর আঁতকে উঠেছিলেন, ‘বলো কি? মাসে আশি টাকা! আমার জন্যে
আশি টাকার বাডিতে কাজ নেই বাপু! যা থাকে বরাতে, দক্ষিণেশ্বরেই বরং ফিরে
যাই!’ শ্যামপুকুবে অবস্থানের আজ শেষ দিন। ১০ ডিসেম্বব, ১৮৮৫। শ্রীশ্রীঠাকুবের
শ্যামপুকুর-লীলার এই শেষ সন্ধ্যা। ঘরে ঠাকুরের প্রবীণ ভক্তদের অনেকেই ছিলেন।
তাঁরা বোঝাবার চেষ্টা করলেন, টাকাব ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। ঠাকুর বললেন, ‘একটি
শর্তে আমি যেতে পারি যদি ওই আশি টাকা ভাডার পূর্ণ দায়িত্ব সুরেন্দ্র নেয়।
সুরেন্দ্রনাথ মিত্র, ডস্ট কোম্পানিব মুৎসুদ্দি। সিমুলিয়ায় বাড়ি। ধনী মানুষ। ঠাকুরের
পরমভক্ত। তিনিই প্রথম দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের জন্মদিন পালন অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা।
শ্রীরামকৃষ্ণকে তিনি ‘গুরু’ রূপে বরণ করেছেন। সুরেন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে রাজি।
তিনি অঙ্গীকার পত্র সই করে দিলেন। আপাতত ছমাসের জন্যে বাডিটি ভাড়া নেওয়া
হল। সুরেন্দ্রনাথকে কাছে ডেকে ঠাকুর ফিসফিস করে বললেন, ‘দেখ সুরেন্দর, এরা
সব কেরানী-মেরানী ছাপোষা লোক, এরা এতটাকা চাঁদা তুলতে পারবে কেন, এ
বেশ ভাল হল। তুমি দাযিত্ব নিলে। দেখ সুরেন্দর থাকাই বলো আর খাওয়াই বলো
চাঁদা করে হচ্ছে শুনলে আমি আঁতকে উঠি। কখনো তেমন ব্যবস্থায় মা আমাকে
ফেলেননি। তবে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে মথুর চলে যাওয়ার পর অনেকটা চাঁদার
মতোই হল বটে। জমিদারি নানা শরিকে টুকরো হল। মন্দিরে মায়ের সেবার পালা
পড়তে লাগল। কিন্তু ওই চাঁদা ব্যবস্থায় আমি ঠিক ঠিক পড়িনি। রাসমণির বন্দোবস্তে
আমার জন্যে মাসকাবারি সাতটাকা বন্দোবস্ত আছে, আর যতদিন থাকব মায়ের মন্দিরের
প্রসাদ আমাকে দেওয়া হবে। এটাকে তুমি পেন্সান বলতে পার। তাই শ্যামপুকুরে
আসার সময় বলরামকে ডেকে বলেছিলুম, তুমি আমার খাবার খরচা দেবে। চাঁদায়
আমি খেতে পারব না।’
সুরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘ও-সব আপনি একদম ভাববেন না। ভাবনা আমাদের।
আপনার কাজ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠা।’
গিরিশচন্দ্র এক পাশে নীরবে বসেছিলেন। তিনি সহসা বললেন, ‘আপনি মাঝে
মাঝে কি যে দেখান! আমি কি বুঝতে পারছি না ভাবছেন? আপনি ইচ্ছা করলেই
রোগ সেরে যায়-আর আমি ভুলছি না।’ ঠাকুর তাকালেন, হাসলেন। গিরিশবাবু বিদায়
নিয়ে চলে গেলেন। থিয়েটার আছে।
ঠাকুর দেবেন্দ্রনাথকে বললেন, ‘বিশ্বাসটা একবার দেখেছো!’
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের অদ্ভুত পরিবর্তন। তিনি বসে আছেন। মনে মনে
স্তবপাঠ করছেন। ঠাকুর দেবেন্দ্রনাথের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতে ডাক্তারকে দেখিয়ে মৃদুমৃদু

হাসছেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরম ভক্ত। উপাধি মজুমদার। গীতিকার। সুন্দর গান
রচনা করেন। ঠাকুর এইবার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু ভাল দেখছো?’
ডাক্তার সরকার বললেন, ‘বলতে ভয় হয়-এখুনি হয়ত কিছু রোগ দেখাবেন।’
ঠাকুর আজ অপেক্ষাকৃত ভাল আছেন। ভাল থাকলেও একজন জানেন, সময়
আসন্ন। তিনি, শ্রীশ্রীমা। তিনতলার চাতালে পথ্য তৈরিতে ব্যস্ত। সমস্ত ইঙ্গিত মিলে
যাচ্ছে। ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সারদা! যখন দেখবে, আমি যার তার হাতে খাচ্ছি,
কলকাতায় রাত্রিবাস করছি, নিজের খাবারের অগ্রভাগ অপরকে দিয়ে খাচ্ছি, আর
যখন দেখবে অধিক লোক একে দেবজ্ঞানে মানছে, শ্রদ্ধাভক্তি করছে তখন জানবে
এর অন্তর্ধানের সময় হয়ে এসেছে।’ সব মিলে যাচ্ছে।
দুই
১১ ডিসেম্বর ১৮৮৫।শীতের কলকাতা। কদিন পরেই বড়দিন। সায়েব পাড়া, নেটিব
ক্রিশ্চান পাড়ায় সাজো সাজো রব। জাঁকালো শীত। কমলালেবুর মতো রোদ। বেলা
তিনটে নাগাদ শ্যামপুকুর স্ট্রিট থেকে দুটি ঘোড়ার গাড়ি বেরলো। প্রথমটিতে ভক্ত
সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ। দ্বিতীয়টিতে শ্রীশ্রীমা, মায়ের সঙ্গী ও জিনিসপত্র। ঠাকুর একবার
ফিরে তাকিয়ে দেখে নিলেন, ওই বাড়ি, ওই বারান্দা! আর না আর না। সত্তর দিনের
স্মৃতি পড়ে রইল ইতিহাসে। গাড়ি চলেছে দুলকি চালে, ঘোড়ার গাড়ির যেমন চলা
উচিত। এই পথে ঠাকুর সপার্ষদ কতবার আসা যাওয়া করেছেন এই মাস কয়েক
আগে। সুস্থ, সবল। আনন্দে, উল্লাসে উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ। সারা কলকাতাকে যিনি
আধ্যাত্মিক তরঙ্গে উদ্বেল করতেন, তিনি আজ শরীরে বড়ই দুর্বল। চলতে ফিরতে
কাঁপেন। গত তিন-চার মাস শরীর অতি সামান্যই খাদ্য গ্রহণ করতে পেরেছে! দেহ
যত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে মুখমণ্ডল তত উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর! ঠাকুর এদিকে,
ওদিকে তাকিয়ে দেখছেন। এই তো গিরিশের পাড়া! ওই তো বলরামের বাড়ি। ওই
তো ওইদিকটায় পশুপতি বোসের বাড়ি। শীতের দুপুর অপরাহ্ণে ঠেকেছে। দোকান-পাট
রাস্তাঘাট রোদের আকর্ষণে জমজমাট। ওই তো ওই বিবি বাজারের সেই দিশী মদের
দোকানটি। একদিন দক্ষিণেশ্বর থেকে কলকাতা আসার পথে এই দোকানের সামনে
কয়েকজন মানুষের মত্ততা দেখে ঠাকুর চলন্ত গাড়িতে দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন, একটি
পা পাদানিতে, উল্লাসে চিৎকার করছেন, ‘চালাও, চালাও, চালিয়ে যাও।’ যে ভাবেই
হোক, যে পথেই হোক দেহাতীত আনন্দে চলে যাও। এই জগৎ-স্রষ্টা ঈশ্বর স্বয়ং
সচ্চিদানন্দ। বাঁদিকের রাস্তাটি ঢুকে গেছে গঙ্গার দিকে। ওখানে আছেন, মা চিন্তেশ্বরী,
মা সর্বমঙ্গলা। ইতিহাসের পথ ধরে চলেছে আর দুটি ঐতিহাসিক গাড়ি। প্রথমটিতে
লীলাময় ভগবান, দ্বিতীয়টিতে লীলাময়ী ভগবতী। মানব লীলায় মেতেছেন। পেছনের

বগিতে মাতৃমূর্তি সারদা। ভবিষ্যৎ তিনি জেনে ফেলেছেন, তাই স্থির, প্রশান্ত অতি।

উদ্যানবাটীর লোহার ফটক পেরিয়ে গাড়ি প্রবেশ করছে। ক্যালেন্ডারে ১১ ডিসেম্বব ১৮৮৫, শুক্রবার। অস্তাচলে সূর্য। পঞ্চমীর ক্ষীণ চাঁদ আকাশে ওঠার সাজঘরে। প্রবেশমাত্রই ঠাকুর মহানন্দে বললেন, ‘বাঃ, বাঃ এই তো বেশ, এই তো বেশ।’ ঘোড়ার পা ঠোকার শব্দে দ্বিতীয় গাড়িটি থামল। ঠাকুরকে সাবধানে উত্তরণ করানো হল। সকলেই সাবধান। সুকোমল দেহের কোথাও যেন ধাতব আঘাত না লাগে। তিনি উত্তীর্ণ হয়ে উদ্যান নিরীক্ষণ করতে করতে বললেন, ‘দক্ষিণেশ্বরের মতো না হলেও, এ বেশ!’ হঠাৎ দুর্বল শরীর ভয়ঙ্কর সবল। এখন দেহ নয়, হাঁটছে মন। তর তর করে এগোচ্ছেন। পেছনে লোহার গেট ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে লৌহময় শব্দে। অস্তাচলে সূর্য। বন্ধ হয়ে রইল আটটি মাসের গাঢ় গূঢ় ভবিষ্যৎ, যুগান্তকারী উপাদানের সাজঘব! বসে গেল একটি অদৃশ্য সুউচ্চ ‘ট্র্যান্সমিশান টাওয়ার’, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মহাভাব তরঙ্গের’, যা পরবর্তীকালে হবে বেলুড়মঠের চূড়া।

1 সবাই এগোচ্ছেন উদ্যানমধ্যস্থ বাড়িটির দিকে। নিচে চারখানি ঘর। মাঝের ঘরটিকে হলঘর বলা চলে। ঠাকুর সপার্ষদ হলঘরে এসে বললেন, ‘বাঃ, বাঃ!’ সকলে তাঁকে চালিত করলেন দোতলায় ওঠার কাঠের সিঁডির দিকে। ঝকঝকে পালিশ। অতি মসৃণ! সবাই সাবধান। ধাপগুলি সামান্য উঁচু। ধীরে উঠছেন ঠাকুর। আনন্দোজ্জ্বল মূর্তি। এখানে মায়ের আর কোনো ভূমিকা নেই, ভক্তদের সেবায় শ্রীভগবান। দোতলায় তাঁর নির্দিষ্ট ঘরটিতে এসে ঠাকুর আরো খুশি। বেশ প্রশস্ত। পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ, তিনটি দিকই খোলা। পশ্চিমের দেয়াল অর্ধগোলাকার। ছাদ অনেক উঁচুতে। দক্ষিণে বেলিংঘেরা স্বল্প পরিসর ছাদ। ঠাকুর দ্রুতপদে সেই ছাদটির দিকে এগিয়ে গেলেন। চারপাশে উদ্যানের অপূর্বশোভা। অদূরে মতিঝিল। ঝিলের পশ্চিমে মতিলাল শীলের মনোরম বাগানবাড়ি। অদূরে, কিছু উত্তরে রানী কাত্যায়নীর গোপাল মন্দির। ঠাকুর বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে সব দেখছেন শীতের পড়ন্ত বেলার আলোয়। ‘ভারি খুশী হৈলা রায় দেখিয়া বাগান’। যাঁরা জানার তাঁরা জানেন, উদ্যানবাটীর দোতলার ‘হেডকোয়ার্টারে’ কোন আণবিক বোমা তৈরি হবে। ঠাকুরের এই আরোহণ দোতলায় নয়, ঊর্ধ্বে, আরো ঊর্ধ্বে। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীশ্রীমায়ের অন্তরঙ্গ মহল থেকে খবর এল, কয়েকজন মিষ্টান্নাদি নিয়ে ঠাকুরকে দর্শন করতে এসেছিলেন। যেই শুনলেন ঠাকুর নেই, চিকিৎসার জন্যে কাশীপুরে, তখন তাঁরা ঠাকুরের ছবির সামনেই ভোগ নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করলেন। শ্রীমার মনটা কেমন হয়ে গেল! আশঙ্কা, আতঙ্ক। এতে তো ঠাকুরেরই অকল্যাণ হল। ঠাকুরকে বললেন। তিনি সব শুনে বললেন, ‘ওরা মা কালীকে ভোগ নিবেদন না করে ছবিকে কেন দিলে?’ পরমুহূর্তেই অভয় দান করে বললেন, ‘ওগো! তোমরা কিছু ভেবো না-এর পর ঘরে ঘরে আমার পুজো হবে। মাইরি বলছি-বাপান্ত দিব্যি।’ মা শুনে চলে গেলেন, ‘বুঝেছি, বুঝেছি। তোমার খেলা! তুমি তার বাঁধছ!

দোতারা! গৃহী আর সন্ন্যাসী।’

নেতা নরেন্দ্রনাথ। তখন তাঁর সব গেছে। পিতা পরলোকে। উত্তরাধিকার, ঋণের বোঝা। জ্ঞাতি-শত্রুবা নরেন্দ্রনাথের পরিবারকে বাড়ি ছাড়া করেছে। নরেন্দ্র-জননী ভাই-বোনদের নিয়ে মাতামহী ভবনে কোনো রকমে আছেন। আদালতে মামলা চলছে। সামনেই তাঁব আইন পরীক্ষা। ইচ্ছে করলে নরেন্দ্রনাথ একজন নামকরা উকিল হতে পারতেন। একদিন এজলাসে মামলার শুনানি হচ্ছে। পিতা বিশ্বনাথের দুই বন্ধু নিমাইচন্দ্র বসু ও ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি নরেন্দ্রনাথদের পক্ষে মামলা পরিচালনার ভার নিয়েছেন। অপর পক্ষ পয়সার জোরে এক ইংরেজ ব্যারিস্টার নিয়োগ করেছেন। সেদিন ইংরেজ ব্যারিস্টার ঠিক করেছেন, নরেন্দ্রনাথকে জেরার সময় আদালতে এই প্রতিপন্ন কববেন, ‘যুবক এক গুঁয়ে, বামকৃষ্ণের খেয়ালী ছোকরা-নট নরম্যাল, বাট অ্যাবনরম্যাল।’ জজ সাহেব শুনছেন। ব্যারিস্টার বলছেন, ‘অ্যাবসলিউটলি আরোগ্যান্ট, হুইমজিক্যাল। হি ইজ এ বামকৃষ্ণ-চেলা। ক্যান ইউ ডিনাই?’ নরেন্দ্রনাথ এতটুকু ঘাবড়ালেন না। সংক্ষিপ্ত একটি পাল্টা প্রশ্ন কবলেন, “মহাশয়, আপনি ‘চেলা’ শব্দটির অর্থ জানেন কি?” সাহেব জানেন না। জেবা গোলমাল। সাহেব ‘ল্যাজে-গোবরে।’ ইংরেজ বিচারকের সপ্রশংস উক্তি, ‘যুবক, তুমি একজন ভাল উকিল হবে।’ ইংরেজ ব্যারিস্টার এজলাসের বাইরে এসে নরেন্দ্রনাথের করমর্দন করে বললেন, ‘আমি জজ সাহেবের সঙ্গে একমত, আইন-ব্যবসায়ই তোমার উপযুক্ত ক্ষেত্র। আমি তোমার মঙ্গল কামনা করি।’

চুলোয় যাক সব, আইন আদালত, পরীক্ষা। আমরা ‘রামকৃষ্ণের চেলা’। চলে আয় তোরাও। উদ্যানবাটী আমাদের সাধনক্ষেত্র। তাকিয়ে দেখ দোতলার ওই ঘরটির দিকে। খড়খড়ির জানলার পাখি ভেদ করে বেরিয়ে আসছে আলোর সমান্তরালরেখা। ওখানে মশারির ভেতর বসে আছেন ক্যানসারের ক্ষত নিয়ে মন্দিরের ভগবান নন, মানুষের ভগবান। স্বপ্নে, দক্ষিণেশ্বরের মা কালী এসেছিলেন। একপাশে তাঁর ঘাড়টি কাত। উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মা! তোমার কি হয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘তোর যা হয়েছে।’ মনে আছে তাঁর ওই গল্প-গার্ডসাহেবের, চৌকিদারের লণ্ঠন। সেই আলোর ফোকাসে অন্যের মুখ দেখা যায়। যাঁর আলো তাঁর মুখ দেখা যায় না। ওই সেই আলো। ওই আলোয় তিনি আমাদের মুখ দেখছেন, গৃহীদের মুখ দেখছেন, মায়ের কাছে যাঁরা আছেন সেই রমণীদের মুখ দেখছেন। চিরকালের পৃথিবীতে মানুষের তো এই তিন স্তর। এই উদ্যানবাটী সেই পৃথিবীরই একটি ল্যাবরেটারি সংস্করণ হতে চলেছে। ফেলে দে হুঁকো, গুটিয়ে ফেল সতরঞ্চি, পরে নে কৌপিন! সেবা আর সাধনা এক হয়ে যাক।

নীচের হলঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বড়ঘরটি সেবক-ভক্তদের বাসস্থান। নরেন্দ্রনাথ নাম রেখেছেন ‘দানাদের ঘর।’ নরেন্দ্রনাথের কথায় সবাই উঠে পড়লেন।

যাঁদের তন্দ্রামতো এসেছিল তাঁদের ঠেলে তোলা হল। সদলে বেরিয়ে এলেন বাগানে। শীতের গভীর রাত। ঠাণ্ডা যেন কামড়াতে আসছে। নিথর-নিস্তব্ধ চারপাশ। পৃথিবী যেন ধ্যানমগ্ন। পায়চারি করতে করতে গভীব, গম্ভীর গলায় নরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘দেহ রক্ষার সংকল্পই হয়তো করেছেন। এইবেলা যে যত সেবা আর সাধন ভজন করে নিতে পারিস করে নে।’

কয়েকদিন আগে বাগান পরিষ্কার করা হয়েছে। একপাশে শুকনো ডালপালার একটা স্তূপ। নরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘দে এতে আগুন ধরিয়ে।’ হাতে হুঁকোটি তখনো ধরা ছিল তাঁর। কয়েক টুকরো আগুন ফেলতেই দপ্ করে সব ধরে গেল। নরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘চারপাশে সব গোল হয়ে বোস। এই আমাদেব ধুনি। সাধুরা গভীর রাতে এই রকম ধুনি জ্বালিয়ে সাধনভজন করেন। ফেল, এই আগুনে ফেলে দে সুপ্ত কামনা বাসনা। সাধুর সম্বল, তীব্র বৈরাগ্য, বিশুদ্ধ জ্ঞান আর প্রেম!’ সারাটা রাত কোথা দিয়ে চলে গেল।

ঠাকুরও উঠে দাঁড়ালেন শয্যা ছেড়ে। পশ্চিমের ঝলমলে রোদ প্রজাপতির মতো ঘরে ভাসছে। আজ আমি অনেক সুস্থ। আজ পয়লা জানুয়ারি! ১৮৮৬। আমাকে সাজিয়ে দে। আজ আমি বাগানে নামবো। ছুটির দিন। ভক্ত সমাগমে উদ্যান আজ প্রাণোচ্ছল। বসে আছেন সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ন্ত রোদে। অনেকে বেড়াচ্ছেন জুটি বেঁধে। দানাদের ঘরে নরেন্দ্রাদি সন্ন্যাসীসম ভক্তরা রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি দূর করছেন।

বাহির উদ্যানের ভক্তরা হঠাৎ অবাক হয়ে দেখছেন, এ কী। ঠাকুর আসছেন। স্বয়ং ঠাকুর এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। অপূর্ব সাজ। সর্বশরীর বস্ত্রাবৃত। মাথায় সবুজ বনাতের কান-ঢাকা টুপি। মুখে অলৌকিক, অপূর্ব এক জ্যোতিঃ। নিচের হলে যাঁরা বসেছিলেন, তাঁরা ঠাকুরকে অনুসরণ করলেন। পশ্চিমের দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাগানে নেমে দক্ষিণদিকের ফটকের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন। উদ্যান। রোদ, ছায়া, উত্তুরে বাতাস। পশ্চিমে বৃক্ষতলে বসে আছেন, গিরিশচন্দ্র, রামচন্দ্র, অতুলচন্দ্র। তাঁরা প্রণাম করতে করতে এগিয়ে এলেন। ঠাকুর তখন সরাসরি গিরিশচন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন, ‘গিরিশ, তুমি যে সকলকে এত কথা বলে বেড়াও, তুমি কী দেখেছ, তুমি কী বুঝেছ?’ বিশ্বাসে অটল গিরিশচন্দ্র সরাসরি এই প্রশ্নে একটুকু বিচলিত হলেন। তিনি পদপ্রান্তে নতজানু। জোড়হস্ত। ঊর্ধ্বমুখ। রুদ্রকণ্ঠে প্রখ্যাত নট-নাটকার বললেন, ‘ব্যাস-বাল্মীকি যাঁর ইয়ত্তা করতে পারেননি আমি তাঁর সম্বন্ধে অধিক কী আর বলতে পারি!’

ঠাকুর ঘুরে দাঁড়ালেন। উদ্ভাসিত রূপ। এ পর্যন্ত কেউ দেখেনি ওরূপ! কোথায় অসুখ! জ্যোতির্ময়। সামনে ভক্তবৃন্দ। ঠাকুর তখন বললেন, ‘তোমাদের কি আর বলব আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হোক’। সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন ভাবের ঘরে। উদ্যান ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত স্থির যেন এক কল্পতরু। হুড়োহুড়ি লেগে গেল। প্রণামের পর প্রণাম। ক্রন্দন। প্রবাদোক্ত কল্পতরুর কাছে চাইতে হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরুর অযাচিত

কৃপা-নাও চৈতন্য, জ্ঞান, আনন্দ। ভবযন্ত্রণা দূরের অব্যর্থ ঔষধ-শ্রীরামকৃষ্ণ কৃপা। যেমন তিনি নেমেছিলেন, দিন শেষে ঠিক সেই ভাবেই উঠে গেলেন ওপরে, আরো ওপরে, আর নামলেন না কোনোদিন। সাতমাস পরে উদ্যানবাটীর ফটক খুলে তিনি বেরিয়ে এলেন ত্রিধারায় সৎগৃহী হযে, বিশ্ব কাঁপানো বীর সন্ন্যাসী হয়ে আর পৃথিবীর মতো সহিষ্ণুমাতা হয়ে!

আর জজসাহেব বলেছিলেন, যুবক তুমি ভাল উকিল হবে। হয়েছেন। বিশ্ব আদালতেব। সব কারাগার খুলে দিযেছেন একটি Verdict-এ পাপও নেই পুণ্য নেই আছে মানুষ। যত মানুষ তত স্বভাব! বিবেকই ধর্ম। জাগাতে চাও! চলে যাও-তিনি চিবপ্রতিষ্ঠিত-‘শ্রীরামকৃষ্ণ কৃপাকল্পতরু’। চলে যাও জগতের জননী সারদার কাছে-তিনি সতেরও মা, অসতেরও মা।

Leave a Comment