আমি থেকে তুমিতে যাব কী ভাবে! একটা সেতু তো চাই! ব্যবধান কী খুব দুস্তর!
না, এপাশ আব ওপাশ, কিন্তু সংসার নামক এক ভ্রান্তি আমাকে বোধ করাচ্ছে, বিশাল
এক পরিখা। গভীর জল, হাঙর আর কুমির কিলবিল করছে। সাঁতরে পার হব, সে
উপায় নেই। লাফ মারবো? যদি পড়ে যাই। সংসারীর আমি ভীতু। সংসারীর আমি
হল রেশমের গুটি। কামনা-বাসনার সিল্কের সুতো জড়িয়ে জড়িয়ে গুটি তৈরি করেছে।
কেটে বেরোতে পারে, বেরোবে না। এই দিক্টা নিশ্চিত ও-দিকটা অনিশ্চিত। এ দিকের
ছকটা চেনা, জন্ম, মৃত্যু, দুঃখ, বেদনা, বিরহ,আসা, যাওয়া, ভোগ, দুর্ভোগ। চেনা দুঃখ,
অচেনা সুখের চেয়ে ভালো। চেনা মৃত্যু, অচেনা অমরত্বের চেয়ে প্রার্থিত। এই ভাবেই
সবাই আছে, এই ভাবেই চলে যায়। তোমাতে তুমি থাক, আমাতে আমি নিয়ে আমি
আছি বেশ।
কেন এমন বোধ হচ্ছে। নিত্য ছেড়ে অনিত্য নিয়ে মেতে থাকা! কেন এই উটের
দশা! কাঁটা গাছ মশমশ করে ছিঁড়ছি, দুকষ বেয়ে রক্ত ঝরছে! তবু, তবু চিবোচ্ছি!
আপনি বলতে পারেন ঠাকুর, কেন এমন হচ্ছে!
পারি। মায়ার কারসাজি। কামিনী কাঞ্চনই মায়া। ওর ভেতর অনেক দিন থাকলে
হুঁশ চলে যায়-মনেহয় বেশ আছি। মেথর গুয়ের ভাঁড় বয়-বইতে বইতে আর ঘেন্না
থাকে না। এই বেহুঁশ হয়ে থাকাটাও সংস্কার। বেহুঁশের সংস্কার নিয়ে এলে হুঁশ আসবে
কোথা থেকে। ঠাকুর বললেন, একটা গান শোনা,
এমনি মহামায়ার মায়া রেখেছে কি কুহক করে।
ব্রহ্মা বিষ্ণু অচৈতন্য জীবে কি জানিতে পারে।
বিল করে ঘূর্নিপাতে মীন প্রবেশ করে তাতে।
গতায়াতের পথ আছে তবু মীন পালাতে নারে।।
পালাবে কী করে! না পালানোটাই যে সংস্কার ঢুকে আছে। সংসারে সংসারী,বিষয়ী
মানুষের মধ্যেই আমাদের জন্ম-কর্ম। জ্ঞান হওয়া তক বিষয় বিষ গেলানো হচ্ছে তিল
তিল করে। সে বিষয়ী নয়, তার অর্থ সে অপদার্থ, বাউন্ডুলে। ধিক্কারের পাত্র। অবশ্য
এটাও ঠিক, ঈশ্বর ভাবনার বুঁদ হওয়ার কারণে একজন সংসার বিষয়ে উদাসীন, আর
অলস্যের কারণে উদাসীন, এই দুই উদাসীর মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। দুই দলের
দুই জাতের মানুষকে একই ধারায় ফেলা যাবে না। যার সংস্কারে ঈশ্বর আছেন তাকেও
এই ভোগবাদী শিক্ষায় ফেলে দিলে তার জীবন দরকচা মেরে যাবে। অজ্ঞান শিশুটিকে
দেখে কে বুঝবে, সে ভোগী না যোগী হবে। অথচ তার প্রকৃতি অনুসারে শিক্ষা না
দিতে পারলে সবই পণ্ডশ্রম। স্বামীজী বলছেন, ‘আপনাবা একটি গাছকে কখনই শূন্যের
উপর অথবা উহার পক্ষে অনুপযোগী মৃত্তিকার উপর বসাইয়া ফলাইতে পারেন না।
যেদিন আপনারা শূন্যের উপর গাছ জন্মাইতে সমর্থ হইবেন, সেইদিন আপনারা একটি
ছেলেকেও তাহার প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য না করিয়া জোর করিয়া আপনাদের ভাব
শিখাইতে পারিবেন।’
মানুষের প্রকৃতিও মানুষের শিক্ষা। আগে প্রকৃতি পরে শিক্ষা। প্রকৃতি একটি জটিল
ব্যাপার। প্রকৃতির অনেক দিক। নৈতিক, দৈহিক, আধ্যাত্মিক, তামসিক, রাজসিক।
একজন মানুষ বিজ্ঞান ভালবাসবে, না কলা, এটা যেমন তার প্রবণতা, সেই রকম সে
সৎ হবে না অসৎ, একটি তার প্রকৃতি। নিষ্ঠুর অথবা প্রেমিক, নির্ধারণ করবে প্রকৃতি।
প্রকৃতি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দুষ্ট প্রভাব থেকে বালকটিকে দূরে রাখতে
পারলে চরিত্রের ধরন পাল্টায়। একটি প্রচলিত প্রবাদ, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস অসৎসঙ্গে
নরকবাস। গীতায় ভগবান বলছেন,
ধ্যায়তো বিষয়ান্, পুং সঃ সঙ্গস্তেষুপজায়তে।
সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধহভিজায়তে।।
বিষয়ীদের সঙ্গে কেবলই বিষয় চিন্তা, সেই চিন্তা থেকে আসক্তি। আসক্তি থেকে
পাওয়ার ইচ্ছা। এই কামনা প্রতিহত হলে ক্রোধ। ক্রোধ-এর পরিণতি
ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
স্মৃতিভ্রংশাদ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি।।
প্রণশ্যতি মানে মৃত্যু নয়। মনুষ্যত্ব নাশ হয়, পশুতে পরিণত হয়। মানুষের পক্ষে
সেইটাই তো বিনাশ। ক্রোধে মানুষ দিগ্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়। তখন তার কর্তব্য-অকর্তব্য
জ্ঞান থাকে না। হিতাহিত বোধ লুপ্ত হয়। আধুনিক যুগে আর একটি উপসর্গ
জুটেছে-ফ্রাসট্রেসান। ক্রোধের জায়গায় হতাশা। ওর সব হয়ে গেল, আমার কিছু হল
না। একজন রেসে হেরে গিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। সে কেবল একটি কথাই বলত,
লক্কা, লাখ, ফক্কা ফাঁক। হতাশা থেকে চাপা ক্রোধ, বিদ্বেষ, হিংসা। সামান্য উস্কানিতেই
সংঘবদ্ধ ভাঙচুব, নিষ্ঠুবতা, অকাবণে খুন, পিটিযে হত্যা।
স্বামীজি বলছেন-” ‘মানুষ’ কথাটি সংস্কৃত ‘মন’ ধাতু থেকে সিদ্ধ-সুতবাং ওব
অর্থ মননশীল অর্থাৎ চিন্তাশীল প্রাণী-কেবল ইন্দ্রিয দ্বাবা বিষয গ্রহণশীল প্রাণী নয়।
ধর্মতত্ত্বে এই ক্রমবিকাশকেই ‘ত্যাগ’ বলা হযেছে।”