এই সেই বাড়ি? ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামতে-নামতে ঠাকুর প্রশ্ন করলেন। কথামৃতকার
মহেন্দ্রনাথ তাঁকে অতি সাবধানে নামাচ্ছেন। ঠাকুর ভাবস্থ। শ্রাবণের বিকেল। আকাশে
বাদলে মেঘের আনাগোনা। দক্ষিণেশ্বর থেকে যখন বেরোলেন তখন কত আনন্দ! কত
কথা! আমহার্স্ট স্ট্রিটে পড়া মাত্রই ভাবান্তর। আত্মমগ্ন।
ইংরেজি স্টাইলের দোতলা একটি বাড়ি। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পশ্চিমদিকে সদর
দরজা ও ফটক। কিছু কিছু ফুলগাছ এদিকে ওদিকে। বর্ষার ফুল ফুটে আছে। ঠাকুর
ভেতরে প্রবেশ করিশন। ভক্ত পরিবৃত হয়ে বাড়ির দিকে এগোতে এগোতে নিজের
জামার বুকে হাত রাখলেন। তারপর বালকের সরলতায় মহেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করলেন,
‘হ্যাঁ গো আমার বোতাম যে খোলা রয়েছে, এতে কিছু দোষ হবে না ত?’
অপূর্ব ঠাকুরের সাজ। গায়ে একটি লংক্রথের জামা, পরনে লালপেড়ে কাপড়,তার
আঁচলটা কাঁধে ফেলা। পায়ে বার্নিশ করা চটি জুতো। মহেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আপনি ওর
জন্য ভাববেন না। আপনার কিছুতে দোষ হবে না, আপনার বোতাম দেবার দরকার
নেই।’ বালকের মতোই নিশ্চিন্ত হলেন। ঈশ্বরের সরলতা।
সামনেই সিঁড়ি। ধাপে ধাপে উঠে গেছে সেই জ্ঞানলোকে। যেখানে বসে আছেন
এক শ্রেষ্ঠ বাঙালী। ঠাকুর তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। আড়ম্বরহীন পরিবেশ। তাঁর
সামনের টেবিলে বাঁ হাতটি রেখে, ভারি মিষ্টি গলায় বললেন, ‘আজ সাগরে এসে
মিললাম।’
ঈশ্বরচন্দ্র সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়েছেন। উনবিংশ শতকের দুই বিদ্রোহী মুখোমুখি।
মাঝখানে একটি টেবিলের ব্যবধান। ঠাকুরের মুখে স্বর্গীয় হাসি। একজন সমাজকে,
আর একজন ধর্মকে পথে আনতে চাইছেন। দু’জনেরই সংগ্রাম, দারিদ্র আর অজ্ঞানের
অন্ধকারের বিরুদ্ধে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরিষ্কার বলে দিলেন, ‘খালি পেটে ধর্ম হয় না।’আর
ঈশ্বরচন্দ্রের অকাতর দান, পরোপকার আর নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেহাদ। দু’জনেই
রসিক।
শ্রীরামকৃষ্ণের বিখ্যাত উক্তি, সাগরে এসে মিললাম। এতদিন খাল বিল হ্রদ নদী
দেখেছি, এইবার সাগর দেখছি। সঙ্গে সঙ্গে রসিক বিদ্যাসাগরের প্রত্যুত্তর, ‘তবে
নোনাজল খানিকটা নিয়ে যান।’
দু’জনেই হাসছেন। শ্রোতারা অপেক্ষা করে আছেন রসিক ঠাকুর কি উত্তর দেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অসাধারণ উত্তর, ‘না গো! নোনাজল কেন? তুমি তো অবিদ্যার
সাগর নও, তুমি যে বিদ্যার সাগর। তুমি ক্ষীর সমুদ্র।’
শ্রীরামকৃষ্ণ দুটি শব্দ প্রায়ই প্রয়োগ করতেন,বিদ্যা আর অবিদ্যা। প্রথমটা ‘পজিটিভ’,
দ্বিতীয়টি ‘নেগেটিভ’।ভাল আর খারাপ। আলো আর অন্ধকার। স্বাদু আর কটু।চাঁদের
এপিঠ, চাঁদের ওপিঠ। আকাশে দু’ ধরনের তারা আছে। উজ্জ্বল আর অন্ধকার। কালো
তারা, ‘ব্ল্যাক হোল’। সব গ্রাস করে নেয়। আলো, সময় বস্তু সব গিলে ফেলে। রাহু।
বাদুড়বাগানেবিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার অসাধারণ
এক দলিল। যেন প্লেটো আর সোক্রাতেস মিলিত হয়েছেন এক টেবিলে, বর্ষার
বিকেলে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ‘এই জগতে বিদ্যামায়া অবিদ্যামায়া দুইই আছে; জ্ঞান-ভক্তি
আছে আবার কামিনী-কাঞ্চনও আছে, সৎও আছে, অসৎও আছে। ভালও আছে আবার
মন্দও আছে। কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত। ভাল-মন্দ জীবের পক্ষে, সৎ-অসৎ জীবের পক্ষে,
তাঁর ওতে কিছু হয় না।’
ঈশ্বরচন্দ্র ধর্মের জগতের মানুষ নন। মন্দিরের ধর্ম সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো
আগ্রহ ছিল না। তিনি মানুষের ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ যে উদার ধর্ম স্বামীবিবেকানন্দের হাতে তুলে দেবেন, সেটি এক লাইনের
একটি শাস্ত্র-শিবজ্ঞানে জীবসেবা। স্বামীজী যাকে আর-এক ভাবে বলবেন, বহুরূপে
সম্মুখে তোমায় ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর। ঈশ্বরচন্দ্র গম্ভীর মানুষ, জ্ঞানী মানুষ,
উচ্ছ্বাসহীন নীরব সেবক। তিনি সেবা আর দয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য খোঁজার চেষ্টা
করেননি। মাতৃভক্ত। মায়ের জন্যে জীবন দিতে পারতেন। পরোপকার ও পরের দুঃখ
দূর করার জন্যে সর্বস্ব দান করে গেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র ও স্বামীজীর মাঝখানে শ্রীরামকৃষ্ণ
যেন কোমল প্রেমের পরত। এ-পাশে জ্ঞান, ও-পাশে জ্ঞান, মাঝে, প্রেম, ভক্তি,
বিশ্বাস। তিনজনেই মাতৃভক্ত। মায়ের ভক্তই তো প্রকৃত শাক্ত।
জ্ঞানের সাগর, বিদ্যার সাগরের কাছে জ্ঞানের কথাই ত বলতে হবে। স্বামীজী
বললেন, বেদের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার পরমহংসদেব। শ্রীরামকৃষ্ণ ভগবানের বাবা। ঠাকুর
সাধারণের কাছে পরিষ্কার একটা সমাধান তুলে ধরেছেন। জগৎকে ‘মায়া’ বলে উড়িয়ে
দিয়ে, ‘নাকে নস্য ঠুসিয়া, টিকি নাড়িয়া, তর্ক করিয়া, পরিবারের সংখ্যা অবিরত বৃদ্ধি
করিয়া ‘সোহং’ হুঙ্কার ছাড়িলে লোকে সিটি মারিবে’।ব্রহ্মাও সত্য, জগৎও সত্য। সে
কি রকম? একটি প্রদীপ জ্বলছে। আলো দেওয়াই তার কাজ। সেই আলোয় কে কী
করছে, তা দেখা তার কাজ নয়। এ-ঘরে কেউ ভাগবত পড়ছে। আর এক ঘরে একজন
দলিল জাল করছে। নির্বিকার প্রদীপ জ্বলছে।
‘সূর্য শিষ্টের উপর আলো দিচ্ছে, আবার দুষ্টের উপরও দিচ্ছে।’
‘সাপের দাঁতে বিষ আছে, অন্যকে কামড়ালে মরে যায় সাপের কিন্তু কিছু হয় না।’
‘দেখো ব্রহ্ম যে কি, মুখে বলা যায় না। সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র
ব্রহ্মই উচ্ছিষ্ট হয়নি, কারণ মুখে বলা যায় না।’
বিদ্যাসাগরমশাই, আহা! করে উঠলেন, ‘একটা নতুন কথা শিখলুম আজকে।’
চীন প্রাচীন সভ্যতা। ভারতের মতোই। জগৎ, জীবন, ভগবান তিনটে এক করে নাও।
সৃষ্টির দিকে তাকালেই স্রষ্টাকে দেখতে পাবে। কনফুসিয়াসের প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে
এই কথা বলেছেন লাওৎসু। এই জগৎ এক শক্তির দ্বারা পরিচালিত। উৎস, আমরা
বলব, ভগবান। কেউ বলবেন গড। কেউ আল্লা। চৈনিক লাওৎসু বলবেন ‘তাও’।
ধর্ম মানুষের জীবন, জগৎ, সমগ্র এই সৃষ্টিকে ধরে রেখেছে। তা না হলে সব
ধ্বংস হয়ে যেত। লাওৎসু তাঁর দর্শন ও চিন্তায় এই সত্যটি পেলেন, ‘সেই মহাশক্তি
তাও তারই তৈরি বাঁধাধরা নিয়মে এই জগৎ শাসন করছেন ঠিকই, তবে মানুষকে দিয়ে
রেখেছেন স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি। মানুষ। এই ইচ্ছার স্বাধীনতা অথবা স্বাধীন-ইচ্ছা তোমার
এক পরম সম্পদ। শান্তির সাধনা করো,আর তুমি কি করবে আর করবে না, তোমার
নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্তে এসো।’
তিন মহাপুরুষের ভাবনাই এক পথে গেছে, প্রেম, শান্তি, ক্ষমা আর পরোপকার।
এই তিনজন হলেন, লাওৎসু, গৌতম বুদ্ধ আর যিশুখ্রিস্ট। খ্রিস্টের ‘শৈল-উপদেশ’,
‘বুদ্ধবাণী’ আর ‘তাও’ একই সুর তিনটি তারে। পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ
পাশ্চাত্যবাসীকে প্রেমের বাণী শোনালেন বেদান্তের আলোকে।
লাওৎসু বললেন, তোমার নিপীড়নকারীকে ক্ষমা দিয়ে শান্ত করো, নিজেকেও শান্ত
করো। যে মন্দ তাকে আমি নিজে ভালো হয়ে ভালো করব। মারের বদলে মার, এই
নীতিতে সমাজ চললে পৃথিবীতে মারামারি ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।এত সুন্দর
পৃথিবীটাকে নষ্ট করে ফেলবে?
ঈশ্বর সুন্দর তাঁর সৃষ্টি সুন্দর। সেই সুন্দরকে অনুভব করতে চাও, তাহলে পবিত্র
হও। নিজেকে জাগতিক কামনা, বাসনা থেকে মুক্ত করো। ভগবানের ঐশ্বর্য চাইলে
ভগবানকে পাবে না কোনওদিন। তাঁর বাইরেটা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ভগবান
আর জগৎ আলাদা নয়। পরস্পর জড়িত। আমরা তা মনে করি না। মনে করি দুটি
আলাদা। এটা একটা ওটা একটা। দুটো যে আলাদা নয়, এইটাই এক মহা রহস্য। শুধু
রহস্য নয়, রহস্যের রহস্য।
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণর সুন্দর উপমা, বেল আর বেলের বিচি। ‘যতক্ষণ ঈশ্বরকে না
পাওয়া যায় ততক্ষণ ‘নেতি নেতি’ করে ত্যাগ করতে হয়। তাঁকে যারা পেয়েছে, তারা
জানে যে তিনিই সব হয়েছেন। তখন বোধ হয়-ঈশ্বর, মায়া, জীব-জগৎ।
জীবজগৎসুদ্ধ তিনি। যদি একটা বেলের খোলা শাঁস, বিচি আলাদা করা যায়, আর
একজন বলে, বেলটা কত ওজন ছিল দেখ তো, তুমি কি খোলা বিচি ফেলে শাঁসটা
কেবল ওজন করবে? না, ওজন করতে হলে খোলা বিচি সমস্ত ধরতে হবে। ধরলে
তবে বলতে পারবে, বেলটা এত ওজনের ছিল। খোলাটা যেন জগৎ, জীবগুলি হল
বিচি। বিচারের সময় জীব আর জগৎকে অনাত্মা বলেছিলে, অবস্তু বলেছিলে। বিচাব
করার সময় শাঁসকেই সার, খোলা আর বিচিকে অসার বলে বোধ হয়। বিচার হয়ে
গেলে, সমস্ত জড়িয়ে এক বলে বোধ হয়। আর বোধ হয়, যে সত্তাকে শাঁস, সেই
সত্তা দিয়েই বেলের খোলা আর বিচি হয়েছে। বেল বুঝতে গেলে সব বুঝিয়ে যাবে।
লাওৎসুর তাও আর হিন্দুর ব্রহ্মা এক। লাওৎসু বললেন, স্বর্গ আর মর্ত একই উদরে
জন্মাল। তিনি আমাদের মা। ত্বং হি তারা। বিশ্বপ্রসবিণী মা। জগৎ অধিশ্বরী। জগদিশ্বরী,
লাওৎসুর কী অপূর্ব সিদ্ধান্ত! আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি চলেন, তাই তিনি বর্ণহীন।
তিনি আমাদের শ্রবণকে পাশ কাটিয়ে যান, তাই তিনি শব্দহীন নিঃশব্দ। তিনি আমাদেব
স্পর্শকে ফাঁকি দিয়ে যান, তাই তিনি কায়াহীন। এই অশরীরী ঊর্ধ্ব আর অধঃ জুডে
দাঁড়িয়ে আছেন। উপর দিকটা আলোকিত উজ্জ্বল, নিচের দিকটা অন্ধকারে অস্পষ্ট,
তা নয়। অবিরত, অবিরল ক্রিয়াশীল। কোনও একটি নামে তাঁকে চিহ্নিত করা যাবে
না। এই সব আছে পরমুহূর্তেই কিছু নেই, কেউ নেই। নিমেষে সৃষ্টি নিমেষে ধ্বংস।
Form of the formless,the image of the imageless.
কে তুমি? আমিই বা কে?