অনেক প্রশ্নের সেরা প্রশ্ন, আমাদের প্রাণ কোথায় আছে? বায়ুতে। আমাদের শরীরে
একটা ‘ক্যাপটিভ এয়ার’ আছে-নিরুদ্ধ বাতাস, যার সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো
যোগ নেই। শ্বাস-প্রশ্বাস হল হাপর টানা। অগ্নিকে উস্কে রাখার যান্ত্রিক কৌশল।
প্রাণবায়ুর খবর রাখেন ক্রিয়াযোগীরা, আর রাখেন সহজিয়া বাউলরা। আর রাখেন
সুফী সাধকরা।
এই দেহ এবং এই শ্বাস। জড় দেহ নয়, চেতন দেহ। সে-দেহ কেমন? সর্বকালের
শ্রেষ্ঠ সুফীসাধক রুমি বলছেন-Everything in the universe is within you.
Ask all from yourself.’শিবসংহিতা’ আরো বিস্তারিত। পঞ্চভূতবিনির্মিত এই
দেহই ব্রহ্মাণ্ড। কী রকম?
দেহেহস্মিন্ বর্ততে মেরুঃ সপ্তদ্বীপসমন্বিতঃ।
সবিতঃ সাগরাঃ শৈলাঃ ক্ষেত্রানি ক্ষেত্রপালকাঃ।।
ঋষয়ো মুনয়ঃ সর্বে নক্ষত্রানি গ্রহাস্তথা।
পুণ্যতীর্থানি পীঠানি বর্তন্তে পীঠদেবতাঃ।।
সৃষ্টি সংহারকর্তারৌ ভ্রমন্তৌ শশিভাস্করৌ।
নভো বায়ুশ্চ বহ্নিশ্চ জলং পৃথ্বী তথৈবচ।।
ত্রৈলোক্যে যানি ভূতানি তানি সর্বানি দেহতঃ।
মেরুং সংবেষ্ট্য সর্বত্র ব্যবহারঃ প্রবর্ততে।।
কী আছে এই দেহে? সপ্তদ্বীপ-সমন্বিত মেরু-পর্বত। মেরুদণ্ডসমন্বিত পর্বত-মস্তক।
সাতটি চক্র তার সপ্তদ্বীপ মালা। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন মনের সপ্তভূমি। এরপর
নদ-নদীসমূহ, সমুদ্রসকল, পর্বতসমূহ, ক্ষেত্রসমূহ, ক্ষেত্রপালগণ, ঋষি-মুনিবর্গ,
গ্রহনক্ষত্রকুল, পুণ্যতীর্থসকল, পীঠস্থানসমূহ, পীঠদেবতাগণ। এই শরীর এক আকাশ।
ঠাকুর বললেন ঘটাকাশ। ঘট হল শরীর। এই শরীরেই সৃষ্টি সংহারকারী রবি-শশী
সর্বদা ভ্রমণশীল। আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল পৃথিবী সবই এই শরীরে। ত্রিলোকে যা
আছে সব আছে এই শরীরে। মেরু অবলম্বন করে যার যা কাজ করে যাচ্ছে। মেরু
শব্দের সাধারণ ধারণা-Pole-উত্তর ও দক্ষিণ। দেহ মেরুর উত্তরে -সহস্রার।
দক্ষিণে মূলাধার। জপমালার গ্রন্থিবীজ বা প্রধানবীজ সুমেরু।
বিজ্ঞানী অর্থাৎ জীববিজ্ঞানী অর্থাৎ ‘ব্রেন’ যাঁদের বিষয় তাঁরা কি ভাবে দেখছেন,
the spinal cord is a never fibre, extending from the bottom of
the brain throughout our body and is protected by 24 spinal
vertabrae. মেরুদণ্ড হল স্নায়ুতন্ত্র। আমাদের তন্ত্র শাস্ত্রে-ইড়া, পিঙ্গল, সুযুম্না। গঙ্গা
যমুনা, স্বরস্বতী ত্রিধারা। cxtending from the bottom of the brain.
বিজ্ঞানীরা ওপর থেকে নীচে নামছেন-অবরোহন। আমাদের অধ্যাত্ম বিজ্ঞানীরা
নিচে থেকে উপরো উঠছেন-আরোহণ। মেরুদণ্ডটিকে সযত্নে রেখেছে চব্বিশটি
হাড় বা কাশেরুকা দিয়ে তৈরি দুর্দান্ত একটি আধার। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম
(সি.এন.এস) ও পেরিফারেল নার্ভাস সিস্টেমকে যুক্ত করছে। (পি. এন. এস)।
কে গড়েছে এমন ঘর, ধন্য কারিগর
ঘরের মাপ চৌদ্দ পোয়া
চৌদ্দ ভুবন তার ভিতর।। [অনন্ত গোঁসাই]
চৌদ্দ পোয়া মানে সাড়ে তিনহাত। ত্রিধারা একটি ধারা-মূল ধারা, দেহভূমিতে
অজস্র শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত। বাউল গানের প্রচলিত ধারায়-জমির সঙ্গে এই
মানবদেহের তুলনা। রামপ্রসাদের আক্ষেপ-এমন মানবজমিন রইল পতিত।
কালাচাঁদ পাগল গাইছেন,
মানবদেহ কল্পভূমি
যত্ন করলে রত্ন ফলে।
ভবে আসার আশা পূর্ণ হবে
শুভযোগে চাষ করিলে।।
এই জমি তোর চৌদ্দ-পোয়া
ভগবানের কৃপায় গেল পাওয়া
মন্ত্র-বীজে নে সৃজে
গাছে হলে বীজ জন্মে মূলে।।
রুমির অনুভূতি, I am a tree with a trained parrot in its branches/
silence, thought, and voice. গাছের জলে শিক্ষিত তোতা, সে শুধু কৃষ্ণকথা
বলে। ঠাকুর বলছেন, ভাবমুখে।
বিজ্ঞানীরা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে ব্যস্ত। হাড়ের, খাঁচা, স্নায়ু, অনুভূতি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের
অনুভূতি।অবোধ শিশু যেমন জিজ্ঞেস করে-ওমা ওটা কী, ওমা এটি কী? সেই রকম
The spinal cord receives information from the senses and
transmits it to the brain. ঠাকুর যেমন বলতেন, সব আমার মা জানে, আমি
খাই দাই আর থাকি। শ্রীরামকৃষ্ণ মাথাটা কেটে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
কাটামুণ্ডের নিগূঢ় বাণী-জ্ঞান চাস্? তাহলে তোর মুণ্ডুটা আমাকে দে।আঁধাব রাতে
দক্ষিণেশ্বরের পথে পথে উন্মত্ত ঠাকুর ছুটছেন আর বলছেন-আমার বিচারবুদ্ধিতে
আগুন লাগিয়ে দে।
এই বিজ্ঞানে মনের অস্তিত্ব নেই। চিন্তার উৎসসন্ধানের চেষ্টা কোথায়। মনের
সপ্তভূমির সন্ধান ঠাকুর দিয়েছেন। ছোরা ছুরি ছাড়াই মানুষ বহুকাল আগে তার মাথার
খবর জেনেছে সাধনার দ্বারা। পায়ের পাতায় ছোট্ট একটি নিমেষে মাথা জানিয়ে
দিয়েছে, ওটা হাতি নয় পিঁপড়ে। ঠিক কোনখানটায় তাও বুঝিয়ে দিয়েছে। পায়ের
পিঁপড়ে হাতে খুঁজব না। দূর থেকে শব্দ আসছে। কতদূর। কোন দিকে অনুমান
করতে পারব কী ভাবে? এই ভাবে:
MODALITY Stimulus (সাহায্যকাবী) Type of Receptor(ধরন) Receptors (নাম)
দৃষ্টি আলো ফটো বিসেপ্টাব বডস এবং কনস
শ্রবণ ধ্বনি, স্বব মেকানো বিসেপ্টব হেযাবসেলস্ ‘ককলিযাব’
ব্যালেনস হেডমুভমেন্টস মেকানো বিসেপ্টব হেযাব সেলস্ (সেমি-
সার্কুলাব ক্যানালস)
সোমাটিক মেকানিক্যাল, নক্সাস, মেকানো, নোসি, থার্মো, ডর্সাল কট গ্যাংগলিআন
(দেহানুভূতি) থার্মাল অ্যান্ড কেমিক্যাল কেমো বিসেপ্টাব নিউবনস
স্বাদ কেমিক্যাল কেমো বিসেপ্টাব টেস্টবাডস
গন্ধ কেমিক্যাল কেমো বিসেপ্টাব। অলফ্যাকটবি সেনসবি
নিউবনস
নিউরোলজিস্টরা এরপর বললেন, all roads lead to Rome. অজস্র স্নায়ু ও
স্নায়ু গ্রন্থি সারা শরীরে চনমন করছে। সমস্ত সংবাদ চালান করে দিচ্ছে হেড অফিসে।
সব আমার মা জানেন। মা-থা, মা যেখানে থাকেন। আমাদের সাধন সংগীত ওদের
অনেক আগেই সাধকের অভ্রান্ত অনুভূতিতে এই তত্ত্ব ধরে বসে আছে। ‘টার্মিনোলজি’
অন্যরকম, ‘শিরসি সহস্রদলে, পরম শিবেতে মিলে ক্রীড়া কর কুতূহলে সচ্চিদানন্দ
দায়িনী।’ এই অজ্ঞাত সাধক নামের প্রত্যাশী নন, তিনি তাঁর প্রাপ্ত জ্ঞান আটটি চরণে
জ্ঞাত করে গেছেন। বিরাট বিরাট গ্রন্থের প্রয়োজন হয়নি।
‘জাগ মা কুলকুণ্ডলিনী’-The serpent power at the base of the spine.
মাথায় না মূলাধারে? মাথা তার যাবতীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে আছে। যেন ময়রা,
ছানা আসছে চিনি আসছে। তৎক্ষণাৎ ‘সন্দেশ’ তৈরি করে ‘ডেলিভারি’ করে দিচ্ছে।
সন্দেশের অপর অর্থ সংবাদ। উর্দুতে ‘আকবর’-অখবার। জ্ঞানের ব্যাডমিন্টন।
কুণ্ডলিনী, প্রসুপ্ত ভুজগাকারা। একটি ত্রিকোণে অগ্নিবর্ণ অবস্থান। ছানা আর চিনি
হল ঠাকুরের কলির মায়া-কাম আর কাঞ্চন। প্রসুপ্ত কুণ্ডলিনী ঠাকুরের ভাষায়
কড়াইয়ের জলের বেপারি। তিনি অমৃতের আধার, কিন্তু জাগাতে হবে, তুলতে হবে।
কোন ‘রুট’! up and higher up-to Rome-the vatican city-লালনের
আক্ষেপ,
আমার বাড়ির কাছে আরশী-নগর
এক পড়শী বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।।
মনের সপ্তভূমির সর্ব নিম্নতল মূলাধার। ‘মুলাধার ত্যজ শিবে?’ জাগ মা কুল
কুণ্ডলিনী। সুযুন্নার পথ ধরে স্বাধিষ্ঠানে হও উদিত, চলো মা, ধাপে ধাপে
ওপরে-মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা, সহস্রার? ঠাকুর বলছেন, ‘যিনি আদ্যাশক্তি
তিনিই সকলের দেহে কুলকুণ্ডলিনীরূপে আছেন। যেমন ঘুমন্ত সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে
রয়েছে। যখন সংসারে মন (নিউরোলজি নীরব) থাকে, তখন লিঙ্গ, গুহ্য, নাভি
মনের বাসস্থান (তন্ত্রে এই তিনটি স্থান হল, মুলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর)।মনের তখন
ঊর্ধ্ব দৃষ্টি থাকে না–কেবল কামিনী কাঞ্চনে মন থাকে। (নিউরোলজি অন্তত এইটুকু
বলতে পেরেছে, বর্ণ স্বাদ, সঙ্গীত, ‘এতই গন্ধ, এতই বরণ, এত গীতি, এত ছন্দ’
আমাদের অনুভবে আসে কোন পথে? উত্তর Neural encoding and decoding.)
‘মনের চতুর্থভূমি হৃদয় (অনাহত)। তখন প্রথম চৈতন্য হয়েছে (দেহাতিরিক্ত
অনুভূতি)। নিউরোলজির ব্যাখ্যা-The thalamus is the most important
relay station of the senses)।আর চারদিকে জ্যোতিঃ দর্শন হয়। তখন সেব্যক্তি
ঐশ্বরিক জ্যোতিঃ দেখে অবাক হয়ে বলে, একি! একি!’
নিউরোলজিস্ট ব্যাখ্যা করুন-আপনাদের অনুসরণে, Vision→LightPhoto
reception-rods, cons. ঈশ্বরের আলোর ধারণা আছে কি? Source-God.কোন
চোখে দেখা যায়? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, ও চোখে হবে না সখা!
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বক্ষুষা
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।।
আমি তোমাকে অলৌকিক চক্ষু প্রদান করছি। মনের পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ। (বিশুদ্ধ)।
অবিদ্যা, অজ্ঞান, সব উবে গেল। মনে তখন বিশুদ্ধ চিন্তা। আনন্দময়, ঈশ্বরময়,
জ্যোতির্ময়।মনের ষষ্ঠভূমি কপাল (আজ্ঞা চক্র)-নিরুপম রূপ দর্শন। ঠাকুরের অনুপম
উপমা ‘যেমন লণ্ঠনের ভিতর আলো আছে, মনে হয়, এই আলো ছুঁলাম, ছুঁলাম কিন্তু
কাচ ব্যবধান।’ এরপর শিরোদেশ সপ্তমভূমি (সহস্রার)-ব্রহ্মারন্ধ্রে সহস্রার হ, ল, ক্ষ
ব্রহ্মরূপিনী। সমাধি। ঠাকুর সমাধিস্থ। দণ্ডায়মান, কাষ্ঠপুত্তলিবৎ, দেহে প্রাণ নেই।
মহাত্মা তোতাপুরী বুকে কান পাতলেন। হৃদয়ের শব্দ নেই। অমল জ্যোতিতে দেহ
উদ্ভাসিত। নিউরোলজিতে ব্যাখ্যা নেই। এবার তাঁরাই বললেন, দাশর্নিক স্পিনোজাই
ঠিক ধরেছেন-মস্তিষ্ক তথ্য ও তত্ত্বের প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে, উথাল পাথাল।
টুকরোগুলোকে জুড়তে না পারলে সমগ্রের জ্ঞান আসবে না। খণ্ড ব্রহ্মাণ্ড নয়। স্বতঃলব্ধ
জ্ঞানই সম্পূর্ণ জ্ঞান এবং সেই বাউল-At this level, man is asware of the
universe’s unity; not as an observer but rather as within himself.
‘রাত্নসারে’ সেই সার কথা-
ভাণ্ডকে জানিলে জানি ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্ব।
ভাণ্ড বিচারিলে জানি আপন মাহাত্ম্য।
আপনা জানিলে জানি বৃন্দাবনতত্ত্ব।।
ভাণ্ড হইতে জানি জত কৃষ্ণের মহিমা।
ভাণ্ড হইতে জানি রাধা-প্রেমতত্ত্ব-সীমা ।।
এখন লাখ টাকার প্রশ্ন, ‘আপনাকে আপনি চেনা যায় কিসেতে।’ কোন পবনে
ভাসছে আমার নাও!