‘মাকে মানিস না-সেই জন্যে তোর এত কষ্ট।’
‘আমি তো মাকে জানি না।’
১৮৮৫ সালের ২ মার্চ থেকে ৭ মার্চের মধ্যে কোন একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ ও
নরেন্দ্রনাথের মধ্যে এই কথোপকথন। নরেন্দ্রনাথ মাকে মা কালীকে মানেন না।
কেন মানেন না! যদি না-ই মানেন, তাহলে মা কালীর সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে
তিনি কেন যাওয়া আসা করেন! ঠাকুরকে প্রথম যেদিন দেখলেন, সেদিন তাঁর মনে
হল মানুষটি অর্ধোম্মাদ-monomaniac ।
১৮৮১ সালের পৌষ মাসে নরেন্দ্রনাথ তাঁর দুই বন্ধু এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম
ভক্ত সুবেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের ঘোড়ার গাড়িতে প্রথম দক্ষিণেশ্বরে
এলেন। কেন এলেন। বড়লোকের ছেলে। সবল সুগঠিত দেহ। অতি রূপবান।
তেজোদীপ্ত, সুন্দর, লাবণ্যমাখা মুখমণ্ডল। নাচ, গান, বাজনা, রঙ্গরসের বিধিদত্ত
প্রতিভার অধিকারী। অন্তরে প্রীতি আর পবিত্রতা। সকলের প্রিয়। মেধাবী। আটর্নি
বিশ্বনাথ দত্তের পুত্র।
কী কারণে তিনি দক্ষিণেশ্বরে এলেন। ‘অপূর্ব শ্রীসম্পন্ন ঊনবিংশবর্ষ বয়স্ক তরুণ
যুবক।’ মূর্তিপূজায় তিনি বিশ্বাসী নন। অকারণে গদগদ ভক্তি তিনি সহ্য করতে
পারেন না। ভাব, ভাবালুতা তিনি গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না। আমি নিজে বুঝতে
চাই, নিজে জানতে চাই, পরখ করে দেখতে চাই। বলা কথায় আমার বিশ্বাস নেই।
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, কালী, দুর্গা, যে যেখানে আছেন থাকুন। না জেনে, না চিনে
ধর্ম নিয়ে যাঁরা মাতামাতি করছেন করুন। ধর্মের এই গ্রাম্যতায় আমি নেই। যদি
মনে করো আমি নাস্তিক, হ্যাঁ আমি নাস্তিক। দাম্ভিক অহঙ্কারী। হ্যাঁ আমি তাই। আমি
একটি প্রশ্ন হাতে নিয়ে জগতে প্রবেশ করেছি। এমন কেউ আছেন কি? সত্যবাদী,
যিনি ঈশ্বরকে দেখেছেন, প্রত্যক্ষ। শোনা কথা নয়। হোই হোথায় ঈশ্বর আছেন,
সঙ্গে সঙ্গে নাচতে শুরু করলুম। বিশ মণ দুধ ঢেলে এলুম বাবার মাথায়। তিলকচর্চিত
চিতাবাঘটি হয়ে বসে পড়লুম আসনে। শিষ্যরা মালা পরাতে লাগল। পদসেবা।
ও ধর্ম যেমন আছে থাকে থাক। পুরোহিত নির্ভর। শান্তি, স্বস্ত্যয়ন, সত্যনারায়ণ,
ঘণ্টাবাদন, চামর রজন। মরে কেউ স্বর্গে যায়, কেউ যায় নরকে। মেয়েলি ধর্ম
আমাকে আকর্ষণ করে না। আমি চিত্ত বুঝি, আমি প্রায়শ্চিত্তও বুঝি না। তবে এটি
বুঝি, ‘এদেশে সেই বুড়ো শিব বসে আছেন, মা কালী পাঁঠা খাচ্ছেন, আর বংশীধারী
বাঁশী বাজাচ্ছেন।’ ট্র্যাডিসান। হাজার হাজার মানুষের প্রশ্নহীন বিশ্বাসের বেদিতে
ভগবানের অবস্থান। যার বিশ্বাস নেই তার কী হবে! ওঁকার ধ্যানে সর্বার্থসিদ্ধি,
হরিনামে সর্বপাপনাশ, শরণাগতের সর্বাপ্তি-এ সমস্ত শাস্ত্রবাক্য সাধুবাক্য অবশ্য
সত্য, কিন্তু দেখতে পাচ্ছ যে, লাখো লোক ওঁকার জপে মরছে,হরিনামে মাতোয়ারা
হচ্ছে, দিনরাত ‘প্রভু যা করেন’ বলছে এবং পাচ্ছে ঘোড়ার ডিম।
ধর্মের তিনটি ব্যাপার তিনি মানতেন না। মন জুড়ে বিরাট এক সংশয়। প্রথমত,
তিনি অবতার মানতেন না। দ্বিতীয়, সাকার উপাসনা, মূর্তিপূজা ঘৃণার চোখে
দেখতেন। তৃতীয়, অদ্বৈতবাদ ও নাস্তিকতা একই জিনিস এই ছিল তাঁর ধারণা।
এ ত মহাসমস্যা। সাকার দেব-দেবী মানেন না। নির্গুণ, নিবাকার ব্রহ্মাও মানেন
না। ‘সবই ব্রহ্ম’ এই কথা শুনলে ঠাট্টা করেন, ‘তাহলে ঘটিটাও ব্রহ্ম, বাটিটাও
ব্রহ্ম। মানুষ কেমন করে বলে, আমি ব্রহ্ম, জীব আর ব্রহ্ম অভেদ। এ ত এক ধরনের
নাস্তিকতা। সৃষ্ট জীব নিজেকে স্রষ্টা ভাবছে। এর চেয়ে পাপ আর কী হতে পারে।
মুনি-ঋষিদের মাথা খারাপ। এমন কথা লিখলেন কী করে?’
যখন বালক, তখন পুরাণ শুনতে ভীষণ ভালবাসতেন। শ্রুতিধর। রামায়ণ শুনে
শুনে মুখস্থ। মেলা থেকে রাম-সীতার মূর্তি কিনে এনে ফুল দিয়ে সাজিয়ে ধ্যানে
বসতেন। বালকের সেই ধ্যান এমনই প্রগাঢ় হত দরজা ভেঙে বালক বিলেকে বের
করতে হত। রাম আর সীতার লীলাধ্যানে বালক মগ্ন চৈতন্য। কিন্তু যেই শুনলেন,
রাম সীতাকে বিবাহ করেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে যুগল মূর্তি ছুড়ে ফেলে দিলেন। ঘৃণার
কারণ? কেউ একজন বলেছিলেন, বিয়ের মতো খারাপ কাজ আর কিছু নেই।
ভগবান রাম সেই ঘৃণিত কাজ করেছেন। বালক বিলের হাতে রামচন্দ্রের দ্বিতীয়বার
নিষ্ঠুর নির্বাসন। সীতারামের আসনে এসে বসলেন মহাদেব।
শৈশব থেকেই সন্ন্যাস সম্পর্কে তাঁর অদ্ভুত একটা রোমান্টিকতা ছিল। কারণ
হয়ত এই, পিতামহ দুর্গাপ্রসাদ হঠাৎ সব ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন।
গৌরবর্ণ সুপুরুষ দুর্গাপ্রসাদ অ্যাটর্নি অফিসে আইনজীবী ছিলেন। উত্তর কলকাতা
নিবাসী দেওয়ান রাজীবলোচন ঘোষের সুশিক্ষিতা ও পরমাসুন্দরী কন্যাশ্যামাসুন্দরীকে
বিবাহ করেছিলেন। শ্যামাসুন্দরীর গর্ভে দুটি সন্তান। প্রথমটি কন্যা। সাত বছর বয়সে
মারা যায়। দ্বিতীয় পুত্র বিশ্বনাথ। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম। শ্রীরামকৃষ্ণের চেয়ে এক
বছরের বড়। দুর্গাপ্রসাদের বয়েস তখন পঁচিশ। সুন্দরী স্ত্রী, সুন্দর সংসার, প্রচুর
উপার্জন। কে বাজাল বৈরাগ্যের বাঁশী। সব ছেড়ে নিরুদ্দেশ।
দত্ত পরিবারে সন্ন্যাসের বাতাস। এই কাহিনী পরিবারে ভেসে বেড়াত। বালকের
মনে ঘটনাটি স্বপ্ন হয়ে বাসা বেঁধেছিল। সোমবার শিবের বার। সেই বারেই
নরেন্দ্রনাথ পৃথিবীতে প্রবেশ করলেন। ১৮৬৩ সাল, ১২ জানুয়ারি। সবাই দেখে
বললেন, অবিকল ঠাকুরদার মতো চেহারা, দুর্গাপ্রসাদ ভুলতে পারেননি। ছেলের
কাছে ফিরে এলেন। বউমা ছেলের নাম রাখ ‘দুর্গাদাস’। বীরেশ্বর শিবের প্রসাদে
সন্তান লাভ। ভুবনেশ্বরী সন্তানের নাম রাখলেন ‘বীরেশ্বর’। রাশ্যাশ্রিত নাম হল
নরেন্দ্রনাথ। স্কুলে নরেন্দ্রনাথের ক্লাসে কোনো নতুন ছেলে ভর্তি হলে, নরেন্দ্রনাথের
প্রথম প্রশ্নই ছিল, তার ঠাকুরদা কি সন্ন্যাসী হয়েছেন? বন্ধুদের বলতেন, আমি সন্ন্যাসী
হব। আমার হাতে সন্ন্যাসী হওয়ার একটা বিশাল রেখা আছে। মাথায় জটা। পরনে
কৌপীন। হাতে দণ্ড কমণ্ডলু। গহন অরণ্যে হাঁটছি। একা একেবারে একা। তেষ্টা
পেলে ঝরনার জল। গাছের তলায় শয়ন। আহার ফলমূল। তারপর হিমালয়ে। বরফ
শুধু বরফ। বড় বড় সন্ন্যাসীরা সেখানে গুহার ভেতর ধ্যানে বসে থাকেন। কেউ
তাদের দেখতে পায না। আমিও গুহায় থাকব। সাধনা করব। আর ফিরে আসব
না।
বালক নরেন্দ্রনাথের একটি প্রিয় খেলা ছিল, ‘রাজা আর রাজসভা’। নরেন্দ্রনাথ
রাজা। চণ্ডীমণ্ডপেব র্বাচ্চ ধাপে বসে আছেন। নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী, সেনাপতি,
অধীনস্থ রাজারা আর অন্যান্য কর্মচারীরা পদমর্যাদা অনুসারে সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপে।
শুরু হত দরবার, বিচারাদি রাজকার্য। রাজোচিত গাম্ভীর্যে। তিনি রাজা। বসে আছেন
কল্পনার রাজ সিংহাসনে। এই রাজা ত এই সন্ন্যাসী। কল্পনা দুই বিপরীত মেরুতে
ঘুর-পাক খাচ্ছে। একদিন এক ফালি গেরুয়া কাপড় কৌপীন করে পরেছেন। সারা
বাড়ি ঘুরছেন সেই বেশে। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কী রে?’ বীরেশ্বর সোল্লাসে
বললেন, ‘মা, আমি শিব হয়েছি।’ এইতেই শেষ নয়। কোথাও এইবার নির্জনে ধ্যানে
বসবেন। ক্রমে উঠে যাবেন কোন আলোকে।
সাড়ে ছয় বছর বয়সের সুন্দর এক বালক মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে, ‘মা দেখ,
সাধুরা আমাকে কেমন সাজিয়ে দিয়েছে।’ সর্বাঙ্গে ভস্ম মাখা। পরিধেয় বস্ত্র দ্বিখণ্ডিত।
একখণ্ডে কৌপীন। আর এক খণ্ডে হয়েছে বহির্বাস। কে এই বালক? কামারপুকুরের
গদাধর। শিমুলিয়ার বীরেশ্বরের গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ। দু’জনে একই তরঙ্গে ভাসছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ কদিন সেই রহস্যে মোড়া কথা বলবেন, ‘নরেন্দ্র আমার শ্বশুরঘর’। যে
কথার অর্থ আজও বোঝা গেল না।
নরেন্দ্রনাথের নিদ্রা, সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। বালিশে মাথা রাখলুম, ঘুমিয়ে
পড়লুম, তা হত না। নরেন্দ্রনাথ উপুড় হয়ে শুতেন। চোখ বোজান মাত্রই ভুরুর
মাঝখানে অপূর্ব এক আলোর বিন্দু ফুটে উঠত! নানা আকার ধারণ করত, নানা
বর্ণ। ক্রমে একটি ডিমের আকার। তারপর হঠাৎ ফেটে গিয়ে তারাবাজির আলোর
মতো ছড়িয়ে পড়ত। শুভ্র দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। আলোর সমুদ্রে তলিয়ে যেতেন
বীরেশ্বর। এই ছিল বীরেশ্বরেব ঘুমিয়ে পড়া। তিনি ভাবতেন সকলেরই বুঝি এই
রকম হয়। যৌবনে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ধ্যানের ক্লাসে নরেন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধুকে
জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘুমের আগে জ্যোতি দেখিস?’ বন্ধু বললে, ‘কই না ত!’
পরবর্তীকালে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই জিজ্ঞেস করবেন, ‘জ্যোতি দেখিস?’ ‘যারা
ধ্যান সিদ্ধ তারাই এইরকম জ্যোতি দেখতে পায়।’
এই সময় দুটি বিপরীত জীবনচিত্র তাঁর কল্পনায় দেখা দিত, একটি চিত্র, অশেষ
ধন-জন, যশ-মান ভোগৈশ্বর্য। বসে আছেন সমাজের শীর্ষস্থানে। এই ছবিটি মিলিয়ে
গিয়ে ফুটে উঠত আর একটি ছবি, গৃহহীন, সম্বলহীন, কৌপীনমাত্র সম্বল,
অরণ্য-পর্বতচারী সর্বত্যাগী পরিব্রাজক সন্ন্যাসী। বৃক্ষতলে বাস। মাধুকরী।আকাশবৃত্তি।
শ্রীরামকৃষ্ণ অপ্রকট হওয়ার পর বরাহনগর মঠে সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছা ভয়ানকভাবে
চেপে বসল। কেবলই বলতেন, ‘কৌপীন না পরলে আর উপায় নেই। মানুষ কেন
সংসারে বদ্ধ হবে, কেন মায়ায় বদ্ধ হবে? মানুষের স্বরূপ কি? চিদানন্দরূপঃ
শিবোহহং। আমিই সেই সচ্চিদানন্দ।’ এরপরেই দৃপ্তকণ্ঠে আবৃত্তি করতেন,
বেদান্তবাক্যেযু সদা রমন্তো, ভিক্ষান্নমাত্রেণ চ তুষ্টিমন্তঃ।
অশোকমন্তঃকরণে চরন্তঃ, কৌপীনবন্তঃ খলু ভাগ্যবন্তঃ।।
এই অবস্থায় আসতে সময় লাগবে আরো সাত-আট বছর। গৌতম বুদ্ধ উদ্যান
পথে ভ্রমণে বেরিয়ে চারদিন চারটি দৃশ্য দেখে সংসার ত্যাগ করলেন। প্রথমদিন
প্রাসাদের পূর্বদ্বার দিয়ে বেরোলেন। দেখলেন, গলিত বৃদ্ধ। দ্বিতীয়বার বেরোলেন
দক্ষিণদ্বার দিয়ে।দেখলেন ব্যাধিগ্রস্ত এক মানুষকে। তৃতীয়বার নিষ্ক্রান্ত হলেন পশ্চিম
দ্বারপথে। দেখলেন শবযাত্রা। শেষদিন বেরলেন উত্তরপথে। দেখলেন এক প্রশান্ত
ভিক্ষুমূর্তি। প্রশ্ন করলেন, সারথি। কে এই প্রশান্ত পুরুষ! সারথির উত্তর, দেব! ইনি
সর্বত্যাগী ভিক্ষু। প্রব্রজ্য প্রাপ্তঃ সমমাত্মন। বোধিসত্ত্ব উৎফুল্ল-এই-ত আমার
জীবন-সাধু সুভাষিত মিদং মম রোচতে চ। প্রব্রজ্য নাম বিদুমিঃ সততং প্রশস্তা।
মহাপ্রভু গয়ায় গেলেন। ঘর সংসার, পাণ্ডিত্যাভিমান, সব ভেসে গেল। সর্বত্যাগী
সন্ন্যাসী। সুরেন্দ্রনাথের গাড়ি দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসছে। বসে আছেন নরেন্দ্রনাথ।
গাড়ি এইবার পূর্বদিকের গেট ধরে ঢুকছে। ঘোড়া এগোচ্ছে পশ্চিমে। শ্রীরামকৃষ্ণের
কাছে আসছেন নরেন্দ্রনাথ। অনেকের ধারণা, ছেলেটা দাম্ভিক, উদ্ধত, অনাচারী।
একজন প্রতিবেশী একদিন বলেই ফেললেন,
‘এই বাড়িতে একটা ছেলে আছে, তার মতো ত্রিপণ্ড ছেলে কখনও দেখিনি।
বি. এ.পড়ছে বলে ধরাকে যেন সরা দেখে-বাপ-খুড়োর সামনেই তবলায় চাঁটি
দিয়ে গান ধরলে, পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে দিয়েই চুরুট খেতে খেতে চলল!’
কেন আসছেন নরেন্দ্রনাথ। মা কালীকে দর্শন করতে? ১৮৫৫ সালের ৩১ মে
মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নরেন্দ্রনাথ পৃথিবীতে নেমেছেন ১৮৬৩ সালের ১২
জানুয়ারি। আর আজ ১৮৮১ সালের ডিসেম্বর মাস। উনিশ বছরের যুবক। আগে
আসেননি। আজ কেন আসছেন! কীসের টানে!
নরেন্দ্রনাথ যখন বালক বিলে তখন একদিন রামায়ণ পাঠের আসরে গেছেন।
মহাবীর হনুমান তাঁর ভীষণ প্রিয়। হনুমানের আদর্শপরায়ণতায় তিনি মুগ্ধ। কথকঠাকুর
কথাপ্রসঙ্গে বললেন, হনুমান কলাবাগানে থাকেন। বীরেশ্বর প্রশ্ন করলেন, সেখানে
গেলে কি তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। কথক ঠাকুরের বিদ্রূপাত্মক উত্তর, হ্যাঁ গো,
গিয়েই দেখ না। বাড়ির কাছেই কলাবাগান। বাড়ি ফেরার পথে সেই অন্ধকারে
কলাঝোপে মহাবীরের প্রতীক্ষায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কোথায় মহাবীর!
এক রাশ হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। বয়স্করা প্রবোধ দিলেন, ওরে বিলে! মহাবীর
আজ বোধহয় প্রভুর কাজে অন্য কোথাও গেছেন।
যুবক নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বরের অনুসন্ধান করছেন। পুরুষ ভগবান। সর্বত্র আছেন।
তাঁর প্রিয় বুদ্ধদেব এবং সাংখ্য প্রবক্তা কপিলদেব পরামর্শ দিলেন-জগতে দুঃখ,
দুঃখ, পালাও, পালাও। পালাব কেন? পক্ষহীন শোনো বিহঙ্গম, এ যে নহে পথ
পালাবার। আমি শঙ্করপন্থী-সন্নাপি অপন্নাপি, ভিন্নাপি অভিন্নাপি-আছে অথচ নেই,
ভিন্ন অথচ অভিন্ন এই যে জগৎ, এর তথ্য দুঃখ আছে কি কী আছে; জুজুর ভয়ে
আমি পালাই না।
কেশবচন্দ্র সেন ‘ব্যান্ড অব হোপ’ নামে একটি দল গঠন করলেন। নরেন্দ্রনাথ
সভ্য হলেন। একদিন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে স্পষ্ট জিজ্ঞেস করলেন, ঈশ্বরকে দর্শন
করেছেন! না, সঠিক কোনো উত্তর মিলল না। আচ্ছা দেখা যাক দক্ষিণেশ্বরের সাধক
কী বলেন! মা কালীকে নয়, উপাসক পরমহংসদেবকে দেখতে এসেছেন।
পশ্চিমের গঙ্গার দিকের দরজা দিয়ে ঢুকছেন নরেন্দ্রনাথ। ঠাকুর যুবকটিকে
দেখছেন, শরীরের দিকে লক্ষ্য নেই। মাথার চুল, শরীরের বেশভূষার কোনো
পরিপাট্য নেই। বাইরের কোনো বস্তুতেই সাধারণ মানুষের মতো আঁট নেই।
ছেলেটির সবই যেন আলগা। চোখ দেখে মনে হল, তার মনের অনেকটা ভেতরের
দিকে কে যেন সর্বদা টেনে রেখেছে। দেখে মনে হল, বিষয়ী লোকের আবাস
কলকাতায় এত বড় সত্ত্বগুণী আধার থাকাও সম্ভব।
মেঝেতে মাদুর পাতা হল। সবাই বসলেন। নরেন্দ্রনাথ গান শোনালেন, মন
চল নিজ নিকেতনে। তখন চার-পাঁচটির বেশি বাঙলা গান নরেন্দ্রনাথ জানতেন
না। গান শুনতে শুনতে ঠাকুর সমাহিত। হেস্টি সাহেব ক্লাসে এই সমাধির কথাই
বলেছিলেন। ট্রান্স। যদি দেখতে চাও দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে এস।
এর পরে যা ঘটল নরেন্দ্রনাথের মনে হল পাগলামি। হঠাৎ নরেন্দ্রনাথের হাত
ধরে ঠাকুর উত্তরের বারান্দায় নিয়ে গেলেন। দরমা দিয়ে ঘেরা। দরজা বন্ধ করে
দিলেন। সেই নিভৃতিতে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের বন্দনা করলেন। দু চোখে জলের
ধারা। বললেন, ‘জানি আমি প্রভু, তুমি সেই পুরাতন ঋষি, নররূপী নারায়ণ; জীবের
দুর্গতি দূর করার জন্যে শরীর ধারণ করে আবার এসেছ।’ ঘরে ফিরে এসে প্রশ্ন
করলেন, ‘তুই কি ঘুমোবার আগে একটা জ্যোতি দেখিস?’ হতচকিত নরেন্দ্রনাথ
বললেন, ‘আজ্ঞে দেখি।’ ঠাকুর বললেন, ‘বাঃ সব মিলে যাচ্ছে। এ ধ্যান সিদ্ধ। জন্ম
থেকেই ধ্যানসিদ্ধ।’ পরে বলবেন, ‘নরেন্দ্রের অখণ্ডের ঘর।’ অখণ্ড মানে ব্রহ্ম।
শ্রীরামকৃষ্ণ কালী। তিনি বলবেন, ব্রহ্মের মায়া। শিবের শক্তি কালী। এইবার তাহলে
বোঝা গেল, কেন নরেন্দ্র ঠাকুরের শ্বশুরঘর। তোমার অখণ্ডের ঘর সেইটাই
শ্বশুরঘর। সেই ঘরেই মায়ার কোলে কোটী জীবের জন্ম।
ব্যাকুল নরেন্দ্রনাথের সেই এক প্রশ্ন-‘মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বরদর্শন করেছেন?’
সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরের দৃঢ় উত্তর, ‘হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরদর্শন করেছি, ঠিক যেমন
তোমাদের দেখছি। আরো ঘনিষ্ঠরূপে। ঈশ্বরদর্শন হয়, তাঁকে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে
কথা বলা চলে, ঠিক যেমন আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি। কিন্তু কে তা চায়?’
নরেন্দ্রনাথ ফিরে এলেন এই বোধ নিয়ে, উন্মাদ হলেও সত্যই একজন উঁচুদরের
সত্যদ্রষ্টা মহাপুরুষ। শ্রীরামকৃষ্ণ একবারও তাঁকে বললেন না, যাও মন্দিরে গিয়ে
মাকে প্রণাম করে এস। মায়ের রহস্য আর নরেন্দ্রনাথের রহস্য তাঁর কাছে জমা
রইল। পরে বলবেন, ওকে জানতে পারলে এই পৃথিবীতে আর থাকবে না।
নরেন্দ্রনাথ নিজের পরিচয় জানতে পারবেন আরো পরে অমরনাথ আর ক্ষীরভবানীতে
গিয়ে।
সংসারে একুশটা বছর নরেন্দ্রনাথের রাজকীয় জীবন। পিতার বিপুল উপার্জন।
খাওয়া-দাওয়া গান বাজনা। বিশাল পরিবার, অনেক আশ্রিত। ‘প্রিন্সের’ জীবন।
এফ. এ. পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই ধনীর কন্যার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব। ১৮৮৪, ২৫
ফেব্রুয়ারি, রাত দশটা পিতা বিশ্বনাথ হঠাৎ দেহত্যাগ করলেন। আকাশ ভেঙে পড়ল।
সন্ন্যাসী দুর্গাপ্রসাদ যেন অন্তরালে ছিলেন। নাতি নরেন্দ্রনাথকে বললেন যে-আর
কী! যা চেয়েছিলে তাই করে দিয়েছি। সব চুরমার। ছিল প্রচুর এখন নিঃস্ব। হাঁড়ি
চড়বে না। জ্ঞাতি-শত্রুরা পুরো পরিবারটিকেই রাস্তায় নামিয়ে দেবে। ফ্রম প্রিন্স
টু পপার।
দুঃখের এই অন্ধকারে আলো দেখাবে কে! বাতি ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণ। ঠাকুরকে
ধরলেন নাছোড়বান্দা, ‘আপনি মাকে বলে দিন। আমাদের ভীষণ অর্থকষ্ট। অন্ন কষ্ট।
উপবাসে দিন যায়।’
‘মাকে মানিস না যে, তাই তোর এত কষ্ট! আমি মাকে ওসব বলতে পারব
না। তুই সোজা চলে যা। মাকে নিজেব মুখে বল। যা চাইবি তাই পাবি।’
অনেক ভাবে নবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বললেন, আমার আর্জিটা মায়ের কাছে পেশ
করে দিন। ঠাকুর বললেন, ‘তুই বলবি কী, আমি অনেকবার বলেছি, ‘মা, নরেন্দ্রের
দুঃখ-কষ্ট দূর কর!’ তুই মাকে মানিস না, সেইজন্যেই ত মা শোনেন না। আচ্ছা
আজ মঙ্গলবার, আমি বলছি, আজ রাতে কালীঘরে গিয়ে মাকে প্রণাম করে তুই
যা চাইবি মা তোকে তাই দেবেন।’
নরেন্দ্রনাথ চলেছেন মায়ের কাছে। যেতে যেতে কেমন একটা ঘোর লেগে গেল।
একটা নেশা। জগৎ ভুল। হাসি মুখে মা, দুটি হাত তুলে অপেক্ষা করে আছেন।
ধাপে ধাপে সে উঠে আসছে। দুঃখের পথ মাড়িয়ে আসছে। মা ডাকছেন, আয়,
আয়। হয়ে যাক শাক্তের সঙ্গে শক্তির খেলা। নরেন্দ্রনাথ প্রথম দর্শনেই বিভোর।
শ্রীরামকৃষ্ণের কালী। চিন্ময়ী। প্রাণচঞ্চলা। অনন্ত প্রেম, সৌন্দর্য, করুণা। নরেন্দ্রনাথ
বার বার প্রণাম করছেন, ‘দাও মা দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও, জ্ঞান দাও, ভক্তি
দাও।’ উদ্ভাসিত আনন্দের পথ ধরে ফিরে এলেন ঠাকুরের কাছে। ‘কি রে চেয়েছিস?’
‘যাঃ, ভুলে গেছি!’ ‘আবার যা’। বার বার তিন বার। নরেন্দ্রনাথ এলেন গেলেন।
বিষয় চাইতে পারলেন না। লাউ-কুমড়ো চাইতে লজ্জা করল। চৈতন্য ছাড়া আর
কিছু চাইবার নেই। এপাশে রামকৃষ্ণ-কালী ওপাশে মা কালী তিনবার আসা যাওয়া।
ত্রিদণ্ডী বিশ্বাসের উজ্জ্বল উপবীত। নরেন্দ্রনাথকে ধারণ করালেন ঠাকুর। অদ্ভুত এক
উপনয়ন। দণ্ডধারী, গেরুয়াধারী নরেন্দ্রনাথ প্রকাশিত হবেন বিশ্বে-বীর সন্ন্যাসী
বিবেকানন্দ।
জহুরীই জহর চেনেন। ‘জানতুম পারবি না। আচ্ছা যা, তোদের ভাত-কাপড়ের
অভাব হবে না।’ অদ্ভুত ঠাকুরের সে কি হই হই আনন্দ, ‘আমার নরেন কালী
মেনেছে। আবার বলেছে, আমাকে মায়ের গান শিখিয়ে দাও। শিখিয়ে দিয়েছি-মা
ত্বং হি তারা।’