ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহীদেব জন্যেই এসেছিলেন। অবশ্যই। তিনি ছিলেন মানুষের
কারবারী। মানুষ আমার বিষয়। চতুর্দিকে পোকার মতো মানুষ কিলবিল করছে।
‘পোকা’ শব্দটির নিষ্ঠুর প্রয়োগ। বললেন না ‘অমৃতের পুত্র’। বললেন, মানবজন্মের
একমাত্র উদ্দেশ্য হল ঈশ্বরলাভ। বললেন, এই দুর্লভ মানুষ জনম পেয়ে আমার
দরকার তাঁর পাদপদ্মে যেন ভক্তি হয়। ঈশ্বরকে জানার নাম জ্ঞান, ঈশ্বরকে না জানার
নামই অজ্ঞান।
জানোয়ার থেকে জান্তা হতে হবে। তোমার স্রষ্টা তোমার সঙ্গে নিষ্ঠুর এক
রসিকতা করেছেন। স্বরূপ ভুলিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। ফিতে মাপা দুটি পিল্পে জন্ম
আর মৃত্যু। মায়া দিয়ে ঘেরা। কখনো সুন্দরী, কখনো পিশাচী। সবাই ভেল্কিই দেখতে
চায়, জাদুকরকে কেউ দেখতে চায় না।
আমিই সেই, আমিই ব্রহ্ম একথা তুমি তখনই বলতে পারবে যখন তোমার আমি
বোধটা থাকবে না। আমি-আমারযতক্ষণ আছে ততক্ষণ তুমি মায়ার বশ। আর কলির
মায়া হল, কাম কাঞ্চন। হবেক রকমের বাসনা। নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে মারবে।
দুনিয়া জোড়া তাণ্ডব-বিষয় আর বিষয়ী এই হল সার্কাস।
তাই যদি হবে, এইটাই যদি আমাদের ভাগ্যের লিখন হয়, তাহলে তিনি কষ্ট
করে দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মালেন কেন! শরীর পাত করা সাধন করলেন কেন!
দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পঞ্চাশ বছরের জীর্ণ শরীরখানি যখন ছেড়ে
গেলেন, তখন হাড়ের খাঁচাটি ছাড়া আর কিছু নেই। তাঁর দেহাবসানের চার বছর
পরে, ১৮৯০ সালে নরেন্দ্রনাথ তাঁর পরমসুহৃদ কাশীর জমিদার প্রমদাবাবুকে
লিখছেন, ‘আমি রামকৃষ্ণের গোলাম-তাঁহাকে ‘দেই তুলসী তিল দেহ সপর্পিণু’
করিয়াছি। তাঁহার নির্দেশ লঙ্ঘন করিতে পারি না। সেই মহাপুরুষ যদ্যপি ৪০
বৎসরযাবৎ এই কঠোর ত্যাগ, বৈরাগ্য এবং পবিত্রতা এবং কঠোরতম সাধন করিয়া
ও অলৌকিক জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম ও বিভূতিমান্ হইয়াও অকৃতকার্য হইয়া শরীর ত্যাগ
করিয়া থাকেন, তবে আমাদের আর কি ভরসা।’
শ্রীরামকৃষ্ণ কী করতে চেয়েছিলেন! উত্তর, স্বামীজি যা করেছেন। যে কর্মপ্রবাহ
প্রবাহিত করে গেছেন। দক্ষিণেশ্বরের দেবভূমি থেকে সামান্য সামান্য সংবাদ চুঁইয়ে
চুঁইয়ে আসতে লাগল কলকাতার ভোগীসমাজে। মানুষ তৈরি সন্ন্যাসী দেখেছে।
গেরুয়াধারী, মালাধারী। কোনো গেরুয়ায় লালের ভাগ বেশি, কোনো গেরুয়ায়
হলুদ বেশি। সন্ন্যাসী তৈরি হওয়াটা তাঁরা দেখেননি। সেটি গুরুশিষ্যের নিভৃত
ব্যাপার। সাধারণ মানুষ ধর্মের জগতের যাঁদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা হলেন
পুরোহিত। শাস্ত্র ব্যবসায়ী। গৃহীরা তাঁদের কাছে যজমান। পাওনা-গণ্ডা নিয়ে দরদস্তুর
চলে। এঁরাশালগ্রামের অধিকারী। গামছাধারী। পূজার শেষে চাল-কলা বাঁধেন। বগলে
ছাতা। শ্রাদ্ধের পাওনা। বিবাহে চার হাত এক করেন। শ্রাদ্ধে পিণ্ডদান করে মৃতকে
পরলোকে পার্সেল করে দেন।
বাংলার বৈষ্ণবকুল তখন প্রবল। ভাগবতাচার্যদের বিশাল দাপট। মহাপ্রভু বিরাট
সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন। ভেকধারী বৈষ্ণবরা ‘নাম’নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
মন্ত্র হল-নামে রুচি, জীবে দয়া। হরের্নামৈব কেবলং। বালক গদাধর কামারপুকুরের
সংসার জীবন দেখছেন, যেন দূর কোনো গ্রহ থেকে বেড়াতে এসেছেন। লাহাবাবুরা
সম্পন্ন মানুষ। কামারপুকুরের অগ্নিকোণে পুরী যাওয়ার পথের ধারে জমিদার
লাহাবাবুরা যাত্রীদের জন্যে সদাব্রত পান্থশালা নির্মাণ করে রেখেছেন। অতিথিশালার
আকর্ষণে বালক ছুটে যেতেন। কোথাও রামায়ণ পাঠ হচ্ছে। কোথাও ভাগবত।
শৈশব স্মৃতির কথা বলছেন, ‘বসে বসে শুনতুম। তবে যদি ঢং করে পড়ত, তাহলে
তার নকল করতুম, আর অন্যদের শোনাতুম। মেয়েদের ঢঙ বেশ বুঝতে পারতুম!
তাদের কথা, সুর নকল করতুম। সাধুরা যা পড়ত, বুঝতে পারতুম। পণ্ডিত এসে
সংস্কৃতে কথা কইলে বুঝতে পারতুম।’ গান শোনামাত্রই শিখে যেতেন-‘ধরো না
ধরো না রথচক্র, রথ কি চক্রে চলে…।’ এক এক যাত্রার সমস্ত পালাটাই গেয়ে দিতে
পারতুম।
সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী দেখার অফুরন্ত সুযোগ এগিয়ে দিচ্ছে লাহা জমিদারদের ওই
পাস্থধাম। রমতা সাধুরা আসছেন, থাকছেন, চলে যাচ্ছেন। আসক্তিহীন মানুষ।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধু। শাস্ত্র আলোচনা করছেন। ইট সাজিয়ে কাঠের আগুনে
যা হয় কিছু ফুটিয়ে নিচ্ছেন। চলে যাওয়ার পর পড়ে থাকছে, পোড়া ইট, কাঠ,
ছাই। দেখছেন ধর্মনির্ভর গৃহীদের। ঢং করে পুরাণ পড়ে শোনাচ্ছেন পোড় খাওয়া,
পাকা বাঁশ সংসারীদের। প্রণামী ট্যাঁকে পুরে বেরিয়ে পড়ছেন আর এক আসর মাত
করতে। এঁদের দেখেছিলেন বলেই পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
বলতে পেরেছিলেন তাঁর ভক্তদের, এক ভাগবত পাঠক রোজ রাজামশাইকে ভাগবত
শোনান। পড়া শেষ হলে রাজামশাইকে জিজ্ঞেস করেন, রাজামশাই কিছু বুঝলেন?রাজা
বলেন, আগে তুমি বোঝো। রোজই এই এক ব্যাপার। ঠাকুর বলছেন, ‘লোকটা
সাধনভজন করত-ক্রমে চৈতন্য হল। তখন দেখলে যে হরিপাদপদ্মই সার, আর
সব মিথ্যা। সংসারে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। কেবল একজনকে পাঠালে রাজাকে
বলতে যে-রাজা, এইবার বুঝেছি।
আর একটি গল্প বলতেন। শুরুতেই বাস্তবদর্শন, ‘সংসারী লোকের অবসর কই?
একজন একটি ভাগবতের পণ্ডিত চেয়েছিল। তার বন্ধু বললে, একটি উত্তম
ভাগবতেব পণ্ডিত আছে, কিন্তু তার একটু গোল আছে। তার নিজের অনেক চাষবাস
দেখতে হয়। চারখানা লাঙল, আটটা হেলে গরু। সর্বদা তদারক করতে হয়, অবসর
নাই। যার পণ্ডিতের দরকার সে বললে, আমার এমন ভাগবত পণ্ডিতের দরকার
নেই। যার অবসব নেই। লাঙল-হেলেগরু-ওয়ালা ভাগবত পণ্ডিত আমি খুঁজছি না।
আমি এমন পণ্ডিত চাই যে আমাকে ভাগবত শোনাতে পারে।’
বলেই বলছেন, ‘তবে কি এদের ঘৃণা করি?’
ঘৃণা করবেন কেন? তিনি যদি ঈশ্বর হন, ভগবান হন, তাহলে তিনি এসেছেন
তাঁর জমিদারিতে। তিনি সেই স্রষ্টার ‘অ্যামবাসাডর’। কিছু ওষুধ-বিষুধ নিয়ে
এসেছেন। ভবরোগের বৈদ্য তিনি। কখনো মানুষ, কখনো ভগবান। অবতার আর
সাধকে এই তফাত। সাধকের গতি একমুখী। তিনি এগোচ্ছেন। ঈশ্বরের দিকে। আর
অবতার? তিনি এগোতেও জানেন পেছতেও জানেন। ফোর ডাইমেনসানে তাঁর
বিচরণ। কখনো সসীমে, কখনো অসীমে।
ঠাকুর বলছেন, ‘তবে কি এদের ঘৃণা করি? না, তখন ব্রহ্মজ্ঞান আনি। তিনিই
সব হয়েছেন-সকলেই নারায়ণ। কামারপুকুরে বালক গদাধরের দর্শন ছিল, সিদ্ধান্ত
ছিল না। পৃথিবীর নিয়মে বালক ভগবান বালকই। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে কোনো
অলৌকিকত্ব নেই। তিনি পুরাণের চরিত্র নন, ইতিহাসের চরিত্র। বারে বারে বলতেন,
আমি তোমাদেরই মতো মানুষ একজন। তোমাদের জীবনের অংশীদার। তোমাদের
সঙ্গে আমার সামান্য যে তফাত, তা হল-আমি দেখি, ভেতরে দেখি, বাইরে দেখি।
নিরাসক্ত হয়ে দেখি। আমার কাছে একটিই মাত্র অলৌকিক জিনিস আছে-একটি
দিব্য চালুনি। মানুষকে চেলে আলাদা করি। মোটা দাগের মানুষ আর সূক্ষ্ম বোধের
মানুষকে।
‘ঈশ্বরের সৃষ্টিতে নানা রকম জীবজন্তু, গাছপালা আছে। জানোয়ারের মধ্যে ভাল
আছে মন্দ আছে। বাঘের মতো হিংস্র জন্তু আছে। গাছের মধ্যে অমৃতের ন্যায় ফল
হয় এমন আছে; আবার বিষফলও আছে। তেমনি মানুষের মধ্যে ভাল আছে, মন্দও
আছে; সাধু আছে অসাধুও আছে; সংসারী জীব আছে আবার ভক্ত আছে।’
মানুষের প্রকার আলাদা করছেন। বলছেন চারপ্রকারের মানুষ আছে। বদ্ধজীব,
মুমুক্ষুজীব, মুক্তজীব আর নিত্যজীব। নিত্যজীব পুরাণের চরিত্র, যেমন নারদ। এঁদের
ভূমিকা সংসারে থাকেন মানুষের মঙ্গলের জন্যে। শিক্ষা দেবার জন্যে। বদ্ধজীব কী
রকম? বিষয় ছাড়া কিছু জানে না। জানতেও চায় না। কে ভগবান? ভুলেও
ভগবানের চিন্তা করে না। চিন্তা করার দরকার হয় না। সংসারের মতো উত্তেজনা
ছেড়ে অদৃশ্য, অলৌকিক ভগবানের জন্যে মাথা খারাপ করার মানে হয় না।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গায়েই যদু মল্লিকের বাগান। সেখানে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর
এসেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘কর্তব্য কি?
ঈশ্বর চিন্তা করাই আমাদের কর্তব্য কি না?’ যতীন্দ্র বললে, ‘আমরা সংসারী লোক।
আমাদের কি আর মুক্তি আছে! রাজা যুধিষ্ঠিরই নরকদর্শন করেছিলেন!’ তখন
আমার বড় রাগ হল। বললুম, ‘তুমি কী রকম লোক গা! যুধিষ্ঠিরের কেবল
নরকদর্শনই মনে করে রেখেছ? যুধিষ্ঠিরের সত্যকথা, ক্ষমা, ধৈর্য,বিবেক, বৈরাগ্য,
ঈশ্বরে ভক্তি-এসব কিছু মনে হয় না!’
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহীদের দ্বারাই পরিবেষ্টিত ছিলেন। কামারপুকুর থেকে
ঝামাপুকুর। সেকালের বিরাট ধনী রানী রাসমণির দেবালয়ের পূজারী। ঘোরতর
বিষয়ীদের আড়তে নিষ্কলুষ এক যুবক। আত্মমগ্ন। পূজাকে বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করার
কোনো বাসনাই নেই। চালচলন দেখলেই মনে হয় জগৎছাড়া মানুষ। চারপাশে
যাঁরা রয়েছেন তাঁরা কেমন। কোনো কোনো কর্মচারী পরদারসেবী। রাতের বেলা
তাঁরা অন্যজগতে বিচরণ করেন। কোনো শরিক মন্দিরের আলু, কপি, আনাজপত্র
গাড়ি বোঝাই করে বাড়িতে চালান দিচ্ছেন। স্থানীয় মানুষ গঙ্গার ঘাটে এসে তেল
মাখতে মাখতে পরচর্চা করছেন। মাঝে মধ্যে বিরাট ঘটা করে উৎসব হচ্ছে। যাত্রা,
গান। দক্ষিণেশ্বর থেকে কুটিঘাট পর্যন্ত গঙ্গার তীর আলোর মালায় সজ্জিত হচ্ছে।
পরে ভক্তদের বলেছিলেন, ‘রাসমণি কালীবাড়ি করেছেন, এই কথাই লোকে বলে।
কেউ বলে না যে ঈশ্বর করেছেন।’ জমিদার মথুরবাবু, রানীর সেজ জামাই সেই
রকমই তো চান। অর্থ, বিত্ত মানুষকে রজোগুণী করে, অহঙ্কারী করে। তাঁর দৃষ্টিতে
শ্রীরামকৃষ্ণ মিষ্টি একটি ছেলে। তিনি অন্যান্যদের মতো চাকর নন। ত্রাণকারী পণ্ডিত
রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভ্রাতা। তাঁর সুচিন্তিত বিধানের ফলেই মন্দির-প্রতিষ্ঠা সম্ভব
হয়েছে। তিনি সম্মানিত, শ্রদ্ধেয়। চালকলা বাঁধা সামান্য পুরুত নন। তাঁর ছোট
ভাই শ্রীরামকৃষ্ণ।
সেজবাবুর নজর পড়ল। অনেক লোভী মানুষের সমাবেশে এই নির্লোভ, সুমিষ্ট
যুবকটিকে আমার ভাল লেগেছে। শিল্পবোধ আছে। অপূর্ব মূর্তি পড়েছে মহাদেবের।
বিষয়ীদের ধারেকাছে সহজে আসে না। গঙ্গার তীর তার বিচরণভূমি। ধুরন্ধর
মথুরামোহন। লেঠেল দিয়ে জমিদারি চালান। তাঁর শাশুড়ী, রাসমণি, রানী, আরো
বেপরোয়া। ইংরেজদের কাঁপিয়ে দিয়েছেন। সেজবাবু সদ্য যুবক এই ছেলেটিকে
ধরলেন; কিন্তু প্রকৃত কে ধরলেন? ধরলেন, মা কালী! রানী সদলে কাশী যাচ্ছিলেন।
প্রথমে ধরা পড়লেন তিনি। কাশী থেকে কালী। এক মতে, নৌকার-বহর দক্ষিণেশ্বর
পর্যন্ত এসে থেমে পড়ল। রাতের বিশ্রাম। স্বপ্ন। রাসমণি। যাও কোথায়? আমি
গঙ্গার তীরে তোমার পূজা গ্রহণ করব। আমাকে প্রতিষ্ঠা করো! ‘গঙ্গার পশ্চিমকুল
বারাণসী সমতুল।’ মথুরবাবু বালিতে ভূমি সংগ্রহের চেষ্টা করলেন। বিরোধী
ভূস্বামীদের শত্রুতায় জমি পাওয়া গেল না। এর পেছনেও মায়ের হাত। শাস্ত্রসম্মত
উপযুক্ত স্থান রয়েছে পূর্বতীরে। শক্তির শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান কুর্মপৃষ্ঠ শ্মশান।সুপ্রীমকোর্টের
অ্যাটর্নি হেস্টি সাহেবের জমি। একাংশ একটি কুঠি। আর একদিকে মুসলমানদেব
কবরডাঙ্গা আর গাজীসাহেবের দরগা। প্রায় ছশো ফুট গঙ্গার দিকের পোস্তার
নির্মাণকাজ শেষ হল। সুন্দর ঘাট তৈরি হল। প্রবল বানে সব চুরমার হয়ে গেল।
তখন নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেওয়া হল সাহেব কোম্পানি ‘ম্যাকিন্টশ’কে।
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম অনুসন্ধান ছিল পৃথিবীর এই মায়াভূমিতে-প্রস্তরে কি প্রাণ
থাকে। সেই সন্দেহ নিরসন করেই মা আসন নিলেন রৌপ্যসিংহাসনে। মন্দির নির্মাণে
বিলম্ব। মূর্তি পাছে ভেঙে যায় তাই প্যাকিং বাক্সে নিরাপদ। অনেকদিন হয়ে গেল।
রাতে রানী স্বপ্ন পেলেন, ‘আর কতদিন এইভাবে আমাকে আবদ্ধ করে রাখবি?
আমার যে বড় কষ্ট হচ্ছে রাসমণি!’ প্যাকিং বাক্স খুলে দেখা গেল, মা ঘেমে গেছেন।
জীবন্ত মাকে সাধারণ পূজারী কেমন করে পূজা করবেন। মা নিজের ব্যবস্থা
নিজেই করে রেখেছেন। কেউ জানে না। ক্রমে জানবেন। এমন কাণ্ড ঘটাবেন,
যা শুধু ধর্ম নয় ইতিহাস। মথুরবাবু বললেন, ‘গদাধর তুমি হবে মায়ের বেশকারী।
মাকে মনের মতো করে সাজাবে। গান শোনাবে, কোন হিসাবে হর হৃদে দাঁড়িয়েছ
মা পদ দিয়ে।’
বেশকার থেকে পূজারী। মন্ত্রের ফাঁকে ফাঁকে কাতর প্রার্থনা-দেখা দাও। দেখা
না দিলে আমি মরে যাব। আমি চুরমার হয়ে যাব। আমি মূর্খ বলে দেখা দিবি না।
মা হাসছেন। হাসছিস পাষাণী! তা হলে এই নে। ছাগলের বদলে মানুষ। নরশির।
আহা! মা ত! পাথরের মা হলে কী হবে! যত মন্ত্র, যত নিবেদন সব ত জীবন্ত
মায়ের কাছে! মায়ের মুখ শুকিয়ে গেল। শ্মশানবাসিনী, মৃত্যুরূপ কালীও আতঙ্কিত।
করিস কী, করিস কী। বিচ্ছুরিত আলো। তরঙ্গায়িত জ্যোতিঃ। ঢেউয়ের পর ঢেউ।
পেলব পূজারী সংজ্ঞা হারালেন। গর্ভমন্দিরের চৌকাঠ দীর্ণ হল। পূজার যত সামগ্রী
মুহূর্তে চৈতন্য লাভ করল। চারপাশ জমজম করে উঠল। সেই গণ্ডির বাইরে সব
থমথমে। যে আসে তার বুক কাঁপে। এ প্রাণ প্রতিষ্ঠা সাধারণ পুরোহিতের সাধ্যের
বাইরে।
শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম ধরা দিলেন এক গৃহীকে। তিনি হলেন স্বয়ং মথুরবাবু। মথুরবাবু
এ কী দেখছেন! ছোট ভটচাজ্ কুঠিবাড়ির বারান্দায় পায়চারি করছেন। যখন ওদিকে
যাচ্ছেন শিব। যখন ওদিক থেকে এদিকে আসছেন মা কালী। শিক্ষিত মথুরামোহন।
প্রিন্স দ্বারকানাথ তাঁর বন্ধু। যুক্তিবাদী-যুগের তরতাজা এক তরুণ। আলৌকিকে
অবিশ্বাসী। গদগদ ভক্তি তাঁর নেই। নিশ্চয় দৃষ্টি বিভ্রম! বার বার সেই একই দর্শন!
তাহলে ইনি কে? ছুটে গিয়ে পায়ের কাছে নতজানু। পড়ে রইল আরামকেদারা,
ফরসির নল। তছনছ হয়ে গেল সম্ভ্রান্তের অহংকার। প্রভুর পদতলে লুটিয়ে দিলেন
পদমর্যাদা। ‘আমি ধরে ফেলেছি তোমাকে। ছোট ঠাকুর। আর লুকাবি কোথায় মা
কালী! আমি তোমার সেবক! আমি জেনেছি, তোমার সেবা করার জন্যেই আমি
পৃথিবীতে এসেছি!’
বিজ্ঞান আর ভগবান এই তর্কেরও অবসান। প্রকৃতির নিয়মে জগৎ চলছে।
বেনিয়ম হতে পারে না। ভগবানও অসহায়। উনবিংশ শতকের কলকাতায় বুদ্ধি
ও বিজ্ঞানের ঝোড়ো বাতাস বইছে। যুক্তির যুগ। ঈশ্বরও প্রাকৃতিক নিয়মের বশ।
কলকাতায় তখন অনেক ইন্টেলেকচুয়াল। অগ্রগণ্য ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার।
মথুরবাবুর পারিবারিক চিকিৎসক। পরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক হবেন। ডঃ
সরকার বিজ্ঞান পরিষদ স্থাপন করেছিলেন। গিরিশচন্দ্র সদস্য ছিলেন। শুধু ধর্মচর্চা
নয় বিজ্ঞান চর্চাও সমানতালে চলেছে।
দক্ষিণেশ্বরে একদিন মথুরবাবু শ্রীরামকৃষ্ণকে বলে বসলেন, ভগবানও নিয়মের
অধীন। নিয়ম বহির্ভূত কাজ তিনিও করতে পারবেন না। তর্কটা এই দাঁড়াল, নিয়মের
ভগবান, না ভগবানের নিয়ম! শ্রীরামকৃষ্ণের দৃঢ় বিশ্বাস, সবই মায়ের ইচ্ছা। তিনি
মায়ের কোলে বসে আছেন।
মথুরবাবু বললেন, কই দেখি, লাল জবা গাছে তিনি সাদা জবা ফোটান ত!
শিব আর কালী দেখেছিলেন, এইবার দেখলেন, একই ডালে লাল আর সাদা জবা।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, মায়ের ইচ্ছে হলে তাও হতে পারে। যেদিন তর্ক হলো,
তার পরের দিন সকালেই এই ঘটনা। মথুরবাবু স্তম্ভিত।
মায়ের পূজারী শ্রীরামকৃষ্ণ জগদগুরু হবেন। তারই প্রকাশ রাসমণিকে শাসন।
মন্দিরের কর্মচারীরা আঁতকে উঠলেন। সর্বনাশ! রানীমাকে চড় মেরেছেন। চাকরিটা
এইবার গেল! যাও, গাঁয়ে গিয়ে ভিখ মেগে খাও। রানী জপআর বিষয়চিন্তা
করছিলেন। প্রথম কৃপা তাঁর ওপরেই বর্ষিত হল। মৃদু আঘাতে চমকে উঠলেন।
জড়সড় হয়ে গেলেন অপরাধীর মতো। এ ত সাধারণ মানুষ নয়! মন পড়তে পারেন।
বই পড়তে না পারলে কী হবে। ঈশ্বরের লেখা এই মানুষটি পড়তে পারেন। মা
কালীকে যিনি পেয়েছেন, তিনি ত পঞ্চাশৎ বর্ণমালাও পেয়ে গেছেন। মায়ের গলার
মুণ্ডমালায় ঝুলে আছে পঞ্চাশটি বর্ণ। মা যে অনন্তের কেতাব।
মন্দিরের নায়েব, খাজাঞ্চি, কর্মচারী, দক্ষিণেশ্বর গ্রামের অধিবাসী, কেউ চিনল
না। চিনলেন তিনজন। মালী ভর্তাভারী, রসিক মেথর আর মন্দিরের পাশে সরকারী
বারুদখানার প্রহরী, সৈন্যবাহিনীর কুঁয়ার সিং।
ধর্মের জগতের স্বাভাবিক নিয়ম-সাধনার পর সিদ্ধি। ইষ্টদর্শন। শ্রীরামকৃষ্ণের
ক্ষেত্রে বিপরীত-আগে সিদ্ধি, তারপর শাস্ত্রধরে সাধন। গুরুব মর্যাদা, গুরুর
প্রয়োজন যেন ফুরিয়ে না যায়! মানুষের ছদ্মবেশে স্বয়ং ভগবান বসে আছেন
দক্ষিণেশ্বরে। গুরুরা সেটি না জেনেই পরীক্ষা দিতে আসছেন। প্রথম গুরু বিদুষী ভৈরবী।
আদেশ পেয়েছেন, তিনজনকে তন্ত্রসাধন করাতে হবে। দু’জনের দেখা পেয়েছেন পূর্ব
দেশে। তৃতীয়জন রয়েছেন দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার ধারে। খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছেন
এক সকালে।
তন্ত্রসিদ্ধ হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। চৌষট্টি তন্ত্রের দুরূহ সাধনা অক্লেশে, অনায়াসে
শেষ করলেন। প্রায় চার বছর ধরে তন্ত্রসাধন চলেছিল। এরপর শিষ্য শ্রীরামকৃষ্ণ
হলেন গুরুর গুরু। ভৈরবী। তুমি যে এখনো অপূর্ণ। তন্ত্র আমাকে দিলে, গ্রহণ করলুম।
স্বীকার করলুম, এইবার তুমি চলে যাও বৃন্দাবনে। জ্ঞানের অহঙ্কার, অধিকারের অভিমান
ফেলে দিয়ে প্রেম সাধ। নাহং, নাহং, তুই তুই। ঈশ্বর হলেন প্রেম। তিনি সমন্বয়।
বহুকোণ বিশিষ্ট একটি রত্ন।
এর পর শ্রীরামকৃষ্ণ সন্ন্যাস নিলেন। গুরু নিজেই এলেন পরিব্রাজকাচার্য
পরমহংস শ্রীমৎ তোতাপুরী। জটাজুটধারী, দীর্ঘদেহী, পুরী সম্প্রদায়ের সাধু। তন্ত্র
করলে, মধুরভাব সাধলে, এবার নিরাকারে চলো। বেদান্তের পথ ধরে সমাধিতে।
অতি গোপনে পঞ্চবটীর সাধনকুটিরে শুরু হল সাধন। বিরজা হোম সমাপ্ত। শিখা,
সূত্র ত্যাগ। ‘আমি’র বিসর্জন হোমাগ্নিতে। তোমার মৃত্যু হল। তুমি এখন ব্রহ্মলীন।
ওঠো, উঠে যাও, ঊর্ধ্বে, আরো ঊর্ধ্বে। অনন্তে। গভীর রাত। আসনে শিষ্য। ভ্রমধ্যে
দৃষ্টি নিবদ্ধ করো। নির্বিকল্প আত্মধ্যান। এই প্রথম ভগবান হার স্বীকার করলেন মানুষ
গুরুর কাছে। শিবরূপী শ্রীরামকৃষ্ণ ব্রহ্মে প্রবেশ করতে পারছেন না। শক্তি সামনে
এসে দাঁড়াচ্ছেন। ভ্রমধ্যে মা কালী হাসছেন। শুভ্র দন্তপংক্তি। বিজলি ঝিলিক।
ওগো। আমি পারছি না। মায়া থেকে বেরতে পারছি না। রূপ থেকে অরূপে
যেতে পারছি না। আমার হচ্ছে না।
মধ্য রাত। হোমের শিখা সংযত। গুরুর হুঙ্কার, কেঁও হোগা নেহি।
ঘরের কোণে এক টুকরো ভাঙা কাচ। ফলার তীক্ষ্ণ দিকটা ভুরুর মাঝখানে জোরে
চেপে ধরে বললেন, হিয়া রাখো।
শ্রীরামকৃষ্ণ জ্ঞান খঙ্গা বের করলেন। এবার যেই মা এলেন মোহিনীমূর্তিতে
সঙ্গে সঙ্গে কেটে দুখণ্ড করে দিলেন। মন হুহু করে এই নামরূপ রাজ্যের ওপরে
উঠে গেল। গুরু তোতাপুরী অনেকক্ষণ বসে রইলেন সামনে। শ্রীরামকৃষ্ণ এই
সাধনার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলতেন, ‘মন হুহু করে সমগ্র নামরূপ রাজ্যের
ওপরে চলে গেল-আমি সমাধিস্থ হলাম।’ নাগা সন্ন্যাসী ল্যাংটা তোতাপুরী
সাধনকুটিরের দরজায় তালা দিয়ে বাইরে পাহারায় বসলেন। ভেতর থেকে ইঙ্গিত
এলে দরজা খুলে দেবেন। দিন গেল, রাত এল, তিন দিন এইভাবে অতিবাহিত
হল। গুরু তোতাপুরী ভয় পেলেন। কী হল! তালা খুলে কুটিরে প্রবেশ করলেন।
যেমন রেখে গিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ঠিক সেই ভাবেই বসে আছেন। দেহ যেন
প্রাণহীন; কিন্তু মুখমণ্ডল প্রশান্ত গম্ভীর, জ্যোতির্ময়। নিবাত নিষ্কম্প একটি দীপশিখা।
এই মূর্তিই আজ মন্দিরে মন্দিরে। গৃহীর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। অজুত কণ্ঠে বন্দিত,
খণ্ডন ভব-বন্ধন, জগ-বন্দন বন্দি তোমায়।
নিরঞ্জন, নর-রূপ ধর, নির্গুণ গুণময়।।
অশ্রুসিক্ত শতচক্ষু। নরদেব দেব, জয় জয় নরদেব। তুমি ভববৈদ্য। গুরু
তোতাপুরী বিস্মিতি–‘য়হ ক্যা দৈবী মায়া!’ইয়া, দৈবী মায়া! এই অবস্থায় আসতে
গুরুর লেগেছিল ছেচল্লিশ বছর, শিষ্যের লাগল মাত্র তিনদিন।
একটানা এগারো মাস দক্ষিণেশ্বরে থেকে তোতাপুরী যেমন এসেছিলেন ঠিক
সেই ভাবেই চলে গেলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের পথ ঠিক করে নিলেন, ‘রসে বশে’
থাকব। শুকনো সন্ন্যাসী হব না। ওপরতলা থেকে, হেড কোয়ার্টার থেকে আদেশ
এল, ‘ভাব মুখে’ থাক। জনক রাজার মতো দুটো তরোয়াল ঘোরাও, একটা জ্ঞান
আর একটা ভক্তি। সাকার আর নিরাকারে মধ্যে ‘বাচ’ খেলাও। কখনো ব্রহ্মে থাক,
কখনো মায়ায়। গোখরো সাপ হয়ে যাও, বৈরাগ্য বিষের ছোবলে বিষয় বিষ নাশ
করে দাও। যারা আসবে তাদের লটকে দাও। ভক্ত কণ্ঠে যুগ যুগ ধরে গীত হোক,
মর্ত্যামৃতং তব পদং মরণোর্মিনাশং/তস্মাত্ত্বমেব শরণং মম দীনবন্ধো।
শ্রীরামকৃষ্ণ কুঠিবাড়ির ছাতে উঠে আজান দিলেন, সব চলে এসো। যে যেখানে
আছ সব চলে এসো। দুটি ভক্তির কথা কই, দুটো ভগবানের কথা কই। সন্ধ্যার বাতাসে
সেই আহ্বান চরাচরে ভেসে গেল-কলিং কলিং, শ্রীরামকৃষ্ণ কলিং। শ্রীরামকৃষ্ণ
ওয়েভ। তৈরি হবে শ্রীরামকৃষ্ণ সাম্রাজ্য-এম্পায়ার। আমি বসে আছি তোমাদের
জন্যে ভাব সাজিয়ে। গৃহীদের জন্যে কৃপা, সন্ন্যাসীদের জন্যে মুক্তি। আমি ঈশ্বরের
জন্যে ‘ষোল টাং’ করেছি, তোমরা একটাং করো।
When Keshab speaks, the world listens। ব্রহ্মর্ষি কেশবচন্দ্র সেনের
সঙ্গে যোগাযোগে কামারপুকুরের দরজা এইবার কলকাতার দিকে খুলে গেল। যুবক
গদাধর মথুরবাবুর সঙ্গে জোড়াসাঁকোয় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজে গিয়েছিলেন।
সেই অভিজ্ঞতা-‘সেজবাবুর সঙ্গে জোড়াসাঁকোর দেবেন্দ্রের সমাজে গিয়ে দেখলাম
কেশব সেন বেদিতে বসে ধ্যান করছে। তখন ছোকরা বয়স। আমি সেজবাবুকে
বললাম, ‘এই ছোকরার ফাতনা ডুবেছে-বঁড়শির কাছে মাছ এসে ঘুরছে।’ দুজনের
দেখাদেখি। কেশবচন্দ্র সেই দর্শনের দার্শনিক-একমেবাদ্বিতীয়ম। ঈশ্বর এক। অনন্ত
ব্রহ্ম। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন-একই বহু হয়ে বসে আছেন। তাঁর ইচ্ছা। বহুর মধ্যে
এক। তিনি সাকার, তিনি নিরাকার। কী রকম? ‘একজন সন্ন্যাসী জগন্নাথ দর্শন করতে
গিছিল। জগন্নাথ দর্শন করে সন্দেহ হল-ঈশ্বর সাকার না নিরাকার। হাতে দণ্ড
ছিল,সেই দণ্ড দিয়ে দেখতে লাগল, জগন্নাথের গায়ে ঠেকে কি না। একবার এ-ধার
থেকে ও-ধারে দণ্ডটি নিয়ে যাবার সময় দেখলে যে, জগন্নাথের গায়ে ঠেকল না।
দেখে যে সেখানে ঠাকুরের মূর্তি নেই, আবার দণ্ড এ-ধার থেকে ও-ধারে লয়ে যাবার
সময় বিগ্রহের গায়ে ঠেকল। তখন সন্ন্যাসী বুঝলে যে ঈশ্বর নিরাকার, আবার
সাকার।’
এইবার কেশবচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখছেন। ইংরেজি ‘সানডে মিরর’ পত্রিকার
১৮৭৫ সালের ২৮ মার্চ-এর সংখ্যায় লিখলেন, ‘দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসকে দর্শন
করেছি। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টি ও অন্তরের সরলতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।
কথার মাঝে ব্যবহৃত নিরবচ্ছিন্ন উপমা ও রূপক যেমন সুসঙ্গত, তেমনি সুন্দর। অতি
শান্ত, কোমল ও চিন্তাশীল।’
When Keshab speaks -বিশিষ্ট, বিদগ্ধ, প্রতিষ্ঠিত, ইংরিজি শিক্ষায় শিক্ষিত
মানুষের ঘরে সংবাদ মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রবেশ। ধর্মচচা তখন একটা ‘ক্রেজ’।
ফিলজফি আর ফিজিক্স পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রেখে এগোচ্ছে। কান্ট, হেগেল,
হিউম, নিউটন, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাম,শ্রীবুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, চার্বাক, শঙ্কর, রামানুজ, বেদান্ত,
ভাগবত-চলো যাই, দেখে আসি দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসকে – When Keshab
says.
১৮৭৯, নভেম্বর ১৩
গোখরো সাপের ঘরে দুই অজ্ঞেয়বাদীর প্রবেশ। ঈশ্বর মানেন না। ভেতরে একটা
‘ভ্যাকুয়াম’। সংসারের সব আনন্দ ‘স্টেল’ হয়ে গেছে। ‘নো পাঞ্চ’। জীবনটাকে কি
ভাবে ‘মিনিংফুল’ করা যায়! চলো যাই।
দরজার বাইরে দু’জন। ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত আর ব্যবসায়ী মনোমোহন মিত্র।
দুজনে পরস্পরের আত্মীয়। কড়া নাড়লেন। দরজা খুলেন একজন। কোথায় সেই
সন্ন্যাসী, পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ।
পরমহংস কোথায় জানি না বাপু! এই রামকৃষ্ণ তোমাদের সামনে। ‘বসুন, বসুন।’
বসুন তো বসুন। একেবারে বসিয়ে দিলেন। রামচন্দ্র আজও বসে আছেন ঠাকুরের
সঙ্গে কাঁকুড়গাছির ‘যোগোদ্যানে’। যক্ষ মোহরের কলসি আগলায়। রামচন্দ্র আগলে
আছেন ঠাকুরের ভস্মাধার।
বিয়ের ছোবল নয় ‘প্রেমের ছোবলে দু’জনেই বিমোহিত। উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় গৃহে
ফিরে এলেন দুই গৃহী। অবিরত ভেতরে ধ্বনিত হচ্ছে সেই আহ্বান-‘আবার এসো!’
অন্তরে অবিরত আরতি।
এলেন সুরেন্দ্রনাথ মিত্র। ডস্ট কোম্পানির (Dost) মুৎসুদ্দি। প্রচুর উপার্জন। মদ্যপান,
বেশ্যাগমন। কিন্তু উদার। বিপদগ্রস্ত, অভাবী মানুষকে মুক্ত হস্তে সাহায্য করতেন।
সব আনন্দই ক্রমে বিস্বাদ। অর্থ আর প্রলোভন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে। প্রথম ঘণ্টা
বাজালেন অদ্ভুত এক সন্ন্যাসিনী। মিত্তির মশাই এক দ্বিপ্রহরে পথে হাঁটছেন, হঠাৎ
প্রদীপ্ত চেহারার এক সন্ন্যাসিনী কাছে এসে একটি কথাই বললেন, ‘বাছা, একমাত্র
তিনিই সত্য, আর সবই মিথ্যা।’ আর কোনো কথা নেই। তিনি নিমেষে অদৃশ্য হলেন
নিমতলার পথে।
কে এই সন্ন্যাসিনী! শ্রীরামকৃষ্ণ নন ত!
ভেতরে শুরু হয়ে গেল ডামাডোল। ইন্দ্রিয়দের বশে আনার উপায়। পরাজিত
সুরেন্দ্র। এ-জীবন তবে আর রাখি কেন! রামচন্দ্র দত্ত বললেন, তুমিও চল। তিনি
ছাঁচ বদলে দিতে পারেন। অহংকারী সুরেন্দ্র বললেন, ‘তোমার সাধুটি যদি প্রতারক
হন, তবে কান দুটি মলে দিয়ে আসব।’
উদ্ধত ভঙ্গি। ঠাকুরকে কিছুমাত্র সম্মান প্রদর্শন করলেন না। ভক্তদের মধ্যে
বসলেন, বিশিষ্ট একজন। কান মলে দেবেন। ঠাকুর তাঁকে সরাসরি কিছু বললেন
না। ভক্তদের বলছিলেন, সুরেন্দ্র শুনলেন। ঠাকুর বলছেন, ‘মানুষ বেড়াল ছানার মতো
ব্যবহার করে না কেন? বানর ছানার মতো ব্যবহার করে কেন? বানর ছানা মায়ের
পেট আঁকড়ে ধরে থাকে। নিজের চেষ্টা। ছেড়ে দিলেই পড়ে যাবে। বেড়াল ছানা
পড়ে পড়ে মিউ মিউ করে। তার মা নড়া ধরে যেখানে নিয়ে যায় সেইখানেই থাকে।
দেখ আত্মচেষ্টায় কাজ করা, আর ভগবানের উপর নির্ভর করে পড়ে থাকার মধ্যেও
এই তফাত।’
সুরেন্দ্র চমকে উঠলেন, এ কথা ত তাকেই বলা হচ্ছে। আমি ও বানরছানার
মতো চলি। সুরেন্দ্রনাথের ভক্তি ছিল।অন্তর ছিল। সংস্কার ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের ওয়েভ
লেংথ ধরতে পারলেন। আমার জীবনের দুঃখ দূর করতে হলে আমাকে সমর্পিত
বেড়াল ছানা হতে হবে। বিদায়কালে ঠাকুর বললেন, ‘আবার এসো-আসতে ভুলো
না।’ ইতিমধ্যে সুরেন্দ্রের সংশয় ঝরে গেছে। তিনি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
সুরেন্দ্র শুধু এলেন না। তিনি হলেন ঠাকুরের অন্যতম রসদদার। কথামৃতকার
মাস্টারমশাই লিখলেন, ‘ধন্য সুরেন্দ্র! এই প্রথম মঠ তোমারি হাতে গড়া! তোমার
সাধু ইচ্ছায় এই আশ্রম হইল! তোমাকে যন্ত্রস্বরূপ করিয়া ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার
মূলমন্ত্র কামিনী-কাঞ্চনত্যাগ মূর্তিমান করিলেন। কোমারবৈরাগ্যবান শুদ্ধাত্মা নরেন্দ্রাদি
ভক্তের দ্বারা আবার সনাতন হিন্দুধর্মেকে জীবের সম্মুখে প্রকাশ করিলেন। ভাই,
তোমার ঋণ কে ভুলিবে?’
পাঁচ ফুলের সাজি
ঠাকুরকেঘিরে একটি অন্তরঙ্গ ভক্তমণ্ডলী তৈরি হল। ১৮৮১ থেকে ১৮৮২-র মধ্যেই
অন্তরঙ্গ গৃহীভক্তরা সব এসে পড়লেন। সুরেন্দ্র মিত্রের সমসময়েই এলেন কেদারনাথ
চট্টোপাধ্যায়। ‘প্রেমিক ভকত এক আইল আসরে।’ তিনি প্রথমে ব্রাহ্মসমাজভুক্ত
ছিলেন। ঢাকার সরকারি অফিসে অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাজ করতেন। হালিশহরবাসী।
ঠাকুরকে প্রথম দর্শন ১৮৮০ সালে।
ভবনাথ চট্টোপাধ্যায় ।।জুটিলেন ভবনাথ পরম সুন্দর। ১৮৮১ সাল। শ্রীরামকৃষ্ণ
ভবনাথ ও নরেন্দ্রনাথ জুটিকে বলতেন ‘হরিহরাত্মা’। ঠাকুর বলতেন, নরেন্দ্রনাথ ‘পুরুষ’,
ভবনাথ ‘প্রকৃতি’।
বলরাম বসু ।। ‘মনোহর ভক্তবর বসু বলরাম/শহর অঞ্চলে বাগবাজারেতে ধাম/”
১৮৮২ সাল। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলায় তাঁর বিরাট ভূমিকা। একমাত্র বলরাম ভবনেই
ঠাকুরের সর্বাধিকবার পদার্পণ।ভবন রূপান্তরিত হল ‘মন্দিরে’। ঠাকুর বলতেন আমার
কলকাতার ‘কেল্লা’।
মাস্টার (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) ॥ ১৮৮২, ২৬ ফেব্রুয়ারি। মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত এলেন
ঠাকুরের সন্দর্শনে। শুরু হল, ‘কথামৃত’। মাস্টারমশাই লিখছেন, ‘সন্ধ্যা হয় হয়।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ছারে মাস্টার আসিয়া উপস্থিত।’ তারিখটি স্পষ্ট করে বললেন
না। রহস্যে ঘিরে রাখলেন ‘বসন্তকাল, ইংরেজি ১৮৮২, মার্চ মাস। ঠাকুরের
জন্মোৎসবের কয়েক দিন পরে।’
গিরিশচন্দ্র ॥ দূর থেকে দেখলেন, বাগবাজারের দীননাথ বসুর বাড়িতে।
একেবারে মুখোমুখি হলেন ‘স্টার থিয়েটারে’। তারিখ, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৪,
রবিবার। ঠাকুর স্টারে ‘চৈতন্যলীলা’ দেখতে এলেন। অবশেষে গিরিশ বলবেন,
‘প্রভু, তুমিই ঈশ্বর, মানুষদেহ ধারণ করে এসেচ আমার পরিত্রাণের জন্যে।’
Soldiers of Ramkrishna
একেবারে উপযুক্ত শিরোনাম। শ্রীরামকৃষ্ণের সৈন্যবাহিনী। এম্পারার রামকৃষ্ণ।
জেনারেল নরেন্দ্রনাথ। ১৮৮১ সালের ডিসেম্বর। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের ঘরে, পশ্চিমের
গঙ্গার দিকের দরজা দিয়ে নরেন্দ্রনাথের প্রবেশ। বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ। গঙ্গার দিক থেকে
গঙ্গার ধারা এল। ভগীরথ মর্তে গঙ্গা অবতরণ করিয়েছিলেন, শিব ধারণ করেছিলেন
জটায়। শিবরূপী নরেন্দ্রনাথ এলেন রামকৃষ্ণ গোমুখীতে। রামকৃষ্ণ প্রবাহ এইবার মুক্ত
হবে। শিব এলেন শক্তির ঘরে। শিব চেয়েছিলেন সমাধি। শক্তি চাইলেন সমিধ।
শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের সমাধি-স্বপ্ন ঘুচিয়ে দিলেন-তোর হাড় কখানিও চাই।
আমি বজ্র তৈরি করব। সত্য সত্যই বজ্রপাত হয়েছিল মহাসমাধির আগের দিন।
লাটু মহারাজের স্মৃতি-‘দুপুরবেলা একটা বাজপড়ার মতো আওয়াজ হয়েছিল। মা
ও লক্ষ্মীদিদি সেই আওয়াজ শুনে ঠাকুরের ঘরে এসে গেলেন-লক্ষ্মীদিদি বড্ড ভয়
পেয়েছিল।
ত্যাগী পার্ষদদের মধ্যে ঠাকুর যে ছয়জনকে নিত্যসিদ্ধ বা ঈশ্বরকোটি বলে চিহ্নিত
করেছিলেন, তাঁরা হলেন-নরেন্দ্র, রাখাল, যোগীন্দ্র, বাবুরাম, নিরঞ্জন আর পূর্ণ।
এই ছ’জনের মধ্যে তিনজন বিবাহ করেছিলেন। পূর্ণ (পূর্ণচন্দ্র ঘোষ)গৃহী হয়েছিলেন।
১৮৮৫ সালের মার্চ মাসে ঠাকুরের কাছে প্রথম আসেন। পিতা, রায়বাহাদুর দীননাথ
ঘোষ। উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী। পূর্ণচন্দ্রকে দেখে ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বিষ্ণুর অংশে
জন্ম।’ তাঁর আগমনে ওই শ্রেণীর ভক্তদের আগমন পূর্ণ হল।
যোগীন্দ্র (নাথ রায়চৌধুরী), পরে স্বামী যোগানন্দ। নামে মাত্র বিবাহিত। ঠাকুর
দেখামাত্রই ঈশ্বরকোটী বলে চিনেছিলেন। রাখাল (রাখালচন্দ্র ঘোষ-স্বামী ব্রহ্মানন্দ)
ঠাকুরের মানস পুত্র। আগমনের আগেই ঠাকুর তাঁকে ভাব নেত্রে দেখেছিলেন।
কাশীপুরে ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, রাখালের ‘রাজবুদ্ধি’। নরেন্দ্রনাথ তাঁর
ভাইদের আদেশ দিলেন, রাখালকে সবাই রাজা বলে ডেকো। রাখালচন্দ্র ছিলেন
বিবাহিত। একটি সন্তান জন্মাবার পরেই চিরকালের জন্যে সংসার ত্যাগ করলেন।
ঠাকুরের রোলকল-নরেন্দ্রনাথ! আমি তোমার বিবেকানন্দ।
রাখালরাজা! তোমার ব্রহ্মানন্দ।
যোগীন্দ্র, আমার অর্জুন! আমি যোগানন্দ।
বাবুরাম! আমায় আপনি প্রেমানন্দ করবেন।
নিরঞ্জন, শ্রীরামচন্দ্রের অংশ! হাজির, আমি নিরঞ্জনানন্দ।
তারকনাথ! আমি যে শিবানন্দ।
শরৎচন্দ্র! হাজির প্রভু! দক্ষিণেশ্বরে একদিন হঠাৎ আমার
কোলে বসে আমার ভারবহন ক্ষমতা পরীক্ষা
করেছিলেন। আমি সারদানন্দ। আমি মা সারদার
প্রহরী।
শশিভূষণ! প্রস্তুত। ভবিষ্যতের রামকৃষ্ণানন্দ।
কালীপ্রসাদ! রেডি স্যার! তুমি অভেদানন্দ।
লাটু! তুই অদ্ভুত, তাই অদ্ভুতানন্দ।
হরিনাথ! আমি তুরীয়ানন্দ।
গোপালচন্দ্র! তুমিআমার বুড়ো গোপাল।হয়ে যাও অদ্বৈতানন্দ।
সারদাপ্রসন্ন। প্রভু! তুমি প্রবেশিকা পরীক্ষার দিনে সোনার
ঘড়ি হারিয়ে ফল খারাপ করে ফেলেছিলে। খুব মন
খারাপ! সে ও আমার সঙ্গে দেখা হবে বলে! তুমি
ত্রিগুণাতীতানন্দ হবে!
গঙ্গাধর! এদিকে এস! তুমি হও অখণ্ডানন্দ।
সুবোধচন্দ্র! প্রভু হাজির। তোমার উত্তম বংশ। ঠনঠনিয়ার
সুপ্রসিদ্ধ সিদ্ধেশ্বরী দেবীর দেবায়েত শঙ্কর ঘোষের
পৌত্র কৃষ্ণদাস তোমার পিতা।তুমি হবে সুবোধানন্দ।
নরেনের বেলুড়মঠে তোমাকে সবাই আদর করে
ডাকবে, ‘খোকা মহারাজ’।
হরিপ্রসন্ন! প্রেজেন্ট স্যার! বিজ্ঞানী আমার কাছে এসেছিল
বলে তোমার মা বলেছিলেন, ‘সেই পাগলের ওখানে
গিয়েছিলে, যে সাড়ে তিনশ ছেলের মাথা খারাপ
করে দিয়েছে?’ যাও, তুমি বিজ্ঞানানন্দ হয়ে নরেনের
রামকৃষ্ণ মন্দির তৈরি করবে বেলুড়ে।
দুর্গাচরণ! কৃপা করুন প্রভু। তুমি ‘নাগ মহাশয়’ নামে
বিখ্যাত হবে।
সেই ছাত
কাশীপুর উদ্যানবাটীর ছাতে দাঁড়িয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিচের দিকে তাকালেন।শীতের
নরম রোদে পড়ে আছে সবুজ উদ্যান। মনে হচ্ছে তপোভূমি। সন্ন্যাসীর দল তৈরি।
আর কয়েকদিন পরেই তারা গেরুয়া আর রুদ্রাক্ষের মালা পাবে। উদ্যানের এক কোণে
নরেন্দ্র রোজ রাতে যে ধুনি জ্বলিয়ে সকলকে নিয়ে ধ্যানে বসে, তার ছাই ছড়িয়ে
আছে।
ওই ত গৃহী ভক্তরা সব ঘুরছে। সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে। এরা সব পরিচিত,
কেউ রবাহুত নয়। ওই ত সব, আমার পাঁচ বছরের সঙ্গী-গিরিশ, তার ভাই অতুল,
রাম, নবগোপাল, হরমোহন, বৈকুণ্ঠ,কিশোরী, হারাণ, রামলাল, অক্ষয়, উপেন্দ্রনাথ
মজুমদার, রাঁধুনী ব্রাহ্মণ গাঙ্গুলি, ভূপতি, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, হরিশ। ভক্তদের
‘ফুল হাউস’। সব কড়াইয়ের ডালের খদ্দের। ‘শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই সংসারী জীবের
কভু গতি নাই।’ ভক্ত এখানে যারা আসে দুই থাক। এক থাক বলছে, ‘আমায় উদ্ধার
কর, হে ঈশ্বর!’ যারা অন্তরঙ্গ, তারা বলে, রামকৃষ্ণ তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমাদের
সম্বন্ধ কী?
ঠাকুর রামলালকে নিয়ে নেমে এলেন উদ্যানে, গৃহীদের পাওনাটা আজ মিটিয়ে
দি। প্রথম গিরিশ। ঠাকুর সমাধিস্থ। অক্ষয় মাস্টার প্রমুখ কয়েকজন ‘গাছের উপর
ডালে ডালে বানর বানর’ খেলা করছিলেন। অক্ষয় ছুটে এলেন। হাতে ছিল দুটি
জহর চাঁপা। ঠাকুরের পায়ে রাখলেন।
ভাবস্থ ঠাকুর অকাতরে বলতে লাগলেন, ‘চৈতন্য হোক’, ‘চৈতন্য হোক’।
ঠাকুর উঠে গেলেন দোতলায়। এরপর তিনি নামবেন নরেন্দ্রের কাঁধে চেপে।
বিভাজন
সবার নরেন্দ্রাদি একান্ত পার্ষদদের দেখাতে হবে গৃহীদের স্বরূপ। গৈরিক শ্রীরামকৃষ্ণ
বৈরাগ্যের চূড়া তুলবেন থই-থই গৃহীদের মাঝে।সংসার সমুদ্রে শ্রীরামকৃষ্ণের দিশারী
আলো। চিরকালীন একটি সংগঠন রামকৃষ্ণ মিশন। শীঘ্রই দেহঘট ভেঙে সেই
শক্তিমণ্ডল রচনা করবেন। এমন কি পশ্চিম ভারতের একটি দুর্গও তাঁর দখলে আসবে।
বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে ‘রামকৃষ্ণ এম্পায়ার’।
হিসেবীর চৈতন্য হওয়া মানে আরো হিসেবী হওয়া।
রাম দত্ত প্রমুখ গৃহী ভক্তরা মাঝে মাঝেই উদ্যানবাটীর খরচের হিসেব দেখতে
চাইতেন। একদান প্রবল অশান্তি-‘বেহিসেবী খরচ হচ্ছে! বড্ড বেহিসেবী খরচ।’
নরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘তার মানে? আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করে এখানে চুরি করতে
এসেছি?
জান, ঠাকুরের সেবায় আপনাদের টাকা আমরা আর ছোঁব না। আমরা ভিক্ষে
করে ঠাকুরের সেবা চালাব।’
নিরঞ্জন ভাইকে নির্দেশ দিলেন, ঠাকুরের ঘরে গৃহীদের প্রবেশ নিষেধ করে দাও।
শ্রীরামকৃষ্ণ একখানি গেরুয়া আর একটি মালা গিরিশচন্দ্রের জন্যে আলাদা করে
রেখেছিলেন। ব্যতিক্রমী দুই গৃহী-গিরিশচন্দ্র আর সুরেন্দ্রনাথ।
গিরিশচন্দ্র হিসেবের কাগজ কুঁচি কুঁচি করে ফেলে দিলেন, “শালার হিসেব।
আমার বাড়ির ইট একখানা, একখানা করে বিক্রি করে প্রভুর সেবার খরচ চালাব।’
ঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে বললেন, ‘তুই আমাকে কাঁধে করে যেখানে নিয়ে যাবি,
আমি সেখানেই থাকব।’
শেষ আদেশ। সেটি বলার জন্যেই এই পটভূমি। পরোক্ষ নির্দেশ হল-সংসারীদের
জন্যে করবে, অবশ্যই করবে। তাদের নিয়ে করবে না। রসুনের বাটি না পোড়ালে
গন্ধ যায় না। কাম আর কাঞ্চন কলির মায়া।