ভারতবর্ষে যত দেবতা আছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলেন, শ্রীক্ষেত্রের পুরুষোত্তম শ্রীশ্রীজগন্নাথ। প্রাত্যহিক পূজার এই মন্ত্রটি অনুধাবন কবলেই বোঝা যাবে,
যং দারুব্রহ্মা মূর্তিং প্রণবতনুধরং
সর্ববেদান্ত সারং
ভক্তানাং কল্পবৃক্ষ ভবজলতরণী
সর্বতখানুখম!
যোগীনাং হংসতত্ত্বং হরিহর নমিত
শ্রীপতি বৈষ্ণবানাং
শৈবানাং ভৈরবাস্যাং পশুপতি পরমং
শাক্ততত্ত্বে শবিতং চ।
বৌদ্ধানাং বৌদ্ধসাক্ষাৎ রূপ ভয়তি বরো
জৈন সিদ্ধান্তমূর্তিঃ।
তাং দেবো পাতু নিত্যং কলি কলুষহরং
নীল শিলাধিনাথঃ ।।
নিমকাঠের বিশাল এক মূর্তি।অসম্পূর্ণ, অসংস্কৃত। কেন এমন? এ-প্রশ্নের অনেক উত্তর। ইতিহাসের অনেক পাতা উলটে যেতে হবে। গবেষকদের গবেষণার ইতি নেই। জমাট এক রহস্য পুরীর সমুদ্রতীরে ‘নীল শিলাধিনাথ’। বিস্ফারিত দুই চোখ যেন এই পৃথিবীর দুই গোলার্ধ। ভীতিপ্রদরকমের সুন্দর। দৃষ্টিতে কঠোর রসিকতা। ভারতীয় জীবন ও সংস্কৃতির ধাবমান স্রোতকে ঘুরপাক খাইয়ে স্বরাট বসে আছেন। ঐশ্বর্যের রত্নবেদিতে স্বতন্ত্র এক ধর্ম-সংস্কৃতি তৈরি করে। অবিরত ঢেউভাঙা সমুদ্রও তুচ্ছ হয়ে গেছে ওই মৌন মহেশ্বরের কাছে। কোনো দেবতার গহনে এত বিস্ময় নেই। এক খণ্ড কাঠের এ কি ভেল্কি!দারু দেবতার কি মহিমা! ধর্মীয় হানাহানির আকাশে মাথা তুললেন এই বৃক্ষদেবতা। অসম্পূর্ণ আকৃতিতে সমন্বিত হল সমস্ত ধর্মমত। উদ্ভাসিত হল নব দিগন্ত। শুধু ধর্ম নয় তৈরি হল জগন্নাথ সংস্কৃতি। বঙ্গের শ্রীচৈতন্য প্রবল তরঙ্গের মতো প্রবাহিত হয়ে গেলেন পুরুষোত্তম সাগরে। অবিশ্বাস্য আকুতিতে, ‘জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে’। কে এই দেবতা? অনবদ্য কাব্যে মহাপ্রভু তাঁর স্বরূপ বর্ণনা করলেন,
‘মহাম্ভোধেস্তীরে কনকরুচিরে নীল শিখরে
বসন্ প্রাসাদান্তঃ সহজ বলভ্রদ্রেণ বলিনা।
সুভদ্রামধ্যস্থঃ সকল সুরসেবাবসরদে
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।
মহাসাগরের তীরে, সুবর্ণাভনীলাচলশিখরে, প্রাসাদমধ্যে সুভদ্রাকে মধ্যভাগে স্থাপন করে সহোদর ধরে বলভদ্রের সঙ্গে বাস করে সকল দেবতাকে সেবার অবসর দান করেন।
সে এক ভীষণ সময়, বৌদ্ধ ধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্মকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। গেল গেল অবস্থা।আর্যরা অনার্যদের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবেশ করতে পারছেন না। আর্য আর অনার্য সংস্কৃতির বিপরীত মেরুতে অবস্থান। এই অবস্থায় হাত মেলাবার প্রয়োজন হয়েছিল। একটা সঙ্কর সংস্কৃতির জন্ম হল। বিবর্তিত হিন্দু ধর্মে আর্যবিশ্বাস আছে কি নেই।অনার্য আর দ্রাবিড় বিশ্বাসের ওপর স্থাপিত হল হিন্দু ধর্ম। শঙ্করাচার্য প্রতিহত করলেন বৌদ্ধধর্ম। রপান্তরিত হিন্দুধর্মে গজিয়ে উঠল বিভিন্ন সম্প্রদায়। শুরু হল সাম্প্রদায়িক মারদাঙ্গা। শঙ্করপন্থীও রামানুজ পন্থীদের রক্তারক্তি দ্বন্দ্বদু। ইতিহাসের এই অস্তমূহূর্তে অরণ্যে আত্মপ্রকাশ করলেন দারুদেবতা। বনের মানুষ শবররা এই দেবতার উপাসক। রূপহীন রূপে তিনি তাক লাগিয়ে দেবেন। ধর্মীয় অসভ্যতায় তিনি তৈরি করে দেবেন এমন এক উত্তম ধর্ম-সংস্কৃতি যেখানে আশ্রয় পাবে শুধু বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম নয়, হিন্দুধর্মের অন্যসব শাখার বিশ্বাস। এই দেহে হবে লীন। এই দেবতার পূজার মন্ত্রে সমস্ত ধর্মের ছায়া। সময়ের বিগ্রহ প্রভু জগন্নাথ
কে এমন করলেন? কোন ধর্মগুরু?
তিনিই করলেন। স্বপ্রকাশ। মানুষের সাধ্য ছিল না। আদিতে তিনি শবরদের দেবতা। অনেক কাহিনীর একটি হল প্রাচীন উড়িষ্যার পশ্চিম ভাগে, অর্থাৎ দক্ষিণ কোশল, বর্তমানের মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরের একটি গ্রাম। সেই গ্রামে বাস করতেন এক প্রবীণ শবর। তিনি দারুদেবতার উপাসনা করতেন। সেই দেবতার অলৌকিক ক্ষমতার কথা সবাই জানতেন।বৃদ্ধ শবর তাঁর উপাস্য দেবতাকে অরণ্যের এক নিভৃত স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেই সন্ধান অন্যের জানার উপায় ছিল না। সেই সময় উড়িষ্যার রাজা পুরীতে বিশাল এক মন্দির নির্মাণ করলেন। রাজার ইচ্ছা মন্দিরে ওই অলৌকিক দেবতাকেই প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি এক ব্রাহ্মণকে পাঠালেন ওই গ্রামে। রাজপ্রতিনিধি বৃদ্ধ শবরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করে দেবতাকে একবার দর্শনের জন্যে আবদার ধরলেন। বৃদ্ধ কোনোমতেই রাজি হলেন না। ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণের সঙ্গে শবর কন্যার প্রেম হল। ব্রাহ্মণ কন্যাটিকে বিবাহ করতে চাইলেন। কন্যার আগ্রহে শবরকে
রাজি হতে হল। ব্রাহ্মণ হলেন জামাতা। আবার ফিরে এল দারুদেবতাকে দর্শনের বায়না। শবর দুহিতা পিতাকে রাজি করালেন। শবর বললেন, জামাতার চোখ বেঁধে দেবস্থানে নিয়ে যাব। পথের হদিস যেন না পায়। নারীর বুদ্ধি। স্বামীর উত্তরীয়ে বেঁধে দিলেন প্রচুর সরষে-বীজ। ব্রাহ্মণ চোখ বাঁধা
অবস্থায় শ্বশুরের সঙ্গে চলেছেন অরণ্যপথে। একটু একটু করে সরষে বীজ ছড়াতে ছড়াতে। এইবার অপেক্ষা। বীজ থেকে বেরবে সরষে গাছ। হলুদ হলুদ ফুল।
এইবার সেই আধ্যাত্মিক প্রতারণা। ব্রাহ্মণ তাঁর জামাতার ভূমিকা ছেড়ে হয়ে গেলেন রাজপ্রতিনিধি। সরষের ফুলের নিশানায় পথ চিনে একাকী ব্রাহ্মণ একদিন পৌঁছে গেলেন দেবস্থানে। ব্রাহ্মণের প্রার্থনায় দেবতা পুরী যেতে রাজি হলেন, বললেন, একটি কাষ্ঠখণ্ডরূপে মহানদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে পুরীতে পৌঁছব। বৃদ্ধ শবর এই সংবাদে দুঃখে ভেঙে পড়লেন। কাঁদছেন। আকাশবাণী হল, ‘শোনো শবর,
বহুদিন তোমার সেবা নিয়েছি, কাঁচা কাঁচা খাদ্যদ্রব্যে আর আমার রুচি নেই। এইবার আমি পাক করা সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করতে চাই। পুরীর রাজ-আমন্ত্রণ এসেছে। এইবার বনবাসী হবে রাজমন্দিরবাসী। দুঃখ করো না, তোমার সঙ্গে আমার নাম চিরকাল যুক্ত থাকবে। এই গ্রামটির নাম হবে, সেওড়ি-নারায়ণ।’
শবর শব্দের অপভ্রংশ হল সেওড়ি। শবরের কাছে দারু-দেবতার পরিচয় ছিল সূর্যদেব-সূর্য-নারায়ণ। আদিবাসী লোকগাথা, রূপকথা প্রভৃতি আলোচনা করে
গবেষকদের সিদ্ধান্ত, ‘জগন্নাথ বিগ্রহের আদি বাসস্থান পুরী নয়, দক্ষিণ কোশল, বর্তমানে যা মধ্যপ্রদেশ।’ হিসলপ লিখছেন, ‘জগন্নাথ মূর্তি দেখে আমার মনে হয়েছে, এই মূর্তি যেন গঞ্জাম জেলার পাহাড় থেকে নেমে এসেছেন। এই মূর্তির সঙ্গে অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে ওই অঞ্চলের বিকলাঙ্গ কিটুং মূর্তির।’
পণ্ডিতপ্রবর সুশীল মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য গবেষণা-গ্রন্থ থেকে একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি, ‘ঈশ্বরের শাওড়া (শবর) প্রতিশব্দ সোনুমন। নামের পেছনে বোজম বা বৈ থাকলে সেটিহবে স্ত্রীলিঙ্গবাচক। ভিন্ন ভিন্ন নামে এই সোনুমনজিরা পরিচিত। এদের মধ্যে রয়েছে কিছু সংখ্যক আকাশ দেবতা, কিছু গ্রাম্যদেবতা এবং মানুষকে দুঃখকষ্ট দায়ী অমঙ্গলকামীকিছু দেবতা। এদের বিশ্বাসে কিটুংসুম বা কিটুংও ঈশ্বর, যদিও সকল কিটুংই পূজা পাবার অধিকারী নয়। অন্য দেবতাদের অপেক্ষাকিটুংদের মনুষ্যভাবাপন্ন মনে করা হয়।’
রূপ আর অরূপ মিলিয়ে জগন্নাথদেব প্রভাব ও প্রতিপশিালী এক কিটুং। আমাদের
বিষয় অন্য। আমাদের বিষয় জগন্নাথদেবের আহার। অরণ্যবাসীর কাঁচা নৈবেদ্যে তাঁর
অনীহা।তিনি সভ্যতার দিকে এগোচ্ছেন অথবা সভ্যতা তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে।
সংঘর্ষই সভ্যতার ধর্ম!মত আর পথের লড়াই।অনাড়ম্বর বিশ্বাসের নিভৃত উপাসনার
দিন শেষ। রাজা গগনচুম্বী মন্দির করলেন, বিরাট এক বিগ্রহ গঠন করালেন না কেন?
কারণ ওটি করানো যায় না।রত্নদেবি পর্যন্ত এগনো যায়, তারপর অসহায়। মূর্তি গড়া
যায়। কপি। দেবতার জন্ম দেওয়া যায় না। দেবতার আবির্ভাব হয়। দেবতার সঙ্গে
আসেন শাস্ত্র। সময় বসে থাকে কোল পেতে।
ইতিহাসের অন্ধকারে এই দারুলীলা। শ্রীক্ষেত্রে তিনি যখন তাঁর বিপুল আয়তন
নিয়ে উঠে বসলেন, সবাই হাঁ হয়ে গেলেন। নিরাকারের উপাসকরা বললেন, ‘হাঁ,
মিল গয়া।’ এই ত নিরাকারের আকার। পুজার মন্ত্রের প্রথমেই থাক আমাদের এই
চরণ-‘যং দারুব্রহ্মামূর্তিং প্রণবতনুধরং সর্ব বেদান্তসারং।’ আমরা শূন্যবাদী, অস্তিত্বহীন
অখিল মায়ায় আমরা আছি অথবা নেই। মৃত্যুর নূপুরে জীবনের নৃত্য। এই ত
আমাদের অনস্তিত্বের রূপ। পূজার মন্ত্রে আমাদের এই চরণটি থাক, বৌদ্ধানাং
বৌদ্ধসাক্ষাৎ। অনৈশ্বর্যের ঐশ্বর্য আমরা পেয়েছি। যে সাজে সাজাই সেই সাজেই
পাই, নইলে বৃক্ষকাণ্ড। আমাদের এই চরণটি যুক্ত হোক, জৈন সিদ্ধান্তমূর্তিঃ। আমরা
ভক্ত, আমরা যে লীলা চাই, এই ত আমাদের সেই অর্চাবতার, প্রেমঘন পুরুষোত্তম!
আমাদের এই নিবেদনটি থাক, ভক্তানাং কল্পবৃক্ষ ভবজলতরণী। আমরা শৈব তান্ত্রিক,
এই যে সমুদ্রের তীরে বসে আছেন আমাদের ভৈরব, পূজার মন্ত্রে জুড়ে দিন আমাদের
পূজার মন্ত্র, শৈবানাং ভৈরবাস্যাং পশুপতি পরমং। যোগীরা পেলেন হংসতত্ত্ব, হরি হর
আর বৈষ্ণবের শ্রীপতি।
তবু যে সহজ হল না প্রভুটিকে চেনা। চিনতেই যদি না পারা গেল, পূজাপদ্ধতি,
ভোগবিধি ঠিক হবে কী করে! ওডিশার বৈষ্ণব ও কবিদের ধারণায় জগন্নাথ হলেন
শূন্য পুরুষ। দীর্ঘদিন ওড়িশা বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে ছিল। এই ধর্ম একসময় দুটি প্রধান
ভাগে ভাঙল। ওড়িশায় মহাযানী মতবাদ প্রাধান্য বিস্তার করল। মহাযানীরা বললেন,
জগন্নাথই বুদ্ধ-আদি বুদ্ধ। শূন্যপুরুষ জগন্নাথ। শূন্য থেকেই সৃষ্টি, অতএব সব
অবতারের স্রষ্টা তিনি। বৈষ্ণবরা শ্রীকৃষ্ণকে জুড়ে দিলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর
অংশাবতার। অন্য কোনো দেবতা জগন্নাথদেবের মতো বিবর্তিত হননি। প্রভুর যেমন
ইচ্ছা। রাষ্ট্রদেবতা হলে যা হয়। শাস্ত্র নয় শাসক নিয়ন্ত্রিত। প্রথমে শবরদের দেবতা।
তারপর চতুর্ভুজ নীলমাধব। তারপর হলেন জৈনদের। ক্রমে বৌদ্ধ, শৈব ও
বৈষ্ণবদের উপাস্য। শাসকশক্তির যেমন, যেমন ধর্মবিশ্বাস, জগন্নাথ দেবেরও সেই
অনুসারে রূপান্তর। কখনো তিনি ঋষভনাথ, কখনো আদিবুদ্ধ, কখনো ভৈরব,
কখনো দক্ষিণা কালিকা, সব শেষে বিষ্ণু-কৃষ্ণ। এক দেবতা থেকে যেই অন্য
দেবরূপে অর্চিত হচ্ছেন তখনই পূর্ব পূজার কিছু ছাপ এসে যাচ্ছে পূজাপদ্ধতিতে
স্বাভাবিকভাবেই। সেই কারণেই জগন্নাথদেবের পূজাপদ্ধতিতে সমস্ত ধর্মের
ধর্মবিশ্বাসের মিলন ঘটেছে। কেউ এমন দাবি করতে পারবেন না, যে মহাপ্রভু শুধু
আমাদের সম্প্রদায়ের দেবতা।
ওড়িশা জগন্নাথ ক্ষেত্র। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের পটমণ্ডল। রাজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি শাসন
তাঁকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। ধর্মানুসরণে, কি জৈন, কি বৌদ্ধ, কোনো সম্প্রদায়ই
তা পারেননি। জগন্নাথের ছায়া থেকে কে বেরবে! অরণ্য গভীর। স্বয়ং মহীরুহ।
মহী-শব্দের আশ্রয়ে এই পৃথিবী। মহীতল-ভূতল, মহীধ্র-পর্বত, মহীনাথ-নৃপতি।
অরণ্যেই উদ্গীত আরণ্যক বেদান্তের বেদ-অন্ত, শ্রেষ্ঠ জ্ঞান।
একটি শঙ্খ যেন সমুদ্রোখিত। মস্তকে পশ্চিমসীমা, সেখানে বসে আছেন নীলকণ্ঠ
শিব। শঙ্খের উদর সমুদ্রের জলে। শ্বেতশুভ্র শখটি মাথা তুলে এক ক্রোশ মাত্র
এগিয়েছে। ‘শঙ্খাগ্রে নীলকণ্ঠ স্যাদেৎক্রোশঃ সুদুর্লভঃ।’ এই ক্রোশমাত্র ক্ষেত্র অতি
সুদুর্লভ।সাক্ষাৎ নারায়ণের এই ক্ষেত্রটি পরম পাবন। সুবর্ণবালুকাকীর্ণং নীলপর্বতশোভিতম।
উৎকল খণ্ডে ঋষি জৈমিনি এই কথাই বলছেন। এই ক্ষেত্রের বিস্তার পাঁচ ক্রোশ। এর
মধ্যে তীর্থরাজ সমুদ্র তটবর্তী দু ক্রোশ অতি পবিত্র।
শ্রীভগবান উবাচ, ‘সমুদ্রের উত্তর তীরে মহানদীর দক্ষিণ প্রদেশটি পৃথিবীর মধ্যে
সকল তীর্থের ফল প্রদান করেন। একাম্রকানন ভুবনেশ্বর হতে দক্ষিণ সমুদ্রের
তটভূমি পর্যন্ত প্রত্যেক পদবিক্ষেপের স্থান উত্তরোত্তর অপেক্ষাকৃত শ্রেষ্ঠ। সিন্ধুতীরে
যে স্থানে নীলপর্বত বিরাজমান, পৃথিবীতে সেই স্থানটি গোপনীয়, এমন কি ব্রহ্মারও
অতি দুর্লভ।
কেন দুর্লভ? ইতিহাসে হয়তো যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর মিলবে। একথা ঠিক পুরীর মতো
সমুদ্র সৈকত দ্বিতীয় আর নেই। ‘গোল্ডেন বিচ’, সুবর্ণ সৈকত। সৈকত থেকে শ্রীমন্দির
সামান্য দূরত্ব। শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরের বিপুল বৈভবের পশ্চাতে যে-সব নৃপতির
প্রয়াস রয়েছে তাঁদের নাম, (১) চুড়ঙ্গদেব, (২) বিড়গঙ্গ, (৩) একজটা কামদেব,
(৪) মদন মহাদেব, (৫) রাজরাজেশ্বর দেব, (৬) ছোট পুরুষোত্তম দেব, (৭) অনঙ্গ
ভীমদেব, (৮) লাঙ্গুলা নরসিংহদেব, (৯) কবি নরসিংহ, (১০) মাতা বিরজাদেই, (১১)
দ্বিতীয় ভানুদেব, (১২) দ্বিতীয় প্রতিভানু, (১৩) বীর বাসুদেব, (১৪) কপিলেন্দ্র দেব
(১৪৩৫-৭০ খৃঃ), (১৫) শ্রী পুরুযোত্তমদেব (১৪৭০-৯৭), (১৬) শ্রীপ্রতাপরুদ্রদেব
(১৪৯৭-১৫৪১)।
অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গদেব বা চুড়ঙ্গদেব ঘোষণা করলেন ওড়িশার রাজাধিরাজ
মহাপ্রভু জগন্নাথদেব, আমি মহাপ্রভুর সামন্তরাজা,রাউত। রাজাধিরাজ জগন্নাথদেবের
মন্দিরের রূপ হল, যেন সুবিশাল একটি দুর্গ। একাধিক প্রাকার ও বাধা অতিক্রম
করতে পারলে তবেই তাঁর দর্শন পাওয়া যাবে। ১০.৭ একর জমির ওপর এই মন্দির।
দুটি প্রাকার দিয়ে ঘেরা। প্রথমটির নাম মেঘনাদ বেড়া, দ্বিতীয়টির নাম কুর্মবেড়া।
চারটি প্রবেশ পথ। সিংহ দুয়ার, সিংহ শৈার্যের প্রতীক। অশ্বদুয়ার, অশ্ব সামরিক শক্তির
প্রতীক। ব্র্যাঘ্র দুয়ার, ব্যাঘ্র তেজের প্রতীক। হস্তী, দুয়ার, হস্তী সম্পদের প্রতীক। আর
অপর ব্যাখ্যা হল, সিংহ ধর্ম, হস্তী অর্থ, অশ্ব কর্ম, ব্যাঘ্র মোক্ষ।
জগন্নাথ দেবের দুর্গে সর্বত্র রহস্য। প্রতি পদক্ষেপে রহস্য। সিংহদ্বারের দুধারে
দেবমণ্ডল। এটি অতিক্রম করলেই সামনে বাইশটি সোপান। দেশের ভাষায় ‘বাইশ
পহছা’। শুরু হল রহস্যমণ্ডল। এই বাইশটি সিঁড়ি হল যোগদর্শনের বাইশটি তত্ত্ব।
ধাপে ধাপে সাজানো, পঞ্চভূত, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহংকার,
চিত্ত ইত্যাদি। জৈনরা বলেন, এই বাইশটি সিঁড়ি হল তাঁদের বাইশজন তীর্থঙ্কর। এঁদের
স্পর্শ নিতে নিতে পৌঁছতে হবে আদি দেব ঋষভনাথের কাছে। আবার এমন যুক্তিও
আছে, জগন্নাথদেব গোলোকবাসী। তলায় পড়ে আছে অষ্ট বৈকুণ্ঠ, তার তলায়
চতুর্দশ ভুবন।হিরণ্যগর্ভ পদ্মাসনে প্রভুর আসন। তাঁর বেদির কাছে যেতে হবে এই
চতুর্দশ ভুবন আর তৃষ্টি বৈকুণ্ঠ অতিক্রম করে।সপ্তভুবনে লুকিয়ে আছে তন্ত্রের ষটচক্র
আবার গায়ত্রী-ভু, ভুব, স্বঃ, মহঃ, জন্মঃ, তপ আরসত্য। একটি ঊর্ধ্বলোকের উত্থান
সোপান। অধোলোকেও সাতটি তল, অতল, সুতল, বিতল, তৃলাতল, মহীতল,
রসাতল আর পাতাল। এইবার অষ্ট বৈকুণ্ঠের পরিচয় হল, শ্রীবৈকুণ্ঠ, কৈবল্য বৈকুণ্ঠ,
কারণার্ণব বৈকুণ্ঠ, শেষশায়ী বৈকুণ্ঠ, শ্বেতদ্বীপ বৈকুণ্ঠ, পরব্যোম বৈকুণ্ঠ, গর্ভোদকশায়ী
বৈকুণ্ঠ আর কৈলাস।
এই দীর্ঘ, দুস্তর, সাধন-পথ ধরে এগোতে হবে। পথের শেষে ‘ওমেগা পয়েন্টে’
অপেক্ষায় রয়েছেন ভগবান হাত দুটি বাড়িয়ে। সেই কারণেই বোধহয় প্রভুর হাত
দুটিই সার। আর দূরবীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জগৎ পথের দিকে জাতের নাথ।
দয়াসিন্ধুর্বন্ধুঃ সকলজগতাং। রথারূঢ়ো গচ্ছন। জ্ঞানমিশ্রা ভক্তিই ওড়িশার বৈষ্ণবদের
সাধন-পথ। ব্রজযানী বৌদ্ধ আর নাথ সম্প্রদায়ের প্রভাবও পড়েছিল। তাঁদের
সম্মিলিত দর্শন হল, শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব হলেন পঞ্চমাত্রা, পঞ্চভূত, পঞ্চবীজ, পঞ্চদেব
এবং জীব ও পরমাত্মার মিলিত তনু। মানুষ বাইশ রকমের অপরাধে অপরাধী। এই
অপরাধ দেবতার কাছে। বাইশ রকমের পাপ। ওই বাইশটি ধর্ম সোপান উল্লঙ্ঘনে
বাইশটি পাপ-স্খলন। বাইশটি ধাপ বাইশটি তীর্থভূমি। পবিত্র থেকে পবিত্রতর হতে
হতে পুরুষোত্তম প্রাপ্তি।মূর্তির অভ্যন্তরে আছে ব্রহ্মাবস্তু। ব্রহ্মের অপার মহিমা লাভ।
কিন্তু তিনি কে? বৈষ্ণব অথবা শাক্ত। শবরের সেবা অস্বীকার করে রাজা হলেন
ওভ্র দেশে। নীল পর্বতে। সমুদ্রের তটে। যেমন শ্রীকৃষ্ণ! গোপীদের কাঁদিয়ে, বৃন্দাবনে
ভাসিয়ে, ‘লাল পাগুড়ি দিয়ে মাথে, রাজা হলেন মথুরাতে।’ আবার গীতায় বসে
অর্জুনকে বললেন, সখা! ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজ্যাম্যহম। যে যেভাবে,
যে রূপে আমাকে চায় আমি সেই ভাবে সেই রূপেই তার সেবা, পূজা গ্রহণ করে
প্রার্থিত ফল দান করি।
ব্রহ্মার স্তবে সন্তুষ্ট বিষ্ণু বললেন, এটি আমার ক্ষেত্র। এখানে আমি চির আসীন
অক্ষয় বট। সমুদ্রতনয়া লক্ষ্মী আমার ক্রোড়ে আসীন। আমি অক্ষয় বট। এখানে পাপ
পুণ্যের বিচার নেই। যমের দণ্ড অচল। এখানে একটি কাকও মৃত্যুর পর সাযুজ্যলাভ
করে। তীর্থ যজ্ঞ, দান ধ্যানে যে ফল, এই ক্ষেত্রে একদিন মাত্র বাস করলে সেই ফল
লাভ। নিমেষমাত্র বাস করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পাওয়া যায়।
যমরাজ বললেন, সে ত হল, এই ক্ষেত্রের এমন জগৎ ছাড়া মহিমা হল কী করে,
যেখানে আমার শাসন অচল? শ্রীবিষ্ণু শ্রীলক্ষ্মীকে বললেন, ‘বলে দাও’। শ্রী তখন
শ্রীক্ষেত্রের শক্তি বলয়ের কথা বললেন, এই পঞ্চক্রোশ পরিমিত এলাকায় তোমার
দণ্ড অচল। তাহলে শোনো, এই অন্তর্বেদীটি রক্ষার জন্যে আমি আটটি শক্তি কল্পনা
করেছিলাম। ইতিমধ্যে মহাদেব উগ্রতপস্যা শুরু করলেন। আমি তখন আমার শরীর
থেকে সুন্দরী গৌরীকে তার পত্নীরূপে সৃজন করলুম। গৌরীকে আদেশ করলুম, এই
অন্তর্বেদীর চতুর্দিক রক্ষা করো। সেই গৌরী আমার প্রীতির নিমিত্ত অষ্টপ্রকার মূর্তি
ধারণ করে অষ্টধা দিক্ষু সংস্থিতা।
বটমূলের অগ্নি কোণে মঙ্গলা, পশ্চিমে বিমলা, শঙ্খের পূর্বভাগ বায়ু কোণে
সর্বমঙ্গলা, উত্তর দিকে অর্ধাশনী, ঈশান কোণে লম্বা, দক্ষিণে কালরাত্রী, পূর্বদিকে
মরীচিকা, নৈঋতে চণ্ডরূপা। এতাভিরুগ্ররূপাভিঃ শক্তিভিঃ পরিরক্ষিতম। এই ভীষণারূপা
অষ্টশক্তির দ্বারা অন্তর্বেদী সর্বতোভাবে রক্ষিত।
ক্ষেত্রস্বামী ভগবান বিষ্ণু। রুদ্রাণীর অষ্টশক্তির দ্বারা রক্ষিত। এখন রুদ্র কী করেন।
তিনি ভগবানকে বললেন, তুমি যেখানে আমিও সেখানে, তোমাকে ছেড়ে থাকা আমার
পক্ষে অসম্ভব। রুদ্র আট ভাগে বিভক্ত হলেন। ক্ষেত্রস্বামী ভগবান সেই অষ্টরুদ্রকে
আটদিকে রেখে নিজে বসলেন মাঝখানে।
মহাদেব নিজেকে এই ভাবে সাজালেন, কপালমোচন, (১) কাম (২)ক্ষেত্রপাল
(৩) যমেশ্বর (৪) মার্কণ্ডেয়েশ্বর (৫) বিশ্বেশ্বর (৬) নীলকণ্ঠ (৭) বটমূলে বটেশ্বর। (৮)
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, গৌরী, লক্ষ্মী সবাই এসে গেলেন। লক্ষ্মীদেবী পিতামহ ব্রহ্মাকে
বললেন। আপনি এই অত্যজ্য ক্ষেত্রে সুবর্ণ বালুকায় আবৃত হয়ে আমাদের সঙ্গে অবস্থান
করবেন। সত্যযুগে বিষ্ণুপরায়ণ ও সকল যোগের আহর্তা,শাস্ত্রজ্ঞ এক রাজা জন্মগ্রহণ
করবেন, তাঁর নাম হবে ইন্দ্রদ্যুম্ন। তিনি এই পুণ্যক্ষেত্রে আসবেন, মহাভক্তি প্রকাশ
করবেন। ভগবান তাঁকে অনুগ্রহ করে একটি দারুতে উৎপন্ন হবেন।
এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা সূর্যবংশীয় শ্রী ইন্দ্রদ্যুম্ন মালবদেশে এলেন। অবন্তীনগরে
তাঁর রাজধানী। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যুগ সত্যযুগের সূচনা হল। রাজপুরোহিত বিদ্যাপতি।
ইন্দ্রদ্যুন্থের রাজসভায় ভগবৎ প্রেরিত এক বৈষ্ণব এসে শ্রীশ্রীনীলমাধবের কথা
শুনিয়ে গেলেন। ব্যাকুলের ব্যাকুলতা গেল। দিকে দিকে অনুসন্ধানকারীরা বেরিয়ে
পড়লেন অনুসন্ধানে। অনার্যদেশে রাজপুরোহিত বিদ্যাপতি সুকৌশলে সন্ধান
পেলেন শবর পূজিত নীলমাধবের। শবরের নাম ‘বিশ্বাবসু’। শুরু হল জগন্নাথ
কাহিনী। দীর্ঘ সময় দীর্ঘ কাহিনী। পূবেই এই সূত্রপাত কাহিনীর আর একটি রূপ বলা
হয়েছে।
আবার ফিরে আসি বাইশধাপের তৃতীয় ধাপে। এই ধাপ পবিত্রতম। শ্রীশ্রী
জগন্নাথ দেবের অভিষেক। এই অভিষেকে উপস্থিত থাকার জন্যে সব দেব দেবী
নীলাচলে নেমে এসেছেন। শিব তখনো কাশী থেকে এসে পৌঁছতে পারেননি। বৃদ্ধ
বৃষভ বাহনে চড়ে শিব যখন এলেন জগন্নাথদেব তখন রত্নবেদিতে আরোহণ করে
গেছেন। নেমে শিবকে অভ্যর্থনা করার উপায় নেই। বিশ্বনাথ তৃতীয়ধাপ পর্যন্ত উঠে
অপেক্ষা করছেন, জগন্নাথ দেব এসে অভ্যর্থনা করবেন। এদিকে অভিষেক শুরু হয়ে
গেছে। জগন্নাথ সিংহাসন ছেড়ে উঠতে পারছেন না। বিশ্বনাথ অপমানিত বোধ করে
তৃতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, আর এগোচ্ছেন না। কথাটা জগন্নাথদেবের কানে
গেল। জগন্নাথদেব বললেন, শিব ওইখানেই অবস্থান করুন। প্রতিবছর রথযাত্রার
সময় আমি তাঁকে দর্শন করব। রথযাত্রার প্রথম দিনে মন্দির থেকে বেরিয়েই দুই
দেবতার সাক্ষাৎকার। সবাই জানেন, জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরে বিশ্বনাথের দর্শন
জগন্নাথ দর্শনের মতোই সমান ফলপ্রদ। মন্দিরে যাঁরা আসেন তাঁরা প্রথমেই বিশ্বনাথ
দর্শন করেন, পরে জগন্নাথ। এর বিপরীত হওয়ার উপায় নেই। তৃতীয় ধাপেই পুণ্য
ফল লাভ। সত্য, ত্রেতা,দ্বাপর পেরিয়ে আমরা কলিতে কলকল করিতেছি। পুরাণের
কাল, রাজন্যবর্গের কাল অতিক্রম করে গণতস্ত্রে বসবাস। আধুনিক শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথ
দুর্গে সময় স্থির। জগন্নাথের অনন্তের ঘড়িতে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ স্থির। ব্রহ্মা,
বিষ্ণু, মহেশ্বর মিলিত তনু। পীঠদেবী বিমলা।
প্রভু কোন মাসে কী বেশ ধারণ করেন? বেশের রূপান্তর। বৈশাখে চন্দন বেশ।
প্রভু মদনমোহন। জ্যৈষ্ঠে হস্তিবেশ। প্রভু তখন গণেশ। স্নানযাত্রার পরে প্রভুর
গজানন বেশ ধারণের একটি গল্প আছে। কর্ণাট দেশের কানিয়ারি গ্রামের গণপতি
ভট্ট স্নানযাত্রার দিন লীলাচলে এলেন। তিনি ছিলেন গাণপত্য ব্রাহ্মণ। দারুব্রহ্ম
জগন্নাথদেবকে গণপতি মূর্তিতে দেখতে না পেয়ে সিদ্ধান্ত করলেন, ‘ব্রহ্ম নীলাচলে
নেই’। ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু জগন্নাথদেব ব্রাহ্মণের ঐকান্তিক বিশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে গজানন
রূপ প্রকট করলেন। গণপতি ভট্টের প্রার্থনা অনুসারে যাবচ্চন্দ্র দিবাকর’
স্নানযাত্রা-মহোৎসবের পরে প্রভু গণেশবেশ ধারণ করেন। জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্লা
একাদশীতে তাঁর রুক্মিনীহরণ বেশ। আষাঢ়ে শুণ্ডিচা থেকে ফিরে আসার পর
স্বর্ণবেশ। শ্রাবণে পর পর দুটি বেশ, চিতালাগি বেশ আর রাহুরেখালাগি বেশ।
ভাদ্রমাসে তাঁর শ্রীকৃষ্ণ লীলা। প্রথম বনভোজন বেশ, তারপর কালিয় দমন বেশ,
প্রলম্ববধ বেশ, অবশেষে বামন বেশ। আশ্বিনে তাঁর রাজবেশ। কার্তিকে তাঁর অনেক
রূপধারণ। লীলা জমজমাট। শ্রীরাধাদামোদর, ত্রিবিক্রম, বামন, নৃসিংহ, পরশুরাম,
সব শেষে রাজাধিরাজ। অঘ্রাণে শীতবস্ত্র অঙ্গে, যার নাম ওড়ন। মাঘ মাসে পদ্মবেশ।
মাঘী পূর্ণিমায় গজোদ্ধারণ বেশ। বসন্ত পঞ্চমীর দিন চাঁচেরি বেশ।ফাল্গুনে কুণ্ডলবেশ,
দোল-পূর্ণিমায় রাজবেশ। চৈত্রে প্রভু রামরাজা বেশে শ্রীরামচন্দ্র।
প্রভুর পূজা হবে কোন মন্ত্রে? ‘রাজভোগ’ অপ্রকাশিত একটি পুঁথি। সেখানে আছে
পূজাবিধি। তিনজন পুরোহিত তিন দেবতার পূজায় বসবেন। বাসুদেব মন্ত্রে বলভদ্রের
পূজা, ভুবনেশ্বরী মন্ত্রে সুভদ্রার আর মন্ত্ররাজ নৃসিংহ মন্ত্রে জগন্নাথদেবের। রাজা
ইন্দ্রদ্যুন্ন আদেশ পেয়েছিলেন, প্রভুকে নৃসিংহ মন্ত্রে পূজা করবে। নরসিংহের
পরিচিত মূর্তি হল, একটি মস্তক ও দুটি হাত।
জগন্নাথদেবের প্রসাদ রূপান্তরিত হবে মহাপ্রসাদে। কী ভাবে? আবার পুরাণ।
দেবী বিমলা প্রভু জগন্নাথকে তাঁর মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন একটি শর্তে।
জগন্নাথদেবকে নিবেদিত অন্নভোগ পরিচিত হবে ‘প্রসাদ’ নামে। এইবার সেই প্রসাদ
নিবেদিত হবে বিমলার কাছে। বিমলা গ্রহণ করার পর প্রসাদ রূপান্তরিত হবে
‘মহাপ্রসাদে’। এই মহাপ্রসাদে আচণ্ডালের অধিকার। চণ্ডাল এবং ব্রাহ্মণ একসঙ্গে এই
প্রসাদ গ্রহণ করলেও স্পর্শদোষে উচ্ছিষ্ট অপবিত্র হবে না। শেষতম কণিকাটিও
সমানভাবে পবিত্র থাকবে। জগন্নাথদেব শর্ত মেনে মন্দিরে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
এই মহাপ্রসাদ প্রকৃতই মহা-প্রসাদ। স্বয়ং ব্রহ্ম। সারা ভারতের মানুষের কাছে
একটি মহাবস্তু। তাঁরা বিশ্বাস করেন, স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী রন্ধন করেন আর রত্নবেদিতে
দাঁড়িয়ে দেবতারা গ্রহণ করেন।
সবচেয়ে রহস্যময় এই রত্নবেদী। দারুবিগ্রহে নয় এই রত্নবেদিতেই লুকিয়ে আছে
প্রকৃত রহস্য। একাধিক পণ্ডিতের এই অভিমত। তাঁরা বলছেন, এই মহাদেবীই প্রকৃত
সিদ্ধপীঠ, মহাপুণ্যক্ষেত্র। লক্ষ শালগ্রাম শিলায় তৈরি। ‘জগন্নাথের সিংহাসনটি ফাঁপা।
গর্ভগৃহের মৃদু আলোয় ভাল করে দেখাযায় না। এই সিংহাসনের মধ্যে গুপ্তদ্বার রয়েছে।
এই সিংহাসনের ফাঁপা অংশে রয়েছে ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর মন্ত্র। অতিগুপ্তভাবে রক্ষিত।
তাই ভোগ নিবেদন এই সিংহাসনের উদ্দেশেই করা হয়।সিংহাসনহীন বিগ্রহের কোনো
তাৎপর্য নেই। তাই রথের সময় জগন্নাথদেবের প্রসাদকে ‘মহাপ্রসাদ’ বলে না।’
স্নানযাত্রায় ‘স্বর্ণকূপের’ ১০৮ ঘড়া জলে স্নান। তারপর পনেরো দিন অসুস্থ। এই
পনেরো দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ। এই সময়টিকে বলে অনবসর কাল। যেহেতু
পূজার অবসর থাকে না, সেইহেতু ‘অনবসর’। এই সময় বিগ্রহদের সমস্ত দায়-দায়িত্ব
অর্পিত হয় শবর দয়িতাদের হাতে। তাঁরাই যে প্রভুর অতি আপনজন। একদা অরণ্যে
অধুনা রাজন্যে। এই অনবসরে বিগ্রহ-সেবায় ব্রাহ্মণরা অনধিকারী। ব্রাহ্মণ পূজারীদের
যে-অধিকার নেই শবর দয়িতাদের সেই সব অধিকার আছে। এক আসনে বসে
দেবতাদের নৈবেদ্য নিবেদন করে নিজেরাও আহার করেন। ফল সুস্বাদু কি-না
নিজেরা চেখে দেখে ভগবানকে দেন। সন্তান ভগবান, অতি আপনজন। শাস্ত্রের
শাসনমুক্ত স্নেহের পূজা। অনবসরকালের এই পূজা ‘গুপ্ত পূজা’, লোকচক্ষুর
আড়ালে। দরজা বন্ধ করে। এ হল তান্ত্রিক রীতি। পূজারী বলছেন, নে খা। মাঝে
মাঝে এমন পূজা দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও করে গেছেন ভাবমুখে।
মহাপ্রসাদ তান্ত্রিক শব্দ। মহাপ্রসাদে বলির ছাগমাংস থাকা চাই। ভৈরবী চক্রে জাতিবর্ণ
নির্বিশেষে কৌলরা সাধনায় বসবেন। পঞ্চমকার পরিচিত শব্দ। বিমলা, কমলা চক্রে
অধিষ্ঠিতা ভৈরবী। জগন্নাথ স্বামী ভৈরব, রত্নবেদিতে ত্রিপুরাযন্ত্রে অধিষ্ঠিত।
পুরুযোত্তম ক্ষেত্রে বিমলা সবৈশ্বরী। কষ্টি পাথরে নির্মিত দেবী-মূর্তি। দাঁড়িয়ে আছেন
চতুর্ভুজা। চার হাতে ত্রিশূল, খঙ্গা, খর্পর আর রুদ্রাক্ষমালা। তিনটি চোখ সোনার। দেবীর
দুপাশে প্রস্তরনির্মিত দুটি মুর্তি, ছায়া আর মায়া। ভারতের চারটি সিদ্ধপীঠের একটি।
জ্বালামুখী, কামাখ্যা, কন্যাকুমারী, বিমলা। মা দুর্গাই তন্ত্রে বিমলা। প্রধানা সর্বশক্তিনাং
বলা বলবতী পরা। সর্বসিদ্ধিপ্রদা দেবী পরমা যোগরূপিনি। ধ্যানমন্ত্র-চণ্ডীর ধ্যান।
বীজমন্ত্র ওঁ হ্রীং। অনুকল্প পঞ্চমকারে তাঁর পূজা। মৎস্য-হিং দিয়ে রান্না করা শাক।
মাংস-আদা কুচি। মদ্য-কাংস পাত্রে ডাবের জল। মুদ্রা-জলে গোলা ময়দা আব
চিনি। মৈথুন-রক্তচন্দন মাখানো অপরাজিতা ফুল। তারপর আসবে শারদোৎসব।
ষোল দিনের বিশেষ পূজা। পূজার পুরোহিত হবেন নরসিংহপুবের রথ সামন্তগণ,
বোড়ঙ্গেব প্রাচীন বক্সীদের কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন তন্ত্রধারক। জগন্নাথদেব তাঁর
প্রতিনিধিকে পাঠাবেন, ভৈরব দুর্গামাধব। তিনি ছোট্ট একটি বিগ্রহ হযে বসবেন
দেবীর ডান পাশে। এই ষোলো দিনে দেবী ধাবণ করবেন বিভিন্ন বেশ। প্রথম দিন,
বিমল, দ্বিতীয় দিনে ভুবনেশ্বরী, তৃতীয় দিনে বন দুর্গা, চতুর্থদিনে রাজরাজেশ্বরী,
পঞ্চম দিনে উগ্রতারা, ষষ্ঠদিনে মাতঙ্গিনী, সপ্তম দিনে বগলা, অষ্টম দিনে নারায়ণী,
নবমদিনে সিংহবাহিনী, দশম দিনে জয়দুর্গা, একাদশ দিনে শূলীদুর্গা, দ্বাদশ দিনে
হরচণ্ডী, শেষ চারদিন আবার বিমলার বেশ।
এইবার এসে যাবে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী। আর অনুকল্প পূজা নয়। পুরোপুরি
‘রহস্যপূজা’। থমথমে মধ্যরাত। অন্ধকার সমুদ্রে ফসফরাসের খিলখিল হাসি।
আকাশের এক কোণে সপ্তমীর মৌলী চাঁদ। মন্দিরের দরজা বন্ধ। আসনে প্রবীণ
তান্ত্রিকরা। পুরুষোত্তম পীঠ এই রাত তন্ত্রপীঠ, বিমলাপীঠ। ভোগে নিরামিষ নয় প্রকৃত
মৎস্য। হাড়িকাঠে একটি মেষ। জগন্নাথদেব আজ ভৈরব। গা ছম ছম ওই পরিবেশে,
তরল আলোর অন্ধকারে ভাসিয়ে দি সেই মন্ত্র-মা বিমলা-
মোক্ষকামী লভতে ভক্তিং দর্শনাৎ বিমলেশ্বরীম্।
যশোজ্ঞানবলাকাঙ্ক্ষী লভ্যত সিদ্ধিংনিশ্চিতম্ ।।
উগ্রসিদ্ধিং লভতে কামী সর্বেষাং সিদ্ধিদায়িকে।
যথাভক্তিস্তথা সিদ্ধির্জায়তে নাত্র সংশয়ঃ।
এইভাবেই দিন যাবে। অনন্তসমুদ্র অনন্ত কাল ঢেউয়ের হিসেব করবে।
সুবর্ণবালুকাবেলা ব্রহ্মস্বরূপ। পুরুষোত্তম অস্তিত্বের চিরসাক্ষী। অনন্তভক্ত স্রোত।
অসম্ভব এই পুরুষোত্তম। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অত বড় জ্ঞানী আচার্য শঙ্কর এইটুকুই
বলতে পেরেছিলেন, ‘জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে’।
[ ঋণস্বীকার: স্কন্দপুরাণম, সুশীল মুখোপাধ্যায়, ডঃ বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুন্দরানন্দ
বিদ্যাবিনোদ]