গীতা-প্রবাহ দ্বিতীয় অধ্যায় – সাংখ্য-যোগ

শ্লোক ১ – ১০ – কৃষ্ণের কাছে অর্জুনের আত্মসমর্পণ

*শ্লোক ১ — (সঙ্গতি) অর্জুন গাণ্ডীব পরিত্যাগ করে রথের উপর উপবিষ্ট হলে কি ঘটেছিল? –
অর্জুনের করুণ অবস্থা দর্শন করে শ্রীকৃষ্ণের উক্তি – সঞ্জয় বললেন- অর্জুনকে এভাবে অনুতপ্ত, ব্যাকুল ও অশ্রুসিক্ত
দেখে, কৃ পায় আবিষ্ট হয়ে মধুসূদন বা শ্রীকৃষ্ণ এই কথাগুলি বললেন ।

*শ্লোক ২-৩ —
অর্জুনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভর্ৎসনা – পুরুষোত্তম শ্রীভগবান বললেন- প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা
জীবনের প্রকৃ ত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব
তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে । হে পার্থ! এই সম্মান হানিকর ক্লীবত্বের
বশবর্তী হয়ো না । এই ধরনের আচরণ তোমার পক্ষে অনুচিত । হে পরন্তপ! হৃদয়ের এই ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে তুমি উঠে
দাঁ ড়াও ।

*শ্লোক ৪ — (সঙ্গতি) আমি হৃদয়ের দুর্বলতাবশতঃ যুদ্ধ হতে নিরস্ত হচ্ছি না, কিন্তু এই যুদ্ধকার্য অন্যায় ও অধর্মকর বলেই তা
থেকে ক্ষান্ত হচ্ছি – একথা বুঝাবার জন্য অর্জুন বলছেন –
অর্জুনের আত্মপক্ষ সমর্থন – অর্জুন বললেন- হে অরিসূদন ! হে মধুসূদন ! এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভীষ্ম ও দ্রোণের মতো পরম
পূজনীয় ব্যক্তিদের কেমন করে আমি বাণের দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব?

*শ্লোক ৫ — (সঙ্গতি) শ্রীকৃষ্ণ যদি বলেন, “তাঁদেরকে বধ না করে তোমার দেহযাত্রা কিভাবে নির্বাহ হবে?” এর উত্তরে অর্জুন
বলছেন –
শিক্ষাগুরুদের হত্যার বিনিময়ে প্রাপ্ত ভোগের পরিবর্তে ভিক্ষার জীবন আরও ভাল – আমার মহানুভব শিক্ষাগুরুদের
জীবন হানি করে এই জগৎ ভোগ করার থেকে বরং ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করা ভাল । তাঁ রা পার্থিব বস্তুর অভিলাষী হলেও
আমার গুরুজন । তাঁদের হত্যা করা হলে, যুদ্ধলব্ধ সমস্ত ভোগ্যবস্তু তাঁদের রক্তমাখা হবে ।

*শ্লোক ৬-৭ — (সঙ্গতি) আর অধর্ম হয় হউক, এরূপ স্থির করে যদি যুদ্ধ করি, তথাপি আমাদের জয় কিংবা পরাজয়ের কোনটি
শ্রেয়, তা বুঝতে পারছি না, তাই বলছেন –
অর্জুনের সিদ্ধান্তহীনতা ও শরণাগতি – তাদের জয় করা শ্রেয়, না তাদের দ্বারা পরাজিত হওয়া শ্রেয়, তা আমি বুঝতে
পারছি না । আমরা যদি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করি, তা হলে আমাদের আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে না । তবুও এই রণাঙ্গনে
তারা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে । কার্পণ্যজনিত দুর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যমিূঢ় হয়েছি এবং আমার কর্তব্য
সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়েছি । এই অবস্থায় আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর, তা আমাকে বল ।
এখন আমি তোমার শিষ্য এবং সর্বতোভাবে তোমার শরণাগত । দয়া করে তুমি আমাকে নির্দেশ দাও ।

*শ্লোক ৮ — (সঙ্গতি) শ্রীকৃষ্ণ হয়ত বলতে পারেন, “হে অর্জুন, যা তোমার নিজের পক্ষে ভাল, তা তুমিই বিবেচনা করে স্থির
কর ।” এরূপ আশঙ্কা করে অর্জুন বললেন –
স্বীয় দুর্বলতার কথা প্রকাশ – আমার ইন্দ্রিয়গুলিকে শুকিয়ে দিচ্ছে যে শোক, তা দূর করবার কোন উপায় আমি খুঁজে
পাচ্ছি না । এমন কি স্বর্গের দেবতাদের মতো আধিপত্য নিয়ে সমৃদ্ধিশালী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন রাজ্য এই পৃথিবীতে লাভ করলেও
আমার এই শোকের বিনাশ হবে না ।

*শ্লোক ৯ — (সঙ্গতি) এরূপ বলে অর্জুন কি করলেন? এই মর্মে সঞ্জয় বললেন –
যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে অর্জুনের মৌনাবস্থা অবলম্বন – এভাবে মনোভাব ব্যক্ত করে গুড়াকেশ অর্জুন তখন
হৃষীকেশকে বললেন, “হে গোবিন্দ! আমি যুদ্ধ করব না,” এই বলে তিনি মৌন হলেন ।

*শ্লোক ১০ — (সঙ্গতি) তারপর কি হল? –
স্মিত হেসে ভগবানের বাণী – হে ভরতবংশীয় ধৃতরাষ্ট্র! সেই সময় স্মিত হেসে শ্রীকৃষ্ণ উভয় পক্ষের সৈন্যদের
মাঝখানে বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে এই কথা বললেন ।

শ্লোক ১১ – ৩০ – জ্ঞানযোগ প্রাপ্ত হয়ে যুদ্ধ কর
[যুদ্ধ না করার ১ম যুক্তি (করুণা) খণ্ডন]

*শ্লোক ১১ — (সঙ্গতি) অর্জুনের এই শোকের কারণ ছিল দেহ ও আত্মার পার্থক্য সম্বন্ধে অজ্ঞতা । অতএব সেই দেহ ও আত্মার
মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করার জন্য শ্রীভগবান বললেন –
যথার্থ পণ্ডিত কখনও কারও জন্য শোক করেন না – তুমি প্রাজ্ঞের মতো কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিত
নয়, সেই বিষয়ে শোক করছ । যাঁ রা যথার্থই পন্ডিত তাঁ রা কখনও জীবিত অথবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না ।

*শ্লোক ১২ — (সঙ্গতি) কেন অশোচ্য ? –
নিত্য অস্তিত্ব – এমন কোন সময় ছিল না যখন আমি, তুমি ও এই সমস্ত রাজারা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনও
আমাদের অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে না ।

*শ্লোক ১৩ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “ওহে! তুমি ত ঈশ্বর, তোমার যে জন্ম-মরণ নেই তা সত্য, কিন্তু জীবের ত’
জন্মমরণ আছে ।” এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন –
স্থিতপ্রজ্ঞ পন্ডিতেরা আত্মার দেহান্তরে মুহ্যমান হন না – দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার
রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য কোনও দেহে দেহান্তরিত হয় । স্থিতপ্রজ্ঞ
পন্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না ।

*শ্লোক ১৪ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “আমি তাঁদের জন্য শোক করছি না । কিন্তু তাঁদের মৃত্যুতে পরবর্তীতে আমিই
দুঃখভাগী হব । অতএব সেহেতু আমি নিজের জন্যই শোক করছি ।” এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন –
শীত ও গ্রীষ্মের গমনাগমনের ন্যায় সুখ ও দুঃখকেও সহ্য কর – হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে
অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয় । সেগুলি ঠিক যেন শীত ও গ্রীষ্ম ঋতুর গমনাগমনের মতো । হে ভরতকুল-প্রদীপ! সেই
ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর ।

*শ্লোক ১৫ — (সঙ্গতি) দুঃখ প্রতীকারের চেষ্টা করা অপেক্ষা তা সহ্য করাই উচিত, কেননা তাতে মহাফল লাভ হয়, – সেজন্য
বলছেন –
মুক্তি লাভের প্রকৃ ত অধিকারী ব্যক্তির লক্ষণ – হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন)! যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে সমান জ্ঞান
করেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃ ত অধিকারী ।

*শ্লোক ১৬ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “শীত-উষ্ণ ইত্যাদি অত্যন্ত দুঃসহ, তা কিভাবে সহ্য করব? অত্যধিক সহ্য করলে
কখনও আত্মনাশ ঘটতে পারে ।” এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন যে, এরূপ আশঙ্কা ঠিক নয় । কারণ তত্ত্ববিচারপূর্বক ঐ সকল
সহ্য করতে পারা যায় ।
আত্মা ও জড় বস্তু সম্বন্ধে তত্ত্বদ্রষ্টা ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত – যাঁ রা তত্ত্বদ্রষ্টা তাঁ রা সিদ্ধান্ত করেছেন যে অনিত্য জড় বস্তুর
স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না । তাঁ রা উভয় প্রকৃতির যথার্থস্বরূপ উপলব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত
হয়েছেন ।

*শ্লোক ১৭ — (সঙ্গতি) পূর্বশ্লোকে সদ্‌বস্তুটি অবিনাশী – এটি সামান্যভাবে বলেছেন, এখন তা বিশেষভাবে বলছেন –
আত্মা অবিনাশী, সমগ্র শরীরে পরিব্যপ্ত – যা সমগ্র শরীরে পরিব্যপ্ত হয়ে রয়েছে, তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে ।
সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয় ।

*শ্লোক ১৮ — (সঙ্গতি) উৎপত্তি ও বিনাশশীল অসতের স্বরূপ কি? –
আত্মা ও জড়দেহের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য জেনে যুদ্ধ কর – অবিনাশী, অপরিমেয় ও শাশ্বত আত্মার জড় দেহ
নিঃসন্দেহে বিনাশশীল । অতএব হে ভারত! তুমি শাস্ত্রবিহিত স্বধর্মপরিত্যাগ না করে যুদ্ধ কর ।

*শ্লোক ১৯ — (সঙ্গতি) তোমার ভীষ্মাদির মৃত্যুজনিত শোক নিবারিত হল, কিন্তু “আমি এদেরকে বধ করতে ইচ্ছা করি না”
ইতাদি বলে যে আত্মাকে হন্তা বলে দুঃখ প্রকাশ করা হচ্ছে তাও যে অকারণ, সেটিই বলছেন –
আত্মা কি হন্তা নাকি হত? – যিনি জীবাত্মাকে হন্তা বলে মনে করেন কিংবা যিনি একে নিহত বলে ভাবেন, তাঁ রা
উভয়েই আত্মার প্রকৃ ত স্বরূপ জানেন না । কারণ আত্মা কাউকে হত্যা করেন না এবং কারও দ্বারা নিহতও হন না ।

*শ্লোক ২০ — (সঙ্গতি) আত্মা যে হত হয় না, তা যে জন্ম, স্থিতি, বৃদ্ধি, পরিণাম, ক্ষয় ও নাশরূপ ষড়্‌ বিকারশূন্য, সেটিই দৃঢ়
করে বলছেন –
আত্মার স্বরূপ (বৈশিষ্ট্য) – আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁ র উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না ।
তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন । শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না ।

*শ্লোক ২১ — (সঙ্গতি) অতএব পূর্বে যে বলা হয়েছিল, “আত্মা হন্তা নয়”, – সেটি বলছেন ।
আত্মার স্বরূপ (বৈশিষ্ট্য) সম্বন্ধে জ্ঞাত ব্যক্তি কিভাবে হত্যাকারী হতে পারেন? – হে পার্থ! যিনি এই আত্মাকে অবিনাশী,
শাশ্বত, জন্মরহিত ও অক্ষয় বলে জানেন, তিনি কিভাবে কাউকে হত্যা করতে বা হত্যা করাতে পারেন?

*শ্লোক ২২ — সঙ্গতিঃ অর্জুন যদি বলেন, “আত্মা অবিনাশী হলেও তার শরীরের নাশ হয়, এটি পর্য্যালোচনা করে শোক করছি ।”
তার উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোক বলছেন –
দৃষ্টান্তঃ আত্মার দেহ পরিবর্তনের সাথে মানুষের জীর্ণ বস্ত্র পরিবর্তনের তুলনা – মানুষ যেমন জীর্ণবস্ত্র পরিত্যাগ করে
নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণশরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন ।

*শ্লোক ২৩ — (সঙ্গতি) “কথং হন্তি” – ‘কি প্রকারে বধ করে’ (শ্লোক ২১) ইত্যাদি শ্লোকে উক্ত বাক্যদ্বারা বধসাধনের অভাব
দেখিয়ে আত্মার অবিনাশিত্ব পরিস্ফুট করে বলছেন –
আত্মার স্বরূপ (বৈশিষ্ট্য) – আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ভেজানো যায় না,
অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না ।

*শ্লোক ২৪ — (সঙ্গতি) উক্ত বিষয়ে কারণ দেড়টি শ্লোক দ্বারা বলছেন –
আত্মার স্বরূপ (বৈশিষ্ট্য) – এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও অশোষ্য । তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়,
অচল ও সনাতন ।

*শ্লোক ২৫ — (সঙ্গতি) উক্তবাক্যের উপসংহার করছেন –
এই আত্মার স্বরূপ জেনে দেহের জন্য শোক করা উচিত নয় – এই আত্মাকে অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে
উক্ত হয়েছে । অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয় ।

*শ্লোক ২৬ — (সঙ্গতি) “আত্মার জন্য শোক করা কর্তব্য নয়” — এটি পূর্বে বলা হয়েছে । “এখন দেহের সাথে আত্মার জন্ম
এবং দেহের নাশ হলে আত্মারও নাশ হয়”— এটি স্বীকার করলেও শোক করা কর্তব্য নয় । এটিই বলছেন –
বিকল্প যুক্তির দ্বারা সান্ত্বনা দেবার প্রচেষ্টা – হে মহাবাহো! আর যদি তুমি মনে কর যে, আত্মার বারবার জন্ম হয় এবং
মৃত্যু হয়, তা হলেও তোমার শোক করার কোন কারণ নেই ।

*শ্লোক ২৭ — সঙ্গতিঃ কেন শোক করবে না? –
অবশ্যম্ভাবী জন্ম-মৃত্যুর জন্য শোক করা উচিত নয় – যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে
তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী । অতএব অপরিহার্যকর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিত নয় ।

*শ্লোক ২৮ — (সঙ্গতি) আর, কর্মের জন্য দেহাদি হয় ও নাশ পায় — এরূপ দেহাদির স্বভাব পর্য্যালোচনা করে আত্মার যে
জন্মমরণ, তা দেহরূপ উপাধিবশত হয় বলে শোক করা কর্তব্য নয় । তাই বলছেন –
জীবের অস্তিত্ব নিত্য – কখনো অপ্রকাশিত, কখনো প্রকাশিত – হে ভারত! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে
অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকালে প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায় । সুতরাং সেই জন্য শোক
করার কি কারণ ?

*শ্লোক ২৯ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “তাহলে এই সংসারে বিদ্বান্‌ ব্যক্তিরাও কেন শোক করেন?” তার উত্তরে শ্রীভগবান
বলছেন, “আত্মার বিষয়ে অজ্ঞানই এর কারণ ।” এই অভিপ্রায়ে আত্মার দুর্বিজ্ঞেয়ত্ব বলছেন –
আত্মার আশ্চর্যবৎ প্রতীতি – কেউ এই আত্মাকে আশ্চর্যবৎ দর্শন করেন, কেউ আশ্চর্যভাবে বর্ণনা করেন এবং কেউ
আশ্চর্যজ্ঞানে শ্রবণ করেন, আর কেউ শুনেও তাকে বুঝতে পারেন না ।

*শ্লোক ৩০ — (সঙ্গতি) উক্ত প্রকারে আত্মার অবধ্যত্ব সংক্ষেপে বলে শোক করা যে অনুচিত তারই উপসংহার করছেন ।
আত্মা সর্বদাই অবধ্য, তাই কোন জীবের জন্য শোক করা উচিত নয় – হে ভারত! প্রাণীদের দেহে অবস্থিত আত্মা
সর্বদাই অবধ্য । অতএব কোন জীবের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয় ।

শ্লোক ৩১ – ৩৮ – কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে যুদ্ধ কর

*শ্লোক ৩১-৩২ — (সঙ্গতি) আরও, এই যে মহৎ শ্রেয়ঃ আপনা হতেই উপস্থিত হওয়ায় তুমি বিকম্পিত হচ্ছ কেন? এটিই
বলছেন–
“আমি স্বজন বধ করে কিভাবে সুখি হব?” অর্জুনের এই যুক্তিও নিরস্ত হলো –
যুদ্ধ না করার ২য় যুক্তি (উপভোগ) খণ্ডন – ক্ষত্রিয়রূপে তোমার স্বধর্মবিবেচনা করে তোমার জানা উচিত যে, ধর্ম
রক্ষার্থেযুদ্ধ করার থেকে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নেই । তাই, তোমার দ্বিধাগ্রস্থ হওয়া উচিত নয় । হে পার্থ! স্বর্গদ্বার
উন্মোচনকারী এই প্রকার ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না চাইতেই যে সব ক্ষত্রিয়ের কাছে আসে, তাঁ রা সুখী হন ।

*শ্লোক ৩৩-৩৬ — (সঙ্গতি) অন্যথা আচরণের দোষ দেখাচ্ছেন –
এই ধর্মযুদ্ধ না করার পরিণতি – কিন্তু, তুমি যদি এই ধর্মযুদ্ধ না কর, তা হলে তোমার স্বীয় ধর্মএবং কীর্তি থেকে ভ্রষ্ট
হয়ে পাপ ভোগ করবে । সমস্ত লোক তোমার কীর্তিহীনতার কথা বলবে এবং যে-কোন মর্যাদাবান লোকের পক্ষেই এই অসম্মান
মৃত্যু অপেক্ষাও অধিকতর মন্দ । সমস্ত মহারথীরা মনে করবেন যে, তুমি ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছ এবং তুমি যাদের
কাছে সম্মানিত ছিলে, তারাই তোমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য জ্ঞান করবে । তোমার শত্রুরা তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করে বহু অকথ্য কথা
বলবে । তার চেয়ে অধিকতর দুঃখদায়ক তোমার পক্ষে আর কি হতে পারে?

*শ্লোক ৩৭ — (সঙ্গতি) পূর্বে অর্জুন বলেছিলেন (২/৬ শ্লোকে) “তাদের জয় করা শ্রেয়, না তাদের দ্বারা পরাজিত হওয়া শ্রেয়,
তা আমি বুঝতে পারছি না ।” এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন –
যুদ্ধ না করার ৫ম যুক্তি (সিদ্ধান্তহীনতা) খণ্ডন – হে কুন্তীপুত্র! এই যুদ্ধে নিহত হলে তুমি স্বর্গলাভ করবে, আর জয়ী
হলে পৃথিবী ভোগ করবে । অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সংকল্প হয়ে উত্থিত হও ।

*শ্লোক ৩৮ — (সঙ্গতি) পূর্বে অর্জুন বলেছিলেন (১/৩৬ শ্লোকে) “পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্…” ইত্যাদি (এদেরকে বধ করলে
মহাপাপ আমাদের আচ্ছন্ন করবে ।) এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন –
যুদ্ধ না করার ৩য় যুক্তি (পাপের ভয়) খণ্ডন – সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি ও জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে তুমি যুদ্ধের
নিমিত্ত যুদ্ধ কর, তা হলে তোমাকে পাপভাগী হতে হবে না ।

শ্লোক ৩৯ – ৫৩ – বুদ্ধিযোগ স্তরে অধিষ্টিত হয়ে যুদ্ধ কর

*শ্লোক ৩৯ — (সঙ্গতি) উপদিষ্ট জ্ঞানযোগের উপসংহার করে তার সাধনভূত কর্মযোগের প্রস্তাব করছেন –
ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী বুদ্ধি – হে পার্থ! আমি তোমাকে সাংখ্য-যোগের কথা বললাম । এখন ভক্তিযোগ সম্বন্ধিনী বুদ্ধির
কথা শ্রবণ কর, যার দ্বারা তুমি কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবে ।

*শ্লোক ৪০ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “ওহে! কখনও কখনও প্রচুর বিঘ্ন থাকলে কৃষিকার্যের ন্যায় কর্মফল নষ্ট হয়, আর
মন্ত্রাদির অঙ্গহানি হলেও হবার সম্ভাবনা আছে, অতএব কর্মযোগের দ্বারা কিভাবে কর্মবন্ধন নষ্ট হইবে?” এর উত্তরে শ্রীভগবান
বলছেন —
ভক্তিযোগের অব্যর্থতা – ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনও ব্যর্থহয় না এবং তার কোনও ক্ষয় নেই । তার স্বল্প অনুষ্ঠানও
অনুষ্ঠাতাকে সংসাররূপ মহাভয় থেকে পরিত্রাণ করে ।

*শ্লোক ৪১ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “কেন রক্ষা করেন?” এর উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম ও সকাম কর্মের পার্থক্য
দেখিয়ে বলছেন —
ভক্ত ও অভক্তের মধ্যে পার্থক্য – যারা এই পথ অবলম্বন করেছে তাদের নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি একনিষ্ঠ । হে কুরুনন্দন,
অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিদের বুদ্ধি বহু শাখাবিশিষ্ট ও বহুমুখী ।

*শ্লোক ৪২-৪৪ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “সকাম কর্মীরা কষ্টসাধ্য কাম্য কর্ম পরিত্যাগ করে ঈশ্বরে নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি কেন
করে না?” তার উত্তর শ্রীভগবান বলছেন —
বেদের পুষ্পিত বাক্য – বিবেকবর্জিত লোকেরাই বেদের পুষ্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গসুখ ভোগ, উচ্চকুলে জন্ম,
ক্ষমতা লাভ আদি সকাম কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে । ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃ ষ্ট হয়ে তারা
বলে যে, তার উর্ধ্বে আর কিছুই নেই । যারা ভোগ ও ঐশ্বর্যসুখে একান্ত আসক্ত, সেই সমস্ত বিবেকবর্জিত মূঢ় ব্যক্তিদের বুদ্ধি
সমাধি অর্থাৎ ভগবানে একনিষ্ঠতা লাভ হয় না ।

*শ্লোক ৪৫ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “যদি স্বর্গাদি লাভ পরমফলই নয়, তবে কেন বেদ তার সাধনরূপ কর্মাদির বিধান
করেন?” তার উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন —
যুদ্ধ না করার ৪র্থ যুক্তি (কুলক্ষয়) খণ্ডন – বেদে প্রধানত জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সম্বন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে ।
হে অর্জুন! তুমি সেই গুণগুলিকে অতিক্রম করে নির্গুণ স্তরে অধিষ্ঠিত হও । সমস্ত দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হও এবং লাভ-ক্ষতি ও
আত্মরক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে অধ্যাত্ম চেতনায় অধিষ্ঠিত হও ।

*শ্লোক ৪৬ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “ওহে! বেদে বর্ণিত নানা ফল ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে ঈশ্বর-আরাধনা-বিষয়ক
নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিও কুবুদ্ধিই বটে ।” এরকম কথা আশঙ্কা করে শ্রীভগবান বলছেন —
দৃষ্টান্তঃ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জলাশয় – ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সমস্ত প্রয়োজন সাধিত হয়, সেগুলি বৃহৎ জলাশয় থেকে আপনা
হতেই সাধিত হয়ে যায় । তেমনই, ভগবানের উপাসনার মাধ্যমে যিনি পরব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করে সব কিছুর উদ্দেশ্য উপলব্ধি
করেছেন, তাঁ র কাছে বেদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে ।

*শ্লোক ৪৭ — (সঙ্গতি) এর প্রেক্ষিতে অর্জুন যদি বলেন, “তবে, পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনাতেই সকল কর্মফল লাভ হয় —
এই অভিসন্ধিতে সকলে প্রবৃত্ত হউক; কর্ম করে কি হবে?” তাই অর্জুনের এই সম্ভাব্য আশংকা নিবারণ করার জন্য শ্রীভগবান
বলছেন—
জীবের অধিকার (কিসে আছে – কিসে নেই) – স্বধর্মবিহিত কর্মেতোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে
তোমার অধিকার নেই । কখনও নিজেকে কর্মফলের হেতুবলে মনে করো না এবং কখনও স্বধর্মআচরণ না করার প্রতি আসক্ত
হয়ো না ।

*শ্লোক ৪৮ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “তবে কি করতে হবে?” তার উত্তর শ্রীভগবান বলছেন —
যোগের সংজ্ঞা – হে অর্জুন! ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তিযোগস্থ হয়ে স্বধর্ম-বিহিত কর্মআচরণ কর ।
কর্মের সিদ্ধি ও অসিদ্ধি সম্বন্ধে যে সমবুদ্ধি, তাকেই যোগ বলা হয় ।

*শ্লোক ৪৯ — (সঙ্গতি) কাম্যকর্ম অতি নিকৃ ষ্টতার কথা বলছেন –
কৃ পণের সংজ্ঞা – হে ধনঞ্জয়! বুদ্ধিযোগ দ্বারা ভক্তির অনুশীলন করে সকাম কর্মথেকে দূরে থাক এবং সেই চেতনায়
অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের শরণাগত হও । যারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করতে চায়, তারা কৃ পণ ।

*শ্লোক ৫০ — (সঙ্গতি) কিন্তু বুদ্ধিযোগযুক্ত ব্যক্তি শ্রেষ্ট –
পাপ-পুণ্য থেকে মুক্তির উপায় – যিনি ভগদ্ভক্তির অনুশীলন করেন, তিনি এই জীবনেই পাপ ও পুণ্য উভয় থেকেই
মুক্ত হন । অতএব, তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান কর । সেটিই হচ্ছে সর্বাঙ্গীণ কর্মকৌশল ।

*শ্লোক ৫১ — (সঙ্গতি) কর্মসকলের মোক্ষসাধনত্ব কি প্রকার হয়? –
মোক্ষ লাভের উপায় – মনীষিগণ ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত
হন । এভাবে তাঁ রা সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার অতীত অবস্থা লাভ করেন ।

*শ্লোক ৫২-৫৩ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “কবে আমি সেই পদ লাভ করব?” এই অপেক্ষায় দুটি শ্লোকে বলছেন —
নিষ্কাম কর্ম অভ্যাসের ফল – এভাবে পরমেশ্বর ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্মঅভ্যাস করতে করতে যখন তোমার বুদ্ধি
মোহরূপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছুশুনেছ এবং যা কিছুশ্রবণীয়, সেই সবের প্রতি
সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ হতে পারবে । তোমার বুদ্ধি যখন বেদের বিচিত্র ভাষার দ্বারা আর বিচলিত হবে না এবং আত্ম-উপলব্ধির
সমাধিতে স্থির হবে, তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে ।

শ্লোক ৫৪ – ৭২ – স্থিতপ্রজ্ঞ বা সমাধি স্তরে অধিষ্টিত হয়ে যুদ্ধ কর

*শ্লোক ৫৪ — (সঙ্গতি) পূর্বশ্লোকে কথিত আত্মতত্ত্বজ্ঞের লক্ষণ জানতে ইচ্ছা করে অর্জুনের জিজ্ঞাসা –
স্থিতপ্রজ্ঞ সম্বন্ধে ৪টি প্রশ্ন – অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কেশব! স্থিতপ্রজ্ঞ অর্থাৎ অচলা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কি?
তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি বিচরণ করেন?

*শ্লোক ৫৫-৫৬ — (সঙ্গতি) এস্থলে যাহা সাধকদের জ্ঞানের সাধন, তা-ই সিদ্ধব্যক্তির স্বাভাবিক লক্ষণ, এই হেতু সিদ্ধব্যক্তির
লক্ষণ বর্ণনা করতে করতে অন্তরঙ্গ সাধন সমূহ এই অধ্যায়ের শেষ পর্যন্ত বলছেন –
স্থিতপ্রজ্ঞের সংজ্ঞা – পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভুত সমস্ত
মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণপরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে
স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয় । ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যাঁ র মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যাঁ র স্পৃহা হয় না এবং যিনি রাগ,
ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ ।

*শ্লোক ৫৭ — (সঙ্গতি) অর্জুনের প্রশ্ন ছিল, “স্থিতপ্রজ্ঞ কি বলেন?” এর উত্তরে বলছেন —
জড় জগতে যিনি সমস্ত বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দ্বেষ
করেন না, তিনি পূর্ণজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ।

*শ্লোক ৫৮ — (সঙ্গতি) অর্জুনের প্রশ্ন ছিল, “কিমাসীত – কিভাবে অবস্থান করেন?” এর উত্তরে বলছেন —
দৃষ্টান্ত ~ স্থিতপ্রজ্ঞ জিতেন্দ্রিয় – কূর্মযেমন তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সঙ্কুচিত করে, তেমনই যে
ব্যক্তি তাঁ র ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, তাঁ র চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত ।

*শ্লোক ৫৯ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “ওহে! ইন্দ্রিয়গণের বিষয়ে অপ্রবৃত্তিই স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ হতে পারে না; কেননা
জড়, আতুর, উপবাস পরায়ণ ব্যক্তিগণেরও বিষয়ের প্রতি প্রবৃত্তি থাকে না ।” এর উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন —
ভক্তি প্রবৃত্তি ~ বিষয় নিবৃত্তি – দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ থেকে নিবৃত্ত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয়সুখ
ভোগের আসক্তি থেকে যায় । কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থেকে চিরতরে নিবৃত্ত হন ।

*শ্লোক ৬০-৬১ — (সঙ্গতি) ইন্দ্রিয়সংযম ব্যতীত স্থিতপ্রজ্ঞতা সম্ভব হয় না, অতএব সাধনাবস্থাতে সংযম-বিষয়ে মহাযত্ন করা
কর্তব্য, এ কথাই দুটি শ্লোকে বলছেন —
বাহ্য ইন্দ্রিয় সংযমের অভাবে সৃষ্ট দোষ – হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান এবং ক্ষোভকারী যে, তারা অতি
যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে । যিনি তাঁ র ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করে
আমার প্রতি উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে তাঁ র ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করেছেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ।

*শ্লোক ৬২-৬৩ — (সঙ্গতি) পূর্বশ্লোকে বাহ্যেন্দ্রিয়-সংযমের অভাবে যে দোষ ঘটে তা বলে এখন দুইটি শ্লোকদ্বারা মনঃসংযমের
অভাবজনিত দোষ বলছেন —
মনঃসংযমের অভাবে সৃষ্ট দোষ – ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়,
আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয় । ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম,
স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয় । অর্থাৎ মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত
হয়।

*শ্লোক ৬৪-৬৫ — (সঙ্গতি) অর্জুন যদি বলেন, “ইন্দ্রিয়গণ স্বভাবতই বিষয়ের অভিমুখী, তাদেরকে নিরোধ করতে পারা যায় না
বলে উক্ত দোষ পরিহার করা দুষ্কর, অতএব স্থিতপ্রজ্ঞ কি ভাবে হওয়া যায়?” এই প্রশ্ন আশঙ্কা করে শ্রীভগবান তার উত্তর দুটি
শ্লোকদ্বারা বলছেন —
স্থিতপ্রজ্ঞ কি ভাবে হওয়া যায় ~ রাগ ও দ্বেষ ত্যাগ – সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি এবং অপ্রিয়
বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে, তাঁ র বশীভূত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃ পা লাভ করেন ।
চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তখন আর জড় জগতের ত্রিতাপ দুঃখ থাকে না, এভাবে প্রসন্নতা লাভ করার ফলে বুদ্ধি
শীঘ্রই স্থির হয় ।

*শ্লোক ৬৬ — ইন্দ্রিয়নিগ্রহ স্থিতপ্রজ্ঞতার সাধন; ইন্দ্রিয়নিগ্রহ না হলে স্থিতপ্রজ্ঞতা হয় না, এটি ব্যতিরেকভাবে5
প্রতিপন্ন করছেন —
পরমার্থচিন্তাশূন্য ব্যক্তির পরিণতি – যে ব্যক্তি [কৃষ্ণভাবনায়] যুক্ত নয়, তার চিত্ত সংযত নয় এবং তার পারমার্থিক বুদ্ধি
থাকতে পারে না । আর পরমার্থচিন্তাশূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই । এই রকম শান্তিহীন ব্যক্তির প্রকৃ ত সুখ
কোথায়?

*শ্লোক ৬৭ — অর্জুন যদি বলেন, “অযুক্ত ব্যক্তির শুদ্ধবুদ্ধি জন্মাতে পারে না কেন?” তার উত্তরে শ্রীভগবান বলছেন —
দৃষ্টান্ত ~ অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় – প্রতিকূল বায়ুনৌকাকে যেমন অস্থির করে, তেমনই সদা বিচরণকারী যে কোন একটি মাত্র
ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণেও মন অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞাকে হরণ করতে পারে ।

*শ্লোক ৬৮ — ইন্দ্রিয়সংযম যে স্থিতপ্রজ্ঞতার সাধন ও লক্ষণ, এটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে । এখন তার উপসংহার করছেন –
সুতরাং, হে মহাবাহো! যাঁ র ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হয়েছে, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ।

*শ্লোক ৬৯ — অর্জুন যদি বলেন, “নিদ্রিত ব্যক্তির ন্যায় দর্শনাদি-ব্যাপারশূন্য সম্যক্‌ নিগৃহীত ইন্দ্রিয় এমন কাউকে দেখছি না,
অতএব এরূপ লক্ষণ অসম্ভব ।” একথা আশঙ্কা করে শ্রীভগবান বলছেন —
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির সাথে সাধরন জীবের পার্থক্য – সমস্ত জীবের পক্ষে যা রাত্রিস্বরূপ, স্থিতপ্রজ্ঞ সেই রাত্রিতে জাগরিত
থেকে আত্ম-বুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন । আর যখন সমস্ত জীবেরা জেগে থাকে, তখন তত্ত্বদর্শী মুনির নিকট তা
রাত্রিস্বরূপ ।

*শ্লোক ৭০-৭১ — অর্জুন যদি আবার বলেন, “বিষয় সমূহে দৃষ্টি থাকে না বলে কি করে সেই যোগী ব্যক্তি বিষয়সমূহ ভোগ
করতে পারেন?” তার উত্তরে বলছেন —
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিই প্রকৃ ত শান্তি লাভ করেন – বিষয়কামী ব্যক্তি কখনও শান্তি লাভ করে না । জলরাশি যেমন সদা
পরিপূর্ণএবং স্থির সমুদ্রে প্রবেশ করেও তাকে ক্ষোভিত করতে পারে না, কামসমূহও তেমন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিতে প্রবিষ্ট হয়েও তাঁকে বিক্ষুব্ধ করতে পারে না, অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন । যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে জড় বিষয়ের
প্রতি নিস্পৃহ, নিরহঙ্কার ও মমত্ববোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃ ত শান্তি লাভ করেন ।

*শ্লোক ৭২ — পূর্বোক্ত জ্ঞাননিষ্ঠাকে প্রশংসা করতে করতে উপসংহার করছেন —
ব্রাহ্মীস্থিতির সংজ্ঞা ও ফল – তার এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাহ্মীস্থিতি বলে । হে পার্থ! যিনি এই স্থিতি লাভ করেন, তিনি
মোহপ্রাপ্ত হন না । জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে
প্রবেশ করেন ।

Scroll to Top