‘মন না মত্ত হস্তী। হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটে। তাই সদসৎ বিচার করে সব দেখতে
হয়, আর খুব খাটতে হয় ভগবানের জন্যে।’ মা বলছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া
ঠাকুর, মা, স্বামীজী একটিও কথা বলতেন না। নিজেদের জীবন থেকে তুলে
আনতেন, আদেশ, উপদেশ।
মন কেমন, চঞ্চলম, অস্থিবম। গীতায় শ্রীভগবান এই কথাই বলছেন,
‘মনচঞ্চলমস্থিরম্’। ঠাকুর বলছেন, মাছির মতো। এই বিষ্ঠায় ত এই সন্দেশে।
বহুরূপীর মতো ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়।
মনের এই দুর্বলতা প্রসঙ্গে মা কি সহজ-সুন্দর কথাটি বললেন!
‘ঠাকুর-মা-স্বামীজী-ঘরানার’ মতোই কথা। অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াই নয়, সম্ভবকে
সম্ভব করার ফাঁক খোঁজা। মা বলছেন, মনের দুর্বলতা! ‘বাবা, ওটা প্রকৃতির নিয়ম;
যেমন অমাবস্যা, পূর্ণিমা আছে না? তেমনি মনও কখনো ভাল হয় কখনো মন্দ হয়।’
একটি ইংরেজি উদ্ধৃতি মনে আসছে-ভারি সুন্দর-A weak mind is like
a microscope, which magnifies trifling things, but cannot receive
great ones. দুর্বলমন অনুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো, যত তুচ্ছ জিনিসকে বড় করে দেখে।
প্রকৃত বড় জিনিস দেখার ক্ষমতা দুর্বল মনে থাকে না।
গীতায় শ্রীভগবান বলছেন,
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।।
চিত্ত যার চঞ্চল, ইন্দ্রিয় যার অবশীভূত, তার আত্মবিষয়িনী বুদ্ধি বা চিন্তা হয় না।
যার পরমার্থচিন্তা নেই, তার মানসিক শান্তি নেই। সে মহা অসুখী। মানুষের মন।
মানুষের বিবিধ যন্ত্রপাতির অবস্থান জানা আছে। হার্ট কোথায়, লাংস কোথায়। মন
কোথায়? কেউ জানে না। মনের কোনো অবয়ব নেই; অথচ আছে, ভীষণভাবে আছে।
মন আর কাল, কাল আর মায়া সবই এক। ঠাকুর বললেন, ব্রহ্মেরই মায়া, মায়ার
ব্রহ্ম নয়। আবার বললেন, ভগবানের সব আছে কি-না কে জানে; কিন্তু সবেতেই
ভগবান আছেন। মহাকালের তুচ্ছ ভগ্নাংশই কাল। সেই কালই সৃষ্টির উদ্ভব, সৃষ্টির
লয়। উদয়-অস্ত। সময়ের ফিতে বের করে মাস, বছর মাপা। এলে আর গেলে।
সময়কে বলা হচ্ছে মনের এক বিশেষ অবস্থা। ‘কালশক্তি’।দৃশ্যবস্তুর মতোই ভাঁওতা
সে কি রকম? সিনেমাহলে বসে কেউ একটা ভীষণ ভাল বই দেখছেন, দুঘণ্টা কোথা
দিয়ে চলে গেল! মনে হল এই ত শুরু হল, এরই মধ্যে শেষ! মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের
শিয়রে যে-রাত জেগে আছে, সে-রাত যেন আর শেষই হতে চায় না। সুখে সময়
ছোট হয়ে যায, দুঃখে বড় হয়। দুঃখের রাত শেষ হতে চায় না।
আরও আছে। ঠাকুব বলছেন, পলকে সৃষ্টি, পলকে লয়। স্বর্গে দুম্ করে একটা
শব্দ হল। নন্দী ভাঙ্গ ঘুঁটছিলেন, চমকে উঠে মহাদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হল!’
মহাদেব বললেন, ‘পৃথিবীতে একজন জন্মালেন, তাঁর নাম রাবণ।’ কথা শেষ হতে
না হতেই আবার শব্দ-দুম্। নন্দী প্রশ্ন করলেন, ‘প্রভু! এবার কে জন্মালে?’
‘কেউ জন্মায়নি, ওই রাবণ বধ হল’।
পৃথিবীর একটা যুগ মহাকালের পলকে গুটিয়ে এল। কালের সুতোয় জীবন ঘুড়ি,
মহাকালের হাতে লাটাই। মাপ সব মনে। কল্পকে মনে হতে পাবে মুহূর্ত। মুহূর্তকে
মনে হতে পারে কল্প। স্বামীজী আর একটি মাত্রা যোগ করলেন, ‘মন সর্বব্যাপী।
যে-কোন স্থান থেকে এর স্পন্দন শোনা যেতে পারে এবং অনুভব করা যেতে পারে।’
এক মহাসাধক বলেছিলেন, ‘মনকে জয় করেছি, বিশ্ব এখন আমার পদতলে।’
[আদি গ্রন্থ: জাপুজি]উত্তর ধ্যানসূত্র বলছেন-নিজেকে জয় কর। বাইরে লড়াই,
জয়-পরাজয়ের কোনো মূল্য নেই। নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই কর। নিজেই নিজেকে
জয় করে অচলের সাম্রাজ্যের অটলের সিংহাসনে বসো না কেন? অনন্তকালে জীবের
অনন্ত লড়াই জীবনের সঙ্গে।
মা যে সেই কথাই বললেন অতি সহজ করে আমাদের জন্যে-
‘ভগবান লাভ হলে কি আর হয়? দুটো কী শিং বেরোয়? না। মন শুদ্ধ হয়। শুদ্ধ
মনে জ্ঞান-চৈতন্য লাভ হয়।’