‘রং ইতি জলধারয়া বহ্নিপ্রাকারং বিচিন্ত্য’-এই মন্ত্রে পূজারী চতুর্দিকে জল ছড়ালেন।
আসনে যে পূজারী বসে আছেন তিনি সামান্য নন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ। অঙ্গন্যাস করন্যাস
পূজার সমস্ত অঙ্গ তিনি একে একে সম্পন্ন করছেন। সাধারণের থেকে তফাত
এই-শ্রীরামকৃষ্ণ দেখছেন তাঁর সর্ব অঙ্গে সমস্ত মন্ত্রবর্ণ যথাযথা স্থানে উজ্জ্বল
অগ্নিরেখায় ফুটে উঠছে। দেখছেন সর্পাকৃতি কুণ্ডলিনী শক্তি সুষুম্না পথে ধীরে ধীরে
সহস্রারের দিকে উঠছে। আর এই শক্তি যে যে অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, শরীরের সেইসব
অংশ হয়ে যাচ্ছে নিঃস্পন্দ, অসাড়, মৃতবৎ। একে একে মূলাধার গেল, গেল স্বাধিষ্ঠান,
গেল মণিপুর। শুধু ফুটে উঠল সহস্রারের শতদল।রং এই মন্ত্রে গর্ভমন্দির থরথর করে
কেঁপে উঠল। পূজারীকে বেষ্টন করে জ্বলে উঠল শত জ্বিহ্বা বিস্তার করে অগ্নিপ্রাকার।
সামনে বেদিতে মা ভবতারিণী যেন খিলখিল করে হাসছেন।
ঠাকুর একান্ত অনুরাগী ভাগিনেয় হৃদয় আড়াল থেকে দেখছেন মাতুলের পূজা।
মন্দিরের আরো অনেকে আছেন। তাঁদের গা ছমছম করছে,ভয় করছে। আসনে উপবিষ্ট
শ্রীরামকৃষ্ণকে তখন আর মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর সমস্ত শরীর থেকে অদ্ভুত
একটা তেজ অদ্ভুত একটা তাপ, অদ্ভুত একটা জ্যোতিঃ বেরচ্ছে।
হৃদয় পরে ভক্তদের বলেছিলেন-সাক্ষাৎ ব্রহ্মাণ্যদেব যেন নরশরীর পরিগ্রহ করে
পূজা করতে বসেছেন। ঠাকুরের পূজা একটা দেখবার বিষয় ছিল। যে দেখত সে-ই
বাক্যহারা হয়ে যেত। পূজার আগে তিনি মা-কে গান শোনাতেন। সেখানেকালোয়াতি
থাকত না। থাকত না কোনোঢং ঢাং। গানের বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ ঢুকে যেতেন। গানের
ভেতরে বসে তিনি গান গাইতেন। যেমন অপূর্ব কন্ঠস্বর সেই রকম তাল লয়ের
বিশুদ্ধতা। তিনি মাকে গান শোনাতেন, মানুষকে নয়। তাই তাঁর ‘সুরগুলি চরণ পেত’
আর সেই চরণ ছুঁয়ে শ্রোতাদের কানে ফিরে আসত। হয়ে যেত সাপুড়িয়ার সাপ খেলানো
বাঁশি।
রানী রাসমণি যখন দক্ষিণেশ্বরে আসতেন তখন ঠাকুরকে অনুরোধ করতেন-‘বাবা
গান শোনাও’। রানীর যে গানটি সবচেয়ে প্রিয় ছিল সেই গানটি হলকোন হিসাবে হরহৃদে দাঁড়িয়েছ মা পদ দিয়ে।
সাধ করে জিব্ বাড়ায়েছ, যেন কত ন্যাকা মেয়ে।
জেনেছি জেনেছি তারা,
তারা কি তোর এমনি ধারা।
তোর মা কি তোর বাপের বুকে দাঁড়িয়েছিল অমনি করে।।
গায়কও অঝোরে কাঁদছেন শ্রোতাও অঝোরে কাঁদছেন।
ঠাকুরের পূজার একটি বিশেষ অঙ্গ ছিল সঙ্গীত। সেইসব সঙ্গীতের রচয়িতারা হিলেন
রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, রাজা রামকৃষ্ণ। এঁরা সকলেই ছিলেন মহা মহা কালীসাধক।
তাঁদের গীত ছিল মায়ের সঙ্গে ভাবের কথা। হৃদয় বলছেন শ্রীরামকৃষ্ণ যখন পূজা
করতেন তখন এমন তন্ময় হয়ে যেতেন যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে কথা বলাবলি করলেও
তিনি শুনতে পেতেন না। তিনি তখন অন্য জগতে।
ঠাকুরের দাদা রামকুমার কামারপুকুর থেকে ভাইকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। তাঁরা
দুজনে প্রথম এলেন নাথের বাগানে। এই নাথের বাগানের অবস্থান, কলকাতার
শোভাবাজারে। শ্রীরামকৃষ্ণের বয়স তখন সতের। দুভাই কলকাতায় এসেছেন ভাগ্যের
সন্ধানে। ইংরেজের কলকাতায় বড়লোকদের মহাদাপট। রাজা, মহারাজারা চৌঘুড়ী
হাঁকিয়ে ঘুরছেন।ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ খুলেসংস্কৃত শিক্ষা
ও চর্চায় উদ্যোগী হয়েছেন। এদিকে, ওদিকে টোল খোলা হচ্ছে। সংস্কৃত পণ্ডিতদের
বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। কামারপুকুরের সংসার বড় হচ্ছে। দাদা রামকুমার উপার্জনের
আশায় গ্রাম ছেড়ে রাজধানীতে। নাথের বাগানে কিছুদিন থাকার পর রামকুমার এলেন
ঝামাপুকুরে।ঠিকানা, ৬১ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট। বাড়ির মালিক, গোবিন্দ চাটুজ্যে। একতলা
বাড়ি, পুরনো বাড়ি। এখানে রাস্তার ওপর রাধাকৃষ্ণের মন্দির। সেই মন্দির আজও
আছে। তখন এই মন্দিরের বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণ গোবিন্দবাবুর বাড়ি থেকে পূজা পেতেন।
অদূরেই ১ নং ঝামাপুকুর লেন। সেই প্রাসাদটি হল রাজা দিগম্বর মিত্রের রাজবাড়ি।
শ্রীরামকৃষ্ণকে আনার প্রায় চার বছর আগেই রামকুমার কলকাতায় তাঁর ভূমি প্রস্তুত
করেছিলেন। রাজবাড়ির কাছেই একটি টোল খুলেছিলেন। তিনি জ্যোতিব আর
স্মৃতিশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। ছাত্রদের পড়াতেন। রাজবাড়ি ও অন্য কয়েকটিবর্ধিষ্ণু
পরিবারে নিত্য দেব-সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এত কাজ একা সামলাতে পারছিলেন
না রামকুমার। ভ্রাতা শ্রীরামকৃষ্ণ, তখন তিনি গদাধর, দাদাকে সাহায্য করার জন্যে
এলেন। শক্তি পূজা না জানলেও অন্য পূজায় পারদর্শী। পূজা তিনি ভালবাসেন।
কামারপুকুরের গৃহদেবতা রঘুবীরের নিত্য পূজা তিনিই করতেন। নারায়ণ, রাধাকৃষ্ণ,
নরম, কোমল, প্রেমিক দেব-দেবীর পূজা গদাধর ভালই পারেন। বিধি আর ভাবের
মিলনে সে-পূজা অতি অসাধারণ। রামকুমার তাঁর দায়িত্ব দু-ভাগ করে নিলেন।
নিজেকে রাখলেন টোলে অধ্যাপনার কাজে, আর যজমানির দায়িত্ব দিলেন ভ্রাতা
গদাধরকে। বিদায়-আদায়ের সুবিধার জন্যে রামকুমার ছাতুবাবুর দলভুক্ত হয়েছিলেন।
সেই সময় কলকাতার সমাজ জীবনে খুব দলাদলি ছিল। বড়লোকদের অঢেল
পয়সা, অলস জীবন। করার কিছু নেই, ত দলাদলি কর। সিমুলিয়া ও তার সন্নিহিত
এলাকার লোকেরা ছিলেন ছাতুবাবুর দলভুক্ত, আর বাগবাজার এলাকার লোকেরা
ছিলেন রাজা রাধাকান্ত দেবের দলে। একদিন সভা করে এই দুই এলাকার কুলীন ও
মাননীয় মানুষরা রাজা রাধাকান্ত ও ছাতুবাবুকে মাল্যচন্দনে ভূষিত করে গোষ্ঠীপতির
স্বীকৃতি দিলেন। উত্তর কলকাতার দুই মাথা-রাজা রাধাকান্ত দেব আর ছাতুবাবু।
রামদুলাল সরকার ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। ভিখারি থেকে কোটিপতি। দাতা,
দরিদ্রবান্ধব। তাঁর দুই ছেলে। আশুতোষ ও প্রমথনাথ। ডাকনাম, সাতুবাবু ও লাটুবাবু।
সাতুবাবু থেকে ছাতুবাবু। ঝামাপুকুর ছাতুবাবুর এলাকা। রামকুমার তাঁর দলভুক্ত
হয়েছিলেন।
দৈব যদি মানতে হয়, তাহলে বলতে হয় রামকুমার এবং রানী রাসমণির যোগাযোগ।
রাসমণি নৌবহর নিয়ে যাবেন কাশী। প্রত্যাদেশ হল, ‘রানী! কাশী নয় কালী’। সেই
কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা ও অন্নভোগ-সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করে ঝামাপুকুর টোলের
সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণ রামকুমার হলেন পূজারী।
এই যোগযোগ না হলে কিহত! ঝামাপুকুর টোল তিন-চার বছরেও তেমন প্রতিষ্ঠা
পায়নি। যে আশায় রামকুমার কলকাতায় এসেছিলেন সে-আশা পূর্ণ হল না। পরিশ্রমই
সার হল আয়ের মুখ দেখলেন না। তারপর হঠাৎ এই পরিবর্তন। জানবাজারে
রামকুমারের প্রতিষ্ঠা। রামকুমারের সমাধান না এলে মাকে প্যাকিং বাক্স থেকে বের
করা যেত কি? বহুমূল্য মন্দির, ষাট বিঘা জমির উপর উদ্যান, পোস্তা, রুপোর সিংহাসন,
দ্বাদশ শিবমন্দির,চাঁদনি, পঞ্চবটী,সবই হয়ে যেতব্যর্থ প্রয়াস। ব্রাহ্মণদেরবিচিত্র বিধান।
মা কালীকে অন্নভোগ দেওয়ার অধিকার মাহিষ্যের নেই। উচ্চবর্ণের মানুষ তোমার
মন্দিরে প্রসাদ গ্রহণ করবে না।মা কালীরও জাত আছে। মাহিষ্যরা কিন্তু ক্ষত্রিয়। রাজা
হরিশচন্দ্রের উত্তর পুরুষ।
এই যোগাযোগ না হলে কালী কোনো কালেই আমাদের মা হতেন না। শ্মশান কালী,
ডাকাত কালীই হয়ে থাকতেন। চারপাশে মনুষ্যরূপী ভূত-প্রেতের নৃত্য।শ্যামা কালী,
দক্ষিণা কালী হয়ে আমাদের ঘরে ঘরে করুণা বিতরণ করতেন না। রহস্যময়ীর রহস্য
উন্মোচন করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত,রাজা রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরের
শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ ছাড়া সকলেই ছিলেন মহাসাধক। মা কালীকে মাতৃজ্ঞানে
উপাসনা করেছেন।সিদ্ধিলাভ করেছেন, বিভোর হয়েছেন, পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলার কারণ? তাঁর নিজের সংজ্ঞা! এমনটি কারো ক্ষমতা ছিল
কি? অবতার হল বাহাদুরী কাঠ। নিজে ভাসে,তার ওপর চড়ে দশজন ভাসতে ভাসতে
সাগর পেরোতে পারে। শক্তির সঙ্গে ভক্তিকে এমনভাবে কেউ মেলাতে পাবেননি।
ব্রহ্মের সঙ্গে শক্তির মিলন। নিরাকার-সাকার দ্বন্দ্বের চির অবসান। সেই কারণেই
কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ ব্রহ্মগণ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বার বার শুনতে চাইতেন মা কালীর
ব্যাখ্যা। টয়েনবি, ঐতিহাসিক। তিনি বললেন, ইতিপূর্বে কেউ কখনো কোথাও
শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা ও গভীরতা অতিক্রম করতে পারেননি।
শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনা থেকে প্রকাশিত হল, নবযুগ ধর্ম।
কেমন ছিল কলকাতার ঘরোয়া কালীপূজা, সে-কালের কলকাতায? কালীশঙ্কব
ঘোষের বাড়িতে যাওয়া যাক। ঠিকানা সুবা বাজার বা শোভাবাজার। কালী পূজা হয়,
পূজার রাতে। ঘোর তান্ত্রিক। ভীষণ তান্ত্রিক। এঁদের আহ্নিক মানেই আকণ্ঠ সুরাপান।
শ্যামাপুজার রাতে গুরু, পুরোহিত, কর্তা, অন্দরের গৃহিনী, সমস্ত মহিলা এমন কি
দাসদাসীদের ও সুবাপান করতে হত। কড়া নিয়ম। সকাল থেকেই মদ্যপান। কালী পূজা
যে।
ঢুলিরা সকাল থেকেই ঢাক পিটে পাড়া অস্থির করে তুলছে। দুপুরবেলা অন্দরমহলে
গিযে গৃহিণীকে বলছে, ‘মা, হাতে হাতে একটু তেল দিন আমরা নাইতে যাব, আর
জলপান।’ গৃহিনী মদে চুব। রেগে গিয়ে বলছেন, ‘কি!তোরা আমার বাড়িতে তেল,
জলপান চাচ্ছিস? মেঠাই খা, মোমবাতি মাখ।’
পূজার দালানে সাত হাত লম্বা প্রতিমা। পর্বতপ্রমাণ মিষ্টান্নের স্তূপ। একের পর
বলি হয়েই চলেছে। কান ফাটানো ঢাকের আওয়াজ। পশুদের আর্ত চিৎকার। অসুরেব
মতো কয়েকটা লোক খাঁড়া হাতে নাচছে। পশুর রক্তে বাড়ির প্রাঙ্গণ ডুবে যেত। থই
থই করত চারপাশ। নর্দমায় রক্তের স্রোত বইত। একবার কালী পূজার রাতে কর্তার
খেয়াল হল, আমি এত পশুকে বলিদান দিয়ে স্বর্গে পাঠাচ্ছি, আমার কত পূণ্য হচ্ছে,
আচ্ছা স্বয়ং গুরুদেবকে যদি বলি দিয়ে স্বর্গে পাঠাই, তা হলে ত আরো পুণ্য হবে।
গুরুদেব মদে চুর হয়ে আছেন। তাঁকে বলামাত্রই নেচে উঠলেন, ‘চলো, চলো,আর
দেরি নয়, রাত থাকতে থাকতেই স্বর্গে চলে যাই। মা, আসছি গো!’
গুরুদেবকে হাড়িকাঠের কাছে আনা হল। কর্তা বললেন, ‘গুরুদেব গলা লাগান।
জয় মা, বলে হয়ে যাক।’যাঁরা বলিদান করছিলেন, তাঁরা সবাই কর্মকার। কর্তার আদেশে
সকলকেই মদ্যপান কবতে হয়েছে, তবে মাত্রা কম। এত বলি দিতে হবে মাতাল হলেই
সর্বনাশ। তাঁরা ভাব দেখাচ্ছেন, কতই না খেয়েছি? তা না হলে কর্তা আবার জোর
করে গিলিয়ে দেবেন। বলিদানের দলপতির মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি বললেন,
‘কর্তামশাই! এখানে যত খাঁড়া আছে,সব খাঁড়া চিরকাল পশুবলি দিয়ে আসছে, এতে
কি গুরুদেবকে বলি দেওয়া যায়? গুরুদেবের জন্যে চাই নতুন খাঁড়া। আপনি ভাববেন
না। একটু অপেক্ষা করুন। বাড়িতে নতুন খাঁড়া তৈরি আছে। নিয়ে আসছি। এই যাব
আর আসব।’
দলপতি দলেব সকলকে সতর্ক থাকতে বলে চলে গেলেন থানায়। পুলিস এসে
গুরুদেবেব স্বর্গযাত্রা বন্ধ করলে। তন্ত্রে বলিদানের নির্দেশ আছে। কালিকাপুরাণ বলছেন,
‘চণ্ডিকাং বলিদানেন তোষয়েৎ সাধকঃ সদা।’ সাধক মোদক দ্বারা গণপতিকে, ঘৃতদ্বারা
হরিকে, নিয়মিত গীত বাদ্যদ্বারা শঙ্করকে এবং বলিদান দ্বারা চণ্ডিকাকে সর্বদা সন্তুষ্ট
করিবে। শাস্ত্রে আট রকমের ‘বলি’-র কথা বলা হয়েছে। পক্ষী, কচ্ছপ, কুম্ভীর, বরাহ,
ছাগল, মহিষ, গোধা, শশক, বায়স, চমর, কৃষ্ণসার, শশ, সিংহ, মৎস্য, স্বগাত্র-রুধির,
ঘোড়া, হস্তী। এর পরে আছে মহাবলি। মহাবলি হল শবভ। বিশেষ এক ধরনের বৃহৎ
মৃগ, উটও হতে পারে। আর অতি বলি হল, মানুষ।
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট অধর সেন শ্রীরামকৃষ্ণকে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মহাশয়,
আমাব একটি জিজ্ঞাস্য আছে; বলিদান করা কি ভাল? এতে তো জীবহিংসা করা হয়।’
ঠাকুর উত্তর দিলেন, ‘বিশেষ বিশেষ অবস্থায় শাস্ত্রে আছে, বলি দেওয়া যেতে পারে।
‘বিধিবাদীয়’ বলিতে দোষ নাই। যেমন অষ্টমীতে একটি পাঁঠা।’ এরপরে নিজের
অবস্থাব কথা বলছেন, ‘আমার এখন এমন অবস্থা, দাঁড়িয়ে বলি দেখতে পারি না।
মমব প্রসাদী মাংস এ-অবস্থায় খেতে পারি না। তাই আঙুলে করে একটু ছুঁয়ে মাথায়
ফোটা কাটি; পাছে মা রাগ করেন।’
সংশষের উত্তব পুরাণও দিচ্ছেন, ‘ব্রহ্মা, স্বয়ং যজ্ঞের নিমিত্ত সকল প্রকার বলির
সৃষ্টি করিয়াছেন, এই নিমিত্ত আমি তোমাকে বধ করি, এই জন্যে যজ্ঞে পশুবধ হিংসার
মধ্যে গণ্য নয়। শ্রীরামকৃষ্ণ একেই বলছেন, ‘বিধিবাদীয়’। একটি ভয়ের কথা বলছেন,
প্রসাদী মাংস খেতে পারেন না, তাই আঙুলে করে ছুঁয়ে মাথায় ফোঁটা কাটেন, পাছে
মা বাগ করেন। পাথরের মা রাগ করতে পারেন?
অতীত ঘুরে আসি। মহাসমারোহে প্রতিষ্ঠিত হল মায়ের মন্দির। রামকুমার হলেন
প্রথম পূজারী। কয়েক মাসের মধ্যেই মথুরবাবু ধরে ফেললেন তরুণ গদাধরকে। সদাই
ভাবে বিভোর।কারো ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসতে চায় না। শুধু দেখে, বাগান, ফুল, গঙ্গা
মন্দিব। মথুরবাবু বললেন, তুমি হবে মায়ের বেশকার। তুমি শিল্পী, কবি ভাবুক।
এইটুকুই চেনা গেছে, ধরা গেছে। রামকুমারের শরীর অপটু হওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন
মায়েব মন্দিরের পূজারী। আর রামকুমার নিলেন রাধাগোবিন্দের অপেক্ষাকৃত সহজ
পূজার ভার। গদাধর দাদাব কাছে কালীপূজা শিখেছিলেন। ‘রামকুমার তাহাকেচণ্ডীপাঠ,
শ্রীশ্রী কালিকামাতা এবং অন্যান্য দেবদেবীর পূজা প্রভৃতি শিখাইতে লাগিলেন। ঠাকুর
ঐরূপে দশকর্মান্বিত ব্রাহ্মণগণের যাহা শিক্ষা করা কর্তব্য তাহা অচিরে শিখিয়া লইলেন।’
শাক্তী দীক্ষা না নিলে দেবীপূজার অধিকারী হওয়া যায় না। প্রবীণ শক্তিসাধক কেনারাম
ভট্টাচার্য শ্রীরামকৃষ্ণকে শক্তিমন্ত্রে যথাবিহিত দীক্ষা দিলেন। সাধক ভট্টাচার্য মহাশয়
কলকাতার বৈঠকখানা বাজারে থাকতেন। মথুরবাবু ও রামকুমারের পরিচিত।
কালীবাড়িতে তাঁর যাওয়া-আসা ছিল। সম্মানিত ব্যক্তি। কানে বীজমন্ত্র পড়া মাত্রই
গদাধর সমাহিত। গুরু সেই দিনই এই বুঝে গেলেন, তাঁর শিষ্য সাধারণ মানুষ নয়।
গদাধর মায়ের পুজারী হলেন। বিধিসম্মত পূজার আড়াল থেকে প্রকাশিত হতে
থাকল অলৌকিক পূজা। চাল-কলা-বাঁধা পুরোহিতবা সে-পূজার মর্ম বুঝবেন না।
সে- পূজা বিধি মানে না। ভাবের পথে চলে। পাষাণ প্রতিমা জীবন্ত হয়। বেদি থেকে
নেমে এসে সাধকের সঙ্গে খেলা করেন। কথা বলেন। আব্দার করেন। গদাধর মায়ের
নাকের কাছে তুলো ধরে দেখছেন, শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে। মথুরবাবু,রানী রাসমণি বুঝে
গেলেন, মায়ের কৃপায় মন্দিরে এক মহাসাধকের আবির্ভাব ঘটেছে। তন্ত্র-মন্ত্রেব
অক্ষরমালা ছেড়ে মা বেরিয়ে আসবেন। কালী, ভয়ঙ্করী, রহস্যময়ী-এই ভয়, এই
ভীতি ভেঙে যাবে।অনন্তের বিস্তৃত অঙ্গনে জীবকে মায়াপাশে বেঁধে জীবন-মৃত্যুব খেলা
খেলছেন অনন্ত-রূপিণী কালী। গদাধর গান গাইছেন-‘কে জানে মা কালী
কেমন/ষড়দর্শনে না পায় দরশন/’ গদাধর গাইছেন ‘মা ত্বং হি তাবা’ কুড়ি থেকে
পঞ্চাশ-তিরিশ বছরের একটি জীবন বেরিয়ে এল, যার মধ্যে গোটানো রইল ‘তিন
কাল’। সর্বকালের ‘শব-সাধনা’ নয় ‘সব-সাধনা’র একটি ‘কমপ্যাক্ট-ডিস্ক’ তৈরি হল
পঞ্চবটীতে এই সাধকের সাধনায়।
মথুরবাবু বললেন-বাবা, আমি যে তোমাকে চিনেছি-তুমিই শিব, তুমিই কালী,
আমি তোমার সেবক। বৈধী পূজা তোমাকে আর করতে হবে না। কালীপুজো নয়,
কালী-সাধো। তোমার সাধনায় লেগে থাকুক আমাদের ছিন্ন চিহ্ন। তুমি স্টিমার আমরা
‘গাধা বোট’। মায়ের মন্দিরে পূজারী হলেন শ্রীরামকৃষ্ণের খুড়তুতো ভাই রামতারক।
তাঁর আর এক নাম হলধারী। সুপণ্ডিত, নিষ্ঠাবান সাধক। বিষ্ণুর উপাসক হলেও
শক্তিপূজার বিরোধী ছিলেন না।তবে পশুবলির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। একটা নিয়ম
ছিল, এই এই দিন মন্দিরে বলি হবে। সেই সব দিনে অতি ক্ষুণ্ণ মনে তিনি মায়ের
পূজা করতেন। এইভাবে একটা মাস গেল। তারপর হলধারী একদিন সন্ধ্যা করতে
বসেছেন। হঠাৎ দেখছেন, মা ভয়ঙ্করী মূর্তি ধারণ করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে
বলছেন-আমার পূজা তোকে করতে হবে না, করলে সেবাপরাধে তোর ছেলের মৃত্যু
হবে। হলধারী ভাবলেন, এ তাঁর মাথায় খেয়াল। এই দর্শন, এই সাবধানবাণীকে তিনি
পাত্তা দিলেন না। পুজো যেমন করছিলেন, সেই রকমই করতে লাগলেন। হঠাৎ দেশ
থেকে এল পুত্রের মৃত্যুসংবাদ। তিনি মায়ের পুজো ছেড়ে শ্রীশ্রী রাধাকান্তের পুজোয়
চলে এলেন।বলতে লাগলেন, কালী তামসী, তমোগুণময়ী। শ্রীরামকৃষ্ণকেও সে-কথা
বললেন। ঠাকুর খুব দুঃখ পেলেন। ছুটলেন কালীঘরে মায়ের কাছে। মা কালী তাঁর
সঙ্গে কথা বলতেন, খেলা করতেন, মান অভিমান করতেন, আদর আব্দার করতেন,
শয়ন দেওযার সময় বলতেন, ‘তুই আমার পাশে শো’।
ঠাকুব মাকে বলছেন, দু-চোখ জলে ভরা, ‘মা হলধারী শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, সে তোকে
তমোগুণাময়ী বলে, তুই কি সত্যিই তাই?’ মা হাসলেন, বুঝিয়ে দিলেন তাঁর স্বরূপ।
শ্রীরামকৃষ্ণ ছুটছেন, কোথায সেই হলধারী! ওই যে বসে আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাঁধে
চেপে বসলেন, ‘তুই মাকে তামসী বলিস? মা কি তামসী? মা যে সব-ত্রিগুণময়ী আবার
শুদ্ধসত্ত্বগুণময়ী। হলধারী বিষ্ণুঘরে পূজার আসনে বসেছিলেন,তিনি দেখছেন গদাধর
নয, স্বয়ং মা কালী কাঁধে চেপেছেন। তিনি ভাবে বিভোর হয়ে গদাধরের পাদপদ্মে
পুষ্পাঞ্জলি দিলেন।
১৮৮৪ সাল, ১৮ অক্টোবর, শনিবার।আজ কালীপূজা। রাত আটটা। মাস্টারমশাই
মন্দির অঙ্গনে প্রবেশ করছেন। উদ্যানমধ্যে মাঝে মাঝে দীপ-দেবমন্দির আলোকে
সুশোভিত। মাঝে মাঝে রোশনচৌকি বাজিতেছে। কর্মচারীরা দ্রুতপদে মন্দিরের এই
স্থান হইতে ওই স্থানে যাতায়াত করিতেছেন। গ্রাম হইতে আবালবৃদ্ধবনিতাবহু সংখ্যক
লোক ঠাকুর দর্শন করিতে সর্বদা আসিতেছে।
বিকেলে নাটমন্দিরের চণ্ডীর গান হল-রাজনারায়ণের চণ্ডীর গান। শ্রীরামকৃষ্ণ
আনন্দে বিভোর। ছোট খাটটিতে বেশ গুছিযে বসে আছেন। নহবতে মা রয়েছেন।
আলোর মালায় ঘেরা। মানুষের স্রোত বইছে। ঠাকুরের সামনে মেঝেতে বসে আছেন
ভক্তমণ্ডলী। সাবাটা বিকেল চণ্ডীব গান শুনছেন, সেই গানের রেশ মাথায় ঘুরছে।আস্তে
আস্তে গাইছেন,
কে জানে কালী কেমন, ষডদর্শনে না পায় দরশন
মূলাধাবে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
একটু একটুকরে আরো গান, আরো আরো গান। দেবালয়ে ব্যস্ত পূজার আয়োজন।
মধ্য রাত এগিয়ে আসছে, এদিকে ঠাকুরের ভাব জমছে। প্রেমানন্দে নাচছেন আর
গাইছেন কমলাকান্তের গান, মজলো আমার মন ভ্রমরা শ্যামাপদ নীল কমলে।
রাত এগারোটা। মহানিশা। মিশকালো আকাশ। কালোর দাপটে তারারাও ক্ষীণ-প্রভ।
জোয়ার এসেছে গঙ্গা তত্তরিয়ে ছুটছে উত্তরমুখো।নিঃশব্দ আলোয় উদ্যান, গঙ্গার ধার,
মন্দির প্রাঙ্গণ ঝাঁ ঝাঁ করছে। এত আলো, এত মানুষ, তবু কেমন যেন সব থমথমে।
তীরের আলো তরতরে গঙ্গায় পড়ে চপলা হয়েছে।
আর কয়েক মিনিট পরেই বারোটা বাজবে। ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র রামলাল পূজারীর
সাজে ঘরে এলেন। আজকের পূজারী তিনি। স্মৃতি ভিড় করে আসছে। মথুর নেই।
মথুবের সময় আরো বোলবোলা ছিল। আরো আলো, যাত্রা, গান। বড় বড় লুচি, কচুরি,
দই,মিষ্টি, পায়েস।
সেবার মনে আছে। মথুর বনহুগলীর এক ব্রাহ্মণকে তন্ত্রসাধক হওয়ার জন্যে
বলেছিলেন। তিনি এলেন রাত এগারোটায়। মথুর রেগে গিয়ে বললে, কটার সময়
সময় আসার কথা ছিল! ব্রাহ্মণ বললেন, আমি তিনটে কালীপূজো সেরে এলুম তো,
তাই একটু দেবি হয়ে গেল।
মথুর আমার দিকে তাকিয়ে বললে, বাবা! শুনছ, এ মাকে বলে কি-না তিনতে,
টে, মা আমার টে?
তাকে পূজো করতে দিলে না। পাওনা দিয়ে বিদায় করে দিলে। সেবার তন্ত্রসাধক
হল হৃদয়।
বামলাল ভূমিষ্ঠ হযে ঠাকুরকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন-তবে আমি আসি।
ঠাকুর বললেন, ওঁ কালী, ওঁ কালী। সাবধানে পূজো কোরো, সাবধানে, খুব
সাবধানে। দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে ঠাকুরের এইবার বিদায় নেবার পালা। শেষ পূজা।
রামলাল পূজারী, ঠাকুর দর্শক। ওই আসন, ঘণ্টা, কোষা-কুষি পঞ্চপ্রদীপ, চামর, কত
নেড়েছি, ঘুরিয়েছি! এইবার বলি। সুস্নাতে, মাল্যভূষিত ছাগশিশু হাড়কাঠের সামনে
মৃদু মৃদু ডাক ছাড়ছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ফিরে চলেছেন নিজের ঘরে। বলির দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না।
১৮৮৫, ৬ নভেম্বর, শুক্রবার। স্থান শ্যামপুকুর বাটী। সব আয়োজন সমাপ্ত। ভক্তগণ
বিমূঢ়। পট কোথায়? ঘট কোথায়? প্রতিমা কোথা? আসনে উপবিষ্ট পূজারী
শ্রীরামকৃষ্ণ। নিজেকেই নিজে পূজা করছেন।
পূজ্য পূজক এক হল
কালীর ছেলে কালী হল
কালকে পরাস্ত করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।।