গুরু কোথায়

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, গুরু কোথায়? স্বামীজী বললেন, শিক্ষক কোথায়?
অবশেষে দেখা গেল, গুরু আর শিক্ষক একাধারে শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি জানতেন, সবাই
সাধক কিংবা সন্ন্যাসী হতে পারবে না। ত্যাগের পথ বৈরাগ্যের পথ অতি কঠিন।
ভেতরে সে-সুর না বাজলে বৃথাই ভেকধারী, ভণ্ড তপস্বী। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির
প্রাঙ্গণে বিজয়কৃষ্ণকে সাবধান করলেন-বিজয়! সাধু চিনতে ভুল করো না। সাধুর
বগলে পোঁটলা-পুঁটলি দেখলে বুঝবে, সে সন্ন্যাসী নয়। সে ঈশ্ববের খোঁজে আদৌ
ব্যস্ত নয়, সে ব্যস্ত ভাণ্ডারার খোঁজে। তার কথা হরিকথা নয়, অমুকবাবু কাল ক্যায়সা
খিলায়া!
বিষয়-বৈরাগী, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী-সে লক্ষজনে একজন,কিন্তু লক্ষ লক্ষ সংসারি
মানুষের আদর্শ মানুষ হতে ত আপত্তি নেই! তেমন মানুষ তৈরি করতে হবে। সে
মানুষ স্কুল-কলেজে হবে না। তেমন মানুষ তৈরির পদ্ধতি ভিন্ন।
দক্ষিণেশ্বরের সাধন ভূমিতে উঠে দাঁড়ালেন শিব। বুকে-বাঁধা শক্তি মুক্তি
পেলেন। রামকৃষ্ণরূপী শিব শক্তিকে মুক্ত করে দিলেন, পরাধীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন
সমাজের বুকে। কে ধারণ করবেন সেই অমিত শক্তিকে। ‘কে আছে এমন, জীবন
করিবে দান!’
•শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথমে হলেন গাণ্ডিবধারী অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের রথে। শক্তির বাণ
আপতিত হল দক্ষিণেশ্বর হতে বহু দূরে জয়রামবাটীর এক কন্যার পরে। বালিকা।
গ্রামীণ পরিবেশ। তুলোর ক্ষেতে মায়ের সঙ্গে তুলো আহরণ করে। দাওয়ায় বসে
পৈতের সুতো কাটে তকলিতে। আমোদরে স্নান করে। সমবয়সীদের সঙ্গে পুতুল
খেলে। কিন্তু বালিকাটি অবশ্যই একটু অন্যরকম। যেন একটু গম্ভীর। চপলা নয়।
বিবাদ করে না। বরং বিবাদ মিটিয়ে দেয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, ধনীও নয়,
দরিদ্র নয় মোটামুটি দিন চলে যায়। সাধু হতে হলে, ‘বিরজা হোমে’ নাম পর্যন্ত

বিসর্জন দিয়ে নতুন পরিচয়ে উঠে দাঁড়াতে হয়। আমার পিতা নেই, মাতা নেই,
জাতি, কুল, শীল নেই। আমার সাংসারিক, সামাজিক সব পরিচয় দগ্ধ হল। আমার
‘আমি’ ছাই হল। এমন কি আমার ধর্মও নেই। আমি ঈশ্বরের পুত্র। ঈশ্বর ছাড়া
এই দুনিয়ায় আমার কেউ নেই।
জয়রামবাটীর সেই অলৌকিক কন্যাটির জীবনে এমনই একটি ঘটনা ঘটে গেল
প্রথম শৈশবেই। কেউ তখন বোঝেননি তার তাৎপর্য। আত্মকথা বলতে গিয়ে সেই
তুচ্ছ ঘটনাটি তিনি যখন বললেন, তখন যেন ইঙ্গিত করলেন, বুঝে নাও, কার
নির্দেশে এই জীবন চলছে। ‘আমার মা আমার নাম রাখলেন ক্ষেমঙ্করী। আমি হবার
আগে, আমার যে মাসীমা, তাঁর একটি মেয়ে হয়। সেই মেয়ে মারা যাবার পর
আমি হই। মাসীমা আমার মাকে বললেন, “দিদি, তোর মেয়ের নামটি বদলে সারদা
রাখ, তাহলে আমি মনে করব, আমার সারদাই তোর কাছে এসেছে আর আমি
ওকে দেখেই ভুলে থাকব।” তাই ত আমার মা আমার নাম রাখলেন সারদা।’
ওই নাম শুধু মাসীমাকে নয় জগতের সমস্ত তাপিত মানুষকে ভুলিয়ে রাখবে।
তিনি বলবেন, ‘আমি সকলের মা, পাতানো মা নয়, সত্যিকারের মা’। রচিত হবে
অপূর্ব সেই প্রার্থনা, দেবীং প্রসন্নাং প্রণতার্তিহন্ত্রীং, যেগীন্দ্রপূজ্যাং যুগধর্মপাত্রীং। তাং
সারদাং ভক্তিবিজ্ঞানদাত্রীং, দয়াস্বরূপাং, প্রণমামি নিত্যম্।। তুমি আনন্দময়ী, শরণাগতের
বিপদবিনাশিনী।
প্রথম ত্যাগ, নাম। ক্ষেমঙ্করী নয়, সারদা। কল্পনা আর কবিতা মাখা একটি নাম।
পরবর্তীকালে যা বহু মানুষের বীজমন্ত্র হবে। মোক্ষের দুয়ার খুলে যাবে। জননী
শ্যামাসুন্দরী সাশ্রুনয়নে বলবেন, ‘তোকেই যেন আবার আমি পাই মা।’ আর তাঁর
ভাই বলবেন, ‘দিদি আমাদের সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। আমাদের বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে দিদি
কী না করেছেন! ধান ভানা, পৈতা কাটা, গরুর জাবনা দেওয়া, রান্না-বান্না-বলতে
গেলে সংসারের বেশি কাজই তো দিদি করেছেন।’
কোথায় সেই অবাক অবতার শ্রীরামকৃষ্ণ! দক্ষিণেশ্বরে এক বিচিত্র পাঠশালা
খুলে বসে আছেন। মানুষের জীবনের একটি বড় অঙ্গ হল ধর্ম। বিরাট একটা প্রশ্ন।
দেহধারী এই অপরূপ প্রাণীটি জগৎ-সংসারে জ্ঞান উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেল,
সবাই বলছে, ভগবান জানেন, ভগবান আছেন, ভগবান দেখবেন, ভগবান রক্ষা
করবেন। কোথায় সেই অলৌকিক, সর্বাচ্ছেন্নকারী পরমপুরুষ। বেদ, বেদান্ত, পুরাণ,
ভাগবত। ভজন, সাধন। তিনিই নিত্য, আর সব অনিত্য। এ কী সব কথার কথা!
না সার কথা। মানুষ ভগবানকে ভয়ে ডাকে, না আপন জ্ঞানে ভক্তিতে ডাকে?
সে ডাকে তিনি কি সাড়া দেন। ঈশ্বর-লাভের অর্থ কী? ধন, দৌলত, খ্যাতি,
প্রতিপত্তি। জ্ঞানীর বিশ্লেষণে তিনি সাড়া দেন, অথবা ভক্তের সকরুণ ডাকে! কি
নামে তাঁকে ডাকা যায়, গড, আল্লা, ভগবান! কোন শাস্ত্র ধরে এগোতে হয়?

শুরু হল পূজারীর নিবিড় সাধনা। অরণ্যে, কি পর্বত গুহায়, কি মরু-প্রান্তরে
যেতে হল না। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গণ রূপান্তরিত হল তপোভূমিতে। সাধনার
ইতিহাসে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। সব উল্টে গেল। সাধারণত এই হয়, আগে
গুরুকরণ, তারপর সাধন, তারপর ইষ্টদর্শন। শ্রীরামকৃষ্ণের ক্ষেত্রে হল বিপরীত।
আগে দর্শন, তারপর একের পর এক গুরুর আগমন, শাস্ত্র ধরে বিভিন্ন সাধন।
দর্শন আগেই হয়ে গেছে! রহস্য উন্মোচিত। লক্ষ্য স্থির। সংশয়ের অবসান। পরের
সাধন শুধু পথের যাচাই। সব নদীই কি সমুদ্রে যাচ্ছে? সব রুচিরই কি শেষ আস্বাদন
সেই পরমকারণ? সব পথ ধরে এগিয়ে সেই একই প্রাপ্তি! এখন প্রত্যয় সহকারে
বলা যেতে পারে কি-‘যত মত তত পথ’-অবশ্যই।
রত্ন ভাণ্ডার পাওয়া হয়ে গেছে। সাধন-সাগর মন্থনের ফলে অমৃতের কলস উঠেছে।
এখন ভাগ করে নেওয়ার পালা। এ যে অশেষ ভাণ্ডার! নিঃশেষ হবে না কোনোদিন।
অনন্তের অন্ত পেয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি যাঁকে পেয়েছেন, তিনি নারী। তিনি মা।
এই মায়ের শরীর চাই যে! রাসমণি যাঁকে পাথরে বেঁধেছেন, তাঁকে যে এইবার জীবন্ত
নারী শরীরে বাঁধাই করতে হবে। আধার চাই। আধারভূতা। জয়রামবাটীর প্রান্তরে
একাকিনী বালিকা। নিষ্পাপ এক প্রাণ। মেয়েটি একেবারে অন্যরকম। খুব সাদাসিধে,
ভীষণ সরল। গ্রামে জগদ্ধাত্রী পুজো। সারদা মায়ের সামনে বসে ধ্যান করছেন।
হলদেপুকুরের রামহৃদয় ঘোষাল প্রতিমাদর্শনে এসেছেন।তিনি দেখছেন,দুই জগদ্ধাত্রী
মুখোমুখি। সারদাও গদ্ধাত্রী হয়ে গেছেন। মৃন্ময়ীর সামনে চিন্ময়ী। ঘোষাল মশাই
ভয় পেয়ে গেছেন। তিনি পালিয়ে গেলেন!
গরুড় পক্ষীর মতো শ্রীরামকৃষ্ণ ঠোঁটে করে তুলে আনলেন সারদাকে।
লক্ষ্মী, সরস্বতী,কালী যে-আধারে সমাবিষ্ট। যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা চ শোভনা/
আত্মবিদ্যা চ দেবি ত্বং বিমুক্তিফলদায়িনী। কিছুদিন পরেই যে মানবযজ্ঞ শুরু হবে
সেই যজ্ঞের যজ্ঞলক্ষ্মী হবেন মা সারদা। নৃসিংহরূপী ব্রহ্মের প্রকাশাত্মিকা শক্তিই
মহালক্ষ্মী-ইনি ভুরাদি ব্যাহৃতিযুক্তা প্রণব বিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা, পরমার্থবিষয়া।
ঘোষালমশাই সারদা শরীরে জগদ্ধাত্রী দর্শন করে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
দেবী দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী অভিন্ন। পার্বতীরই অপর নাম জগদ্ধাত্রী। সর্বাপত্তারিকে দুর্গে
জগদ্ধাত্রী নমোহস্তুতে। তুমি দয়ারূপা। সারদা মাতা তুমি দয়ারূপা, তোমার দৃষ্টি
করুণা ভরা,দয়াতে তোমার হৃদয় নিত্য দ্রবীভূত, তুমি জীবের দুঃখ মোচন কর,
বিশ্বেশ্বরী ত্বং পরিপাসি বিশ্বং/বিশ্বাত্মিকা ধারয়সীতি বিশ্বং।
‘হ্যাঁ, তুমি আমার শক্তি’। শ্রীরামকৃষ্ণ জনৈকা মহিলা ভক্তকে বললেন, ‘ও কি
যে সে! ও আমার শক্তি। জ্ঞানদায়িনী, মহাবুদ্ধিমতী।’ ভাগিনেয় হৃদয়কে একদিন
সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘একে (নিজেকে দেখিয়ে) তুই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা
বলিস বলে ওকে (শ্রীমাকে) আর কখনো কটু কথা বলিসনি। এর ভেতরে যে আছে,

সে ফোঁস করলে হয়তো রক্ষা পেলেও পেতে পারিস, কিন্তু ওর ভেতরে যে আছে,
সে ফোঁস করলে তোকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরও রক্ষা করতে পারবেন না।’
স্বামীজী আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলেন, একটি চিঠিতে লিখলেন, ‘দাদা,জ্যান্ত
দুর্গাপূজা দেখাবে, তবে আমার নাম। মায়ের কথা মনে পড়লে সময় সময় বলি,
‘কো রামঃ?’ দাদা ওই যে বলেছি, ওখানেই আমার গোঁড়ামি। রামকৃষ্ণ পরমহংস
ঈশ্বর ছিলেন কি মানুষ ছিলেন, যা হয় বল দাদা; কিন্তু যার মায়ের উপর ভক্তি
নেই, তাকে ধিক্কার দিও।’
ভক্তির আতিশয্যে মানুষ পাথরের টুকরোকে শালগ্রাম বলে সিংহাসনে বসিয়ে
পুজো করতে পারে, ভোগ লাগাতে পারে। শ্রীরামকৃষ্ণ যুগাবতার, তাঁর সহধর্মিনী,
সুতরাং পূজনীয়া। শ্রীরামকৃষ্ণকে অনেক পরীক্ষায় পাস করতে হয়েছিল। মা সারদা
বলেছিলেন, ঠাকুরকে ‘বিরে’ নিয়েছিল। অর্থাৎ পরীক্ষা করে নিয়েছিল। ‘কো
রামকৃষ্ণ’! রানী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে পরীক্ষা করিয়েছিলেন, সত্যই কামজয়ী কি না।
মথুরবাবু কায়দা করে মেছুয়াবাজারে বাইজী বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ব্রাহ্মসমাজে
সমাধিস্থ ঠাকুরের চোখের মণিতে আঙুল ঠেকিয়ে সন্দেহবাদীরা পরীক্ষা করতে
চেয়েছিল, ঢং, না প্রকৃত সমাধি! সব চেয়ে বেশি পরীক্ষা করেছিলেন নরেন্দ্রনাথ।
বিছানার তলায় লুকিয়ে টাকা রেখেছিলেন। টাকার স্পর্শে শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর ঝন্
ঝন্ করত। হাতের আঙুল বেঁকে যেত। বিছানায় বসামাত্রই শ্রীরামকৃষ্ণ উঃ বলে
লাফিয়ে উঠেছিলেন। সমাধিস্থ ঠাকুরকে গরম কঙ্কের ছ্যাঁকা দিতে চেয়েছিলেন।
শেষ শয্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ। রোগ যন্ত্রণা। পাশে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্রনাথ, ভাবছেন এখন
যদি বলতে পারেন, আমি অবতার! শ্রীরামকৃষ্ণের রোগক্লিষ্ট ঠোঁটে হাসির রেখা।
অস্ফুটে বললেন, এখনো অবিশ্বাস!
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই দুজনের পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। গ্রহণযোগ্যকেই মানুষ
গ্রহণ করে। কাচকে হিরে বলে চালানো যেতে পারে। পাকা জহুরী ধরে ফেলবে।
কাল সেই জহুরী। ঠাকুর ভক্তদের প্রায়ই সাবধান করতেন, ‘সাধুকে দিনে দেখবি।
রাতে দেখবি। বাজিয়ে নিবি। হাঁড়ি কেনার সময় টংটং করে বাজিয়ে নিতে হয়।’
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেকেই নিজে বাজাতে চাইলেন। তিনি ‘মা’ তৈরি করতে চাইছেন।
যাঁর একটি দুটি নয় হাজার হাজার সন্তান হবে। তাদের মধ্যে একটি সন্তান তিনি
স্বয়ং।
তোতাপুরীর কাছে যখন সন্ন্যাস নিলেন, তখন সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, আমি
যে বিবাহিত! গুরু তোতাপুরী বললেন, বহুত আচ্ছা! হাতে নাতে পরীক্ষা হবে
তোমার, ব্রহ্মচর্য রক্ষা করতে পার কি না! ইন্দ্রিয় সংযত হয়েছে কি না।
শ্রীমা একাদিক্রমে আটমাস ঠাকুরের সঙ্গে একই শয্যায় শয়ন করেছিলেন।
অতঃপর শ্রীরামকৃষ্ণ এই বললেন, ‘ও যদি এত ভাল না হত, আত্মহারা হয়ে আমাকে

আক্রমণ করত, তাহলে সংযমের বাঁধ ভেঙে দেহবুদ্ধি আসত কি না, কে বলতে
পারে? বিয়ের পরে ‘মা’কে ব্যাকুল হয়ে বলেছিলাম, ‘মা, আমার পত্নীর ভেতর থেকে
কামভাব এক কালে দূর করে দে।’ ওই সঙ্গে একত্রে বাস করে এই কালে বুঝেছিলাম,
‘মা সে-কথা সত্যসত্য শুনেছিলেন।’
এই দিব্য সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণ! শ্রীরামকৃষ্ণ প্রশ্ন করেছিলেন শ্রীমাকে,
‘তুমি কি আমাকে সংসার পথে টেনে নিতে এসেছ?’ শ্রীমা-র দৃঢ় উত্তর, ‘তোমার
ইষ্টপথে সাহায্য করতেই এসেছি।’ অর্থাৎ তুমি গুরু, আমি তোমার শিষ্য। এতকাল
পুরুষের সাধন জগতে নারী ছিলেন ব্রাত্য। বড় বড় সাধকরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এইটিই
বলতে চাইতেন, নারী নরকের দ্বার। নারীর এত বড় অবমাননা আর কী হতে পারে!
বেদে অধিকার নেই, চণ্ডীপাঠের অধিকার নেই, শালগ্রাম স্পর্শকরার অধিকার নেই!
নারী কি তাহলে শুধুমাত্র পুরুষের ভোগ্যপণ্য, দাসী, বাঁদী, গণিকা, সন্তানের
জন্মদানের যন্ত্র! এ কী কথা? তোমরা ‘মা’ বলে ডাক কোন আক্কেলে! দেবী মূর্তির
পূজা করো! গরম গরম মন্ত্র পড়, অথচ জীবন্ত রমণীকে দেখ কামনার দৃষ্টি নিয়ে!
দিকে দিকে চণ্ডীপাঠ! লক্ষবার বলছ-স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু-সব রমণীই
মাতৃরূপা, অথচ কাজে করছ কী! সংসারের হাঁড়িকাঠে বলি দিচ্ছ।
শ্রীরামকৃষ্ণ এক বিপ্লবী! ঠাকুর আর মা অদ্ভুত এক টিম। ধর্মের জগতে শক্তিশালী
এক বিস্ফোরণ! গীতার মানে জান? পর পর গীতা গীতা গীতা বলে যাও। কী
শুনবে? তাগী, তাগী। অর্থাৎ ত্যাগী। শাস্ত্র তাকে তুলে রাখার জন্যে নয়। ধর্ম ধারণ
করার জিনিস! জীবন থেকে পালানো নয়, ছুঁচের ফোঁড়ের মতো জীবনে জীবন
গাঁথা। ধর্ম ইয়ারকির জিনিস নয়। রঙের গামলা। তুমি যে-রঙ চাও, সে রঙে নিজেকে
ছুপিয়ে নাও। ধর্মের জন্যে আলাদা কোনও পোশাক নেই। লুঙ্গি, হ্যাটকোট,
ধুতি-পাঞ্জাবি, কৌপিন সবই চলতে পারে। চোখ উলটে দম বন্ধ করে, ডিগবাজি
খেয়ে ঈশ্বরকে ডাকার দরকার নেই। আগে বিশ্বাস, তারপর ‘মা’ বলে ডাকা। ‘বাবা’ও
বলতে পার। ‘দাদা’ও বলতে পার। তবে সম্পর্কটা যেন পাকা হয়। আসল কথা মানুষের
মধ্যে ভগবানকে দেখ। দয়ার মনোবৃত্তি নয়, সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে মানুষের পাশে
গিয়ে দাঁড়াও। গুরুগিরি আর বেশ্যাগিরি এক। মানুষের গুরু একজন, তিনি পরমেশ্বর।
বিদায়ের আগে রোগশয্যায় শুয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা, পারবে না তুমি? পারবে
না! অন্ধকারে যারা পোকার মতো কিলবিল করছে তাদের আলোয় আনতে পারবে
না? আমি কী করেছি, তোমাকে আরো, আরো, আরো, করতে হবে।
পঞ্চায়েত নির্বাচন ছাড়াই জয়রামবাটীর লক্ষ্মী, সারদা হলেন নেত্রী। আমাদের
মা। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শক্তির জন্যে ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ কী দিয়ে গেলেন, ‘তুমি
কামারপুকুরে থাকবে শাক-ভাত খাবে আর হরিনাম করবে।’
দুঃখের, দারিদ্রের আগুনে পুড়ে বেরিয়ে এলেন সেই মা। জাতিভেদ মানেন

না। সংস্কার মানেন কুসংস্কার মানেন না। নীচতা সহ্য করতে পারেন না। দেহ,
দৈহিক কষ্ট ভ্রুক্ষেপ করেন না। উদার মনোভাব। অসীম সাহস। তেলেভেলোর
প্রান্তরে একাকী এই রমণী ডাকাত দম্পতির হৃদয় হরণ করলেন। হরণ করতে এসে
চিরকালের জন্যে হৃত হল দস্যুদম্পতি। ভক্ষক হল রক্ষক। লাঠি হাতে মেয়েটিকে
আগলে আগলে নিয়ে এল তারকেশ্বরের চটি পর্যন্ত। বিদায় মুহূর্তে পাষাণের চোখে
জল।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, আমার অনেক বিচার ছিল, তেমার কোনো বিচার
থাকবে না। ভক্তের যেমন জাত নেই, সন্তানেরও সেই রকম জাত নেই। ভালয়-মন্দয়
মেশানো এই পৃথিবী। সব রকমের পাওনা হাসি-মুখে বুঝে নিতে হবে। শ, ষ,
স-সহ্য করো, সহ্য করো, সহ্য করো। যে সয় সে রয়/ যে না সয়, সে নাশ হয়।
যেখানে যেমন, সেখানে তেমন, যার কাছে যেমন তার কাছে তেমন আর যখন
যেমন তখন তেমন। তাঁর গ্রামের বাড়িতে মা যখন, যখন থাকতেন দেখলে বোঝার
উপায় ছিল না তাঁর প্রকৃত স্বরূপ। একেবারেই সাধারণ। শান্ত। মহাসমুদ্রের মতো।
কল্লোল হিল্লোল নেই। উপদেশ দিতেন না, ধমকাতেন না, রাগ করতেন না। শুধু
কাজ করতেন, কর্তব্য পালন করতেন। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর উপদেশ। আকাশপ্রদীপের
মতো জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শটিকে তুলে ধরে রেখেছিলেন।
গ্রামের বুড়িরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে মায়ের কাছে ছুটে এসেছে
সালিশির জন্যে। সংসারে অন্যান্যদের ভীষণ রাগ। ভ্রাতুষ্পুত্রী চড়া গলায় মাকে
তীব্র গালাগাল দিচ্ছে। তোমার প্রশ্রয়ে ক্ষণে ক্ষণে, যখন তখন এসে বাড়ির শান্তি
নষ্ট করছে। মা কিন্তু শান্ত। ক্রোধের সামান্যতম প্রকাশ নেই। শুধু বলতে লাগলেন,
মিষ্টি কথা বল, রাধু মিষ্টি কথা বল।
কাঠের পিঁড়েতে সামনের দিকে পা দুটি ছড়িয়ে বসে আছেন অবতারের শক্তি।
পরিধানে নরুনপাড় কাপড়, হাতে বালা। কেউ তাঁকে চিনতে পারেননি তখনো।
স্বামী প্রেমানন্দ লিখেছেন, তাঁকে কে বুঝেছে, কে বুঝতে পারে? মায়ের স্থান অনেক
উঁচুতে। স্বামীজীরও ওই এক কথা। জয়রামবাটীর মানুষ তাঁকে শ্রীরামকৃষ্ণের বিধবা
করতে চেয়েছিলেন। জনৈক বৃদ্ধা একদিন বললেন, পাগলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল,
সংসারসুখ হয়নি। এখন শিষ্যশিষ্যা নিয়ে কিছুটা সুখের মুখ দেখছে।
নারীজাগরণের ধুয়ো তুলে পুরুষরা নাচাচ্ছে! মহাভারতে এক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ
হয়েছিল একালে শত শত দ্রৌপদীর লজ্জা হরণ করছেন ব্যবসায়ী দুঃশাসন।
অবলাদের বোধ ছিল এই সবলারা নির্বোধ। নিবেদিতা কি বলছেন-Shall we
after centuries of Indian womanhood fashioned on the pattern of
Sita and Savitri descend to the creation of conquettes and
Divorcees.নিবেদিতার শেষ কথা-ভারতীয় নারীর আদর্শ সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণের

শেষ বাণী-জননী সারদা। তিনি মা হলেন কবে! যেদিন দুর্মদ সভ্যতা মা হারা হল।
যেদিন থেকে নারীকে বলা হতে লাগল সেক্স। শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার শ্রেষ্ঠ
সিদ্ধি-সিদ্ধিদাত্রী মা সারদা। অনেক নাচ নেচে অবশেষে, মা বাঁচাও। আমরা ভুলে
বসে আছি, পৃথিবীর সব মানুষই কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। সমস্ত মা যে
শরীরে এক হয়েছেন, তিনিই মা সারদা। মাঝে মাঝে আপন মনে বলতেন, ‘ঠাকুর,
এত ভার আমি সইতে পারছি না।’ আবার বলতেন, ‘দুঃখী মানুষের ব্যথা কত বড়
হলে বুঝবি। তুই তোমা নস্।’ বলছেন কোনো বালকভক্তকে। তিনি স্নেহময়ী ছিলেন,
স্নেহদুর্বলা ছিলেন না কিন্তু।
সারা জগৎ শিশুর মতো কাঁদছে, মা দুহাত বাড়িয়ে ডাকছেন, চলে আয় যন্ত্রণা
মুছিয়ে দি। কী ভাবে? খানিকটা শক্তি ঢুকিয়ে দেবো। সেই শক্তিটা কী মা? আমার
জীবন কথা। আমার চেয়ে দুঃখ কে পেয়েছে! আমার মতো যন্ত্রণা কে সহ্য করেছে!

 

Leave a Comment