কেউ মা বলে ডাকলে তাকে ফেরাতে পারব না

মা স্নেহময়ী, মা করুণাময়ী, শক্তিস্বরূপিণী, ইত্যাদি বিশেষণে বিভূষিত করলেই কি
মায়ের পূজা শেষ হল? সেই পূজাই পূজা যে-পূজারী নিজেই পূজনীয় হয়ে ওঠেন।
ঠাকুর স্তুতি অপছন্দ করতেন। কেশবচন্দ্রকে একবার মৃদু তিরস্কার করেছিলেন।
স্বামীজী শাক্তের ব্যাখ্যা করেছেন, শক্তির উপাসকই শাক্ত। শক্তিমান হয়ে ওঠাই
হল সিদ্ধি।
শক্তিমান হওয়া কাকে বলে? দেহের শক্তি? না, মনের শক্তি। মনের সমস্ত দুর্বলতা
পরিহার করা। ইন্দ্রিয়কে স্ব-শাসনে আনা।নিজের বোধ, বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত বিচার সব মায়ের
কাছে জমা করে দেওয়া। মায়ের দ্বারা পরিচালিত হওয়া। সে অবস্থাটা কেমন? মনের
সেই অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছিলেন স্বামী প্রেমানন্দ। মাকে বলেছিলেন, ‘আমি কি
জানি, মা? আমি কি জানি? আমাকে যা আদেশ করবেন তাই করব। জলে ঝাঁপ দিতে
বলেন, জলে ঝাঁপ দেব; আগুনে ঝাঁপদিতে বলেন, আগুনে ঝাঁপ দেব; পাতালে প্রবেশ
করতে বলেন তো পাতালে প্রবেশ করব। আমি কি জানি?’
এই সমর্পণ থেকেই ত অমিত শক্তি আসে। পূজা মানে সমর্পণ। মায়ের কোলে
চড়ে বসা। শুদ্ধ মন না হলে ত হবে না। মনের ময়লা সাফ করতে হলে শক্তি চাই।
সব রকমের আসক্তি ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। এইটিই সাধনা। ঠাকুর বলতেন, ‘আমি
খাই, দাই আর থাকি, আর সব আমার মা জানেন।’
স্বামী প্রেমানন্দ মালদায় যাবেন, মায়ের আদেশ। যাবার দিন ঠিক হয়েছে
বৃহস্পতিবার। সময়, ভরা বারবেলা। একটা আপত্তি উঠল-বৃহস্পতিবারের
বারবেলা! বাবুরাম মহারাজ বললেন, ‘মা অনুমতি দিয়েছেন, বৃহস্পতির বারবেলা
আবার কীরে?’
মাকে আমরা সেই ভাবে ধরতে পারব কি? মুখে মা, মা বলে মনে অন্যভাব ভরে

রাখব। কিন্তু মা যে বলেছেন, ‘কেউ মা বলে ডাকলে তাকে ফেরাতে পারব না।’
ঠাকুর জানতেন,বলেও ছিলেন, ‘আমার কাছেবিচার আছে,তোমার তাও থাকবে
না। তুমি সকলের মা’। ঠাকুর অন্যের স্পর্শ করা অন্ন গ্রহণ করতে পারতেন না।
স্পর্শদোষ হত। সকলের প্রণাম নিতে পারতেন না, বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা অনুভব
করতেন। কারো কারো প্রণামে মায়েরও সেই একই অনুভূতি হত। দুঃখ করে বলতেন,
কারা যে সব আসে, মনের ভেতর কি ভরে! ঘটি ঘটি জল ঢাললেন পায়ে। তবু প্রণাম
নিতেন। করুণাময়ী যে। পদ্মবিনোদের ঘটনা আমরা জানি। অন্তিম সময়ে পদ্মবিনোদ
‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ শুনতে শুনতে চলে গেলেন। দুগাল বেয়ে গড়িয়ে নেমেছে
শেষ অশ্রু। মা শুনে বললেন, ‘তা হবে না? ঠাকুরের ছেলে যে! কাদা মেখেছিল, এখন
যার ছেলে তাঁরই কোলে গেছে।’ অপূর্ব যাত্রা।
জয়রামবাটীর অদূরে গ্রাম-শিরোমণিপুর। অধিকাংশ মানুষই গরিব, কৃষিজীবী।
সেই গ্রামের এক বৃদ্ধার ছেলে খুব অসুস্থ। বাঁচার আশা নেই। সন্তানের বৃদ্ধা মায়ের
গভীর বিশ্বাস, মা সারদার চরণামৃত খেলে সুস্থ হয়ে উঠবে। যেমন কলকাতার
গিরিশবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, তাঁর ছেলে দানিকে ঠাকুরের শ্রীচরণধৌত জল
খাওয়ালে দুরারোগ্য অসুখ থেকে সুস্থ হয়ে উঠবে।’
শিরোমণিপুরের বৃদ্ধা জননী মায়ের কাছে কেঁদে পড়লেন। মা তাঁকে চরণধৌত জল
দিতে রাজি হলেন। গেলাসের জলে বুড়ো আঙুলটির ডোবাতে যাবেন, এমন সময়
জনৈক ভক্ত এসে বাধা দিলেন। বৃদ্ধাকে বললেন, ‘তুমি ছেলের চিকিৎসা করাও
মার-পা-ধোওয়া জল পাবে না।’
বৃদ্ধা জননীর আশাহত মুখের দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘তুই মা চুপিচুপি এলি
না কেন, তাহলে তো পেতিস। ছেলেরা এখন সব জেনে ফেলেছে। এখন উপায়
কী?’ বৃদ্ধার করুণ মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, ‘আমি বলছি, তোর
ছেলে সেরে উঠবে।’
হতাশ বৃদ্ধা সে-কথা বিশ্বাস করতে না পেরে ঠুকঠুক করে বাড়ি ফিরে এলেন।
বাড়িতে ঢুকে তিনি হতবাক-এ আমি কি দেখছি। মরণাপন্ন ছেলে হাসিহাসি মুখে
ঘরে পায়চারি করছে।
বিশ্বাস! মাকে বিশ্বাস। স্তুতি নয়। পাঁচ সিকে পাঁচ আনা বিশ্বাস।

 

Leave a Comment