কল্পতরু ও গিরিশচন্দ্র

ঘোর নাস্তিক। উত্তর কলকাতার প্রতিষ্ঠিত বংশের সন্তান। আদরে, আব্দারে মানুষ।
একগুঁয়ে, একরোখা। যা করবেন, তা করবেনই। বাধা পেলে ভয়ঙ্কর। ইন্টেলেকচুয়াল।
প্রখর প্রতিভার অধিকারী। অভিনয় প্রতিভা ও সাহিত্য প্রতিভা। অত্যন্ত মেধাবী।
গণিত শাস্ত্রে অসীম পারঙ্গমতা। বিজ্ঞানমনস্ক। সাহেব কোম্পানিব খাশা হিসাব
রক্ষক। দায়িত্বশীল, বিশ্বাসী। সায়েবরা তাঁকে ভালবাসেন। ভীষণ পড়ুয়া। প্রচুর বই
কেনেন। নানা বিষয়ের ভাল ভাল বই। গোগ্রাসে পড়েন। পড়ার ঝোঁক এলে, দিনের
পর দিন বাড়ির বাইরে আর তাঁকে দেখা যায় না। এসিয়েটিক সোসাইটির সভ্য।
যশস্বী অভিনেতা। সবাই বলেন, বাঙলা থিয়েটারের ‘গ্যারিক’। ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকে
‘ভীম সিংহের’ ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দেখে নাটোরের মহারাজ তাঁকে রাজবেশ
আর তরবারি উপহার দিয়েছিলেন। উদার গিরিশচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে সেই উপহার
থিয়েটার সম্প্রদায়কেই দান করে দিলেন।
কিন্তু ভীষণ দাম্ভিক, অহঙ্কারী। গম্ভীর আত্মা। এতই তাঁর অহঙ্কার মাথা নত করে
প্রথানুযায়ী গুরুজনদের প্রণাম করতে হবে বলে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি মাড়ান না।
নিজের জগতে থাকেন। প্রচুর মদ্যপান করেন। গণিকা সঙ্গে অভ্যস্ত। অভিনয় ও
রচনা শক্তির প্রতিভায় যাবতীয় কলুষ চাপা পড়ে গেছে।
দেব-দেবী মানেন না। মা দুর্গাকে কুড়ুল দিয়ে কেটে খণ্ড খণ্ড করলেন। চলার
পথে নির্জন স্থানে শিবলিঙ্গ দেখলে অপবিত্র করে অপেক্ষা করতেন শিব শাস্তি
দেন কি না। সত্যবাদী, অপ্রিয় স্পষ্টবক্তা, অনুসন্ধিৎসু গিরিশ। কোনো লুকোচুরি
নেই, হ্যাঁ, আমি মদ খাই। বেশ্যাগমন করি, তোমাদের তেত্রিশ কোটি দেব-দেবী
আমি মানি না। আমি মানুষের ভণ্ডামি সহ্য করতে পারি না। নির্যাতিতের পাশে
গিয়ে পর্বতের মতো দাঁড়াই। কাঁধে করে মৃতদেহ নিয়ে যাই শ্মশানে। পরিত্যক্ত
গঙ্গাযাত্রীকে দুধ নিয়ে গিয়ে খাওয়াই। আমার অনেক শত্রু, আমি গ্রাহ্য করি না।

আমি গিরিশচন্দ্র নই, আমি গিরিশচণ্ড।
দক্ষিণেশ্বরের খবর তিনি রাখতেন না। জানতেন না সেখানে একজন ধর্মবিজ্ঞানী
এসেছেন। এসেছেন মানব বিজ্ঞানী। নিজের পরিচয় দেন এই ভাবে, দিনের মধ্যে
আমি সাতবার মরি সাতবার বেঁচে উঠি।গিরিশচন্দ্র না জানলেও শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন।
বাগবাজারের বোসপাড়ায় একজন নেমেছে, সে রামকৃষ্ণলীলার পার্যদ। দড়ি আলগা
দেওয়া আছে। যা করার করে নিক। ভোগ, দুর্ভোগ সব শেষ করুক। না জেনেই
এমন কিছু করুক যাতে মানুষের কল্যাণ হয়। সে লোকশিক্ষক। অহং-এর আঁচ কমলেই
নিজেকে আবিষ্কার করবে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবসমাধিতে সব দেখতে পেতেন। মা তাঁকে দেখিয়ে দিতেন। তিন
কালের খবর তাঁর কাছে চলে আসত। অক্ষয়কুমার সেন ‘রামকৃষ্ণ পুঁথিতে’লিখছেন,
শ্রীরামকৃষ্ণের অনুভবকালীর মন্দিরে আমি আপনার মনে
উপবিষ্ট হেনকালে দেখি নিরখিয়া,
আইল মুরতি এক নাচিয়া নাচিয়া।
কেবা সে যখন আমি জিজ্ঞাসিনু তায়,
কহিল, ‘ভৈরব মুই আইনু হেথায়।’
‘কিবা প্রয়োজন?’-তারে পুছিলে আবার
র করিল, ‘কার্য করিব তোমার।’
গিরিশ আমার কাছে আসিবার পর,
দেখিনু ভৈরব সেই তাহার উপর।
দুজন দু’জগতে। সাধনার জগতে শ্রীরামকৃষ্ণ, নাটকের জগতে গিরিশচন্দ্র।
বারাঙ্গনাদের দিয়ে স্ত্রী ভূমিকায় অভিনয় করাতে হয়। মহলা দিতে হয়। সরোজিনী,
শশিমুখী, বিনোদিনী, তিনকড়ি, আরো অনেকে। রাত বাড়ে, নেশা চড়ে, পালা জমে।
দর্শকদের উচ্ছ্বাস। পর্দা পড়ে যায়। নাটকের চরিত্ররা নেমে আসে বাস্তবে। অভাব,
অভিযোগ, দুঃখ, দারিদ্র, লোভ, লালসা, প্রতিযোগিতা, চরিত্রহীনতা। থিয়েটারের
পেছনে যাঁরা টাকা ঢালেন তাঁদের অন্য মতলব থাকে। ম্যানেজার এবং ডিরেক্টার
গিরিশচন্দ্রকে এই জগৎ সামলাতে হয়। এইসব রমণীদের যত আব্দার আর কোঁদল
সহ্য করতে হয়। থিয়েটারের বাণিজ্যের দিকে প্রখর নজর রাখতে হয়। সময়ের
নাড়ি টিপে পড়তে হয়, কোন পালা চলবে, কোন পালা ‘ফ্লপ’ করবে! তিনি নিজেই
নাট্যকার। যশস্বী অভিনেতা। অগাধ তাঁর পাণ্ডিত্য। প্রচুর পড়াশোনা। বিদেশি নাটক
মন দিয়ে পড়েন। শেক্সপিয়ারে অসাধারণ দখল। ইংরিজী যেমন বলেন, সেই রকম
লেখেন। ‘ম্যাকবেথ’ বাংলায় রূপান্তরিত করেছেন। সে এক চ্যালেঞ্জ। গিরিশের
গোঁ। তিনি পরাজয় স্বীকার করবেন না। ‘টাওয়ারিং পার্সোন্যালিটি’। হেয়ার স্কুলে

গিরিশচন্দ্রের সহপাঠী ছিলেন গুরুদাস ব্যানার্জি। পরে হাই কোর্টের জজ হলেন।
স্যার উপাধি পেলেন। বিখ্যাত মানুষ, স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি। গুরুদাস বলেছিলেন,
গিরিশ শেক্সপিয়ারের কিছু কিছু নাটক বাঙলায় অনুবাদ করতে পারলে বাঙলা ভাষার
খুব উপকার হত। তবে খুবই কঠিন কাজ। ধর না,ম্যাকবেথের ডাইনিদের সংলাপ।
বাঙলা করা দুঃসাধ্য। গিরিশের গোঁ, হবে না মানে! গিরিশচন্দ্র সেই সময়
অ্যাটকিনসন কোম্পানির বুককিপার। একটি খাতা আর ম্যাকবেথ সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে।
খাতাটি কখনো কখনো অপিসের ড্রয়ারে থাকে। অনুবাদ প্রায় শেষ। এমন সময়
তাঁর জীবনে এল প্রথম দুর্যোগ। রুদ্র গিরিশ আসলে প্রেমিক। স্ত্রী বিয়োগ হল।
বেশ কিছু দিন অন্যমনস্ক ছিলেন। খেয়াল রইল না ম্যাকবেথের পাণ্ডুলিপিটি যে
অফিসের ড্রয়ারে! এইবার দুর্যোগের উপর দুর্যোগ, অ্যাটকিনসন কোম্পানির অফিস
নিলাম হয়ে গেল। আসবাবপত্র, চেয়ার, টেবল, পাণ্ডুলিপি-সহ ডেস্ক, সব বিক্রি হয়ে
গেল। দমে যাবার পাত্র ছিলেন না গিরিশচন্দ্র। আবার শুরু করলেন অনুবাদ। মঞ্চস্থ
হল নাটক। নামভূমিকায় গিরিশচন্দ্র। লেডি ম্যাকবেথ-তিনকড়ী দাসী। স্যার গুরুদাস
লিখলেন…. performed the difficult task very creditably on the
whole. His translation is worthy of the original.
এই জগতের গিরিশ দক্ষিণেশ্বরে যাবেন কেন? কেন উকি মেরে দেখবেন ছোট্ট
ঘরখানিতে কোন সাধকের লীলা চলছে। ঠাকুর বলতেন চুম্বক পেরেককে টানে,
আবার পেরেকও চুম্বককে টানে। পেরেকের গায়ে মাটি ময়লা লেগে থাকলে চুম্বক
টানতে পারে না। গিরিশচন্দ্র নিজেও জানেন না তাঁর জীবন কী ভাবে ঘুরবে। কৃপা
কোন পথ ধরে আসবে। অযাচিত কৃপায় তাঁর জীবন কী ভাবে ধুয়ে যাবে। নট,
নাট্যকার গিরিশের চেয়ে কী ভাবে বড় হয়ে উঠবে ভক্ত ভৈরব গিরিশের পরিচয়!
প্রথম যৌবনে অতিরিক্ত আদরে বখে যাওয়া এক যুবক। চোদ্দো বছর বয়সেই
পিতৃ-মাতৃহীন। তিনটি নাবালক ভাই। পনেরো বছর বয়সেই দিদি বিয়ে দিয়ে
দিলেন। দিদির যুক্তি, মাথার উপর যখন অভিভাবক স্থানীয় কেউ নেই, তখন
গণ্যমান্য বিজ্ঞ একজন ব্যক্তির কন্যার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে সব দিকেই ভাল!
অ্যানিসন টিলটন কোম্পানির বুককিপার নবীনচন্দ্র দেব। শ্যামপুকুরের বিখ্যাত
মানুষ। তাঁরই কন্যা প্রমোদিনী গিরিশচন্দ্রের স্ত্রী হলেন। বিয়ের দিন কলকাতায় ঘটে
গেল ঐতিহাসিক অগ্নিকাণ্ড। নিমতলায় কাঠের গোলায় আগুন লাগল। ভয়ঙ্কর সেই
আগুন ছুটে আসছে বাগবাজারের দিকে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
আগুন এই বার গিরিশচন্দ্রের বাড়ি গ্রাস করবে। বিয়েবাড়ির আমোদ-প্রমোদ মাথায়
উঠল। গৃহদেবতা শ্রীধরজী বাঁচান বাঁচান। রক্ষা করল দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বিশাল
একটি তেঁতুলগাছ। আগুন ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই তেঁতুলগাছে।বৈশ্বানরের শেষ আহার।
বিয়ের পর আবার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। পরবর্তীকালের অনেক বড় মানুষ

তাঁর সহপাঠী ছিলেন। স্যার গুরুদাস, সাহিত্যিক চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ। মেধাবী, অধ্যবসায়ী
ছাত্র, কয়েকবার পুরস্কারও পেয়েছেন। তবু প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতি তাঁর ধাতে সইল
না। কেন? তাঁর লেখা নল-দময়ন্তী নাটকে বিদূষকের মুখে তার আভাস রেখেছেন,
‘গুরুমশায় শালা যে কান মলে দিলে, নইলে ক, খ শিখতুম।’ গিরিশচন্দ্র নিজে
বলেছিলেন, ‘পশু চাবুকে বশ হয়, মানুষ নয়। আমার স্বভাব ছিল, জুজুর ভয় দেখালে
জুজু দেখতে আগে ছুটতুম। গিরিশচন্দ্র ভয় কাকে বলে জানে না।’
গোটা উত্তর কলকাতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ বুঝতে পারছেন না, এই
ছেলেটির পরিণতি কী হবে! আর একজন বড় ঘরের ছেলেরও একই স্বভাব।
অদূরেই তাঁর বাড়ি। দত্তবংশীয় বিলে। অনেকেই যুবকটিকে উদ্ধত, অহংকাবী
ভাবেন। গিরিশ ঘোষ ধর্মকর্ম মানেন না। নরেন্দ্রনাথের অন্বেষণ ঈশ্বর। শর্ত একটাই
যদি কোনো সাধক দেখাতে পারেন, তবেই বিশ্বাস করব। নরেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজ ছুঁযে
দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছে গেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিভূমিতে নরেন্দ্রনাথকেও দর্শন করেছিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ ব্রিগেডে নরেন্দ্রনাথ মেজর জেনারেল। আবার গিরিশচন্দ্রের গুণমুগ্ধ হবেন
নরেন্দ্রনাথ।গিরিশচন্দ্র তাঁর এতটাই কাছে চলে আসবেন, যে স্বামীজী তাঁকে সম্বোধন
করবেন জি. সি. বলে।
শ্রীরামকৃষ্ণ লীলার দুটি ধারা-একটির রঙ গেরুয়া আর এটির রঙ সাদা।
একদিকে বসবেন সন্ন্যাসীরা,অপর দিকে গৃহীরা। দুটি স্তম্ভ তৈরি হবে। একটি স্তম্ভ
নরেন্দ্রনাথ। অপর স্তম্ভ গিরিশচন্দ্র। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুর উদ্যানবাটীতে
রোগশয্যায়। আর কয়েকদিন পৃথিবী বাস। নরেন্দ্রনাথের নেতৃত্ব ঠাকুরের যুবক
ভক্তবৃন্দ, যাঁদের তিনি গেরুয়া দিয়েছিলেন, তাঁরা ঘর-সংসার, লেখাপড়া, দেহ-সুখ
সব ভুলে ঠাকুরের সেবা করছেন, মা সারদা আছেন, গৃহী ভক্তরা ঠাকুরের চিকিৎসা,
বাড়ি ভাড়াইত্যাদির খরচ সামলাচ্ছেন। একখানি গেরুয়া বস্ত্র ও রুদ্রাক্ষের মালা ঠাকুর
গিরিশচন্দ্রকে দিয়েছিলেন।
গৃহীরা খরচ চালাচ্ছেন।তাঁরা বললেন, সমস্ত খরচের একটা হিসাব রাখা উচিত,
‘টু দি পাই’। নরেন্দ্রনাথ শুনে বললেন, ‘এত হিসেব রাখা কেন? এখানে কেউ ত
চুরি করতে আসেনি।’ ঠাকুরের অন্যতম গৃহীভক্ত রামবাবু মাঝে মাঝে হিসাব
দেখতেন। একবার হিসাব দেখতে দেখতে রামবাবুরা হুলস্থুল লাগিয়ে দিলেন-‘এ
কি, এত খরচ, বেহিসেবী খরচ-খরচা, এ চলবে না। চলতে পারে না।’ মহা হইচই।
নরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘চালাতে হবে না। রামবাবুদের টাকা নেওয়া হবে না। আর
গৃহীদের ঠাকুরের ঘরে ‘নো এন্ট্রি’। ঢুকতে দেওয়া হবে না।’
কিন্তু খরচা, খরচা কে চালাবে! ঠাকুর বলতেন, গিরিশের পাঁচ সিকে পাঁচা আনা
বিশ্বাস। তিনি এগিয়ে এলেন। সেই সময় তাঁর যথেষ্ট সামর্থ্য ছিল না। থিয়েটার
সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত। গিরিশচন্দ্র বীর ভক্তের মতো

বললেন, ‘কুছ পরোয়া নেহি। আমি খরচ সামলাব। প্রয়োজন হলে ভিটে মাটি বিক্রি
করে দেবো।’ গৃহীদের দিকে গিরিশচন্দ্র হয়ে উঠলেন স্তম্ভ।
নরেন্দ্রনাথ বড় অভিমানে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণকে সব জানালেন। ঠাকুর বললেন,
পুঁথিকারের ভাষায়,
নরেন্দ্র দেখিয়া ক্ষুণ্ণ কন প্রভুরায়।
চল আমি যাব তোরা যাইবি যেথায়।।
যেখানে থাকিবি তোরা সেইখানে রব।
যেমন রাখিবি মোরে তেমতি থাকিব।।
নরেন্দ্র বলেন, স্কন্ধে তোমায় লইয়া।
রাখিব খাওয়াব ভিক্ষা দুয়ারে মাগিয়া।।
এত শুনি গুণমণি কন বার বার।
গৃহীদের টাকাকড়ি লইও না আর।।
ঠাকুরের দক্ষিণেশ্বর লীলায় লক্ষ্মীনারায়ণ মারোয়াড়ী সেই যে প্রবেশ করেছিলেন,
আর নিষ্ক্রান্ত হতে পারেননি। ঠাকুরের সেবায় দশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন।
ঠাকুর আর মা দু’জনেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই গোলোযোগের সংবাদে
লক্ষ্মীনারায়ণ ছুটে এলেন। টাকা রেখে চলে গেলেন। নরেন্দ্রাদি ভক্তরা জানেন,
ঠাকুর সে টাকা নেবেন না। অবশেষে ঠাকুরের মধ্যস্থতায় এই তিক্ততার অবসান
হলেও, একটা ব্যবধান রয়েই গেল।
ঠাকুরের জগতে কী ভাবে প্রবেশ করলেন গিরিশ! শুধু প্রবেশ করলেন না,
হয়ে দাঁড়ালেন একজন অভিভাবক, পরম সুহৃদ, পরামর্শদাতা। অনেক রকমের ধাক্কা
খেতে খেতে একটু একটু করে পথ ঘুরতে লাগল। নদী যেন ধারা পাল্টাচ্ছে। প্রথমা
স্ত্রী চলে গেলেন। গিরিশচন্দ্র ফ্লাই বার্জার কোম্পানির কাজে ভাগলপুরে। একদিন
বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে পড়ে গেলেন অন্ধকার গুহায়। পড়লেন না, সাহসী
গিরিশ দুঃসাহসে ভর করে গুহা দেখতে গুহায় নামেন। দেখা গেল, গুহায় ঢোকার
পথ আছে বেরোবার পথ নেই। সে এক জীবন-মরণ সমস্যা। গিরিশের দেখাদেখি
বন্ধুরাও নেমেছেন। সব ক’জন যেন পাতকুয়ায় পড়েছেন। ভগবান ছাড়া উদ্ধারের
আশা নেই। বন্ধুরা বললেন, এস সবাই মিলে বিপদভঞ্জতেন মধুসুদনকে ডাকি।
এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নাস্তিক গিরিশ বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে ডাকতে
লাগলেন। কারণ সকলের অভিযোগ, নাস্তিক সঙ্গে থাকায় এই বিপদ ঘটেছে। প্রার্থনা
মাত্রই সামনে পথ দেখা গেল। গুহার বাইরে এলে গিরিশচন্দ্র যে কথা বললেন,
সে কথা গিরিশচন্দ্রই বলতে পারেন-‘ভাই আজ বিপদে পড়েই তাঁকে ডাকলাম;
কিন্তু যদি বিশ্বাস করে কখনও তাঁর নাম নিতে পারি তবেই নেব-বিপদে কি মৃত্যুভয়ে
নয়।’

বেশ! তাই হোক! ভগবান অদৃশ্যে থেকে বললেন। গিরিশ শুনতে পেলেন না।
নিমতলার আগুনে উত্তর কলকাতা জ্বলছে। গিরিশচন্দ্রের বিবাহ হচ্ছে। বয়েস পনেরো।
তিরিশ বছর বয়সে স্ত্রীবিয়োগ। মৃত্যু গিরিশচন্দ্রের জীবনসাথী। প্রথমে মা,তারপরে
বাবা। মৃত্যু অনুসরণ করে আসছে। মারা গেলেন দ্বিতীয়া ভগিনী কৃষ্ণকামিনী। তার
অল্পদিন পরেই চলে গেলেন অনুজ কানাইলাল। তেইশ বছর যখন বয়েস একমাসের
জন্যে একটি পুত্রসন্তান লাভ। এরপরেই ছোটভাই ক্ষীরোদচন্দ্রের মৃত্যু। কিছুদিন পরেই
আর এক বোনের মৃত্যু। এর পর মৃত্যু হল তাঁর স্ত্রীর। দু হাতে আপ্রাণ সেবা করেও
তাঁকে ধরে রাখা গেল না। গিরিশের জীবন ‘হরি বোল’ ধ্বনির ওপর ভাসমান।
দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন। ভাঙা সংসার আবার গড়ে উঠতে লাগল। দ্বিতীয়া
স্ত্রীর নাম সুরতকুমারী। সিমলার বিখ্যাত মানুষ লালচাঁদ মিত্রের প্রপৌত্রী,বিহারীলাল
মিত্রের বড়মেয়ে। বিয়ের ছ’মাস পরেই গিরিশচন্দ্র আক্রান্ত হলেন বিসূচিকা রোগে।
বাঁচার আশা নেই। মৃত্যু দাঁড়িয়ে শিয়রে। টেনে রাখা মানুষের সাধ্যের বাইরে।
মৃত্যুপথযাত্রী গিরিশচন্দ্র ঘোর-লাগা অবস্থায় দেখছেন, সামনে দাঁড়িয়ে আছেন
অদৃষ্টপূর্ব এক মাতৃমূর্তি। তাঁর সিঁথিতে সিঁদুর, স্নেহপূর্ণ দুটি চোখ, পরে আছেন লাল
কস্তাপেড়ে শাড়ি। সেই মা বলছেন, গিরিশ! এই মহাপ্রসাদটুকু খাও।গিরিশচন্দ্রের
যখন চমক ভাঙল, দেখলেন মুখে সেই স্বাদ লেগে আছে। গিরিশচন্দ্র অলৌকিক
ভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেন। পরে জানতে পারলেন, কে এসেছিলেন দিব্যমূর্তি ধারণ
করে।
বেঁচে উঠলেন বটে, শরীর কিন্তু সারছে না। এদিকে চারিদিকে শত্রু। বন্ধুরাও
শত্রুর মতো আচরণ করছেন। তাঁকে বিধ্বস্ত করতে চাইছেন। এতকাল পুরুষকার
দিয়ে লড়াই করেছেন। আর যে পারা যাচ্ছে না। তাহলে কি দৈবের আশ্রয় নিতেই
হল! কোন দেবতাকে ডাকবেন! নিজের শরীরের জন্যে, বিপন্মুক্তির জন্যে!
মহাদেব। ভুবনের পতি যিনি। তুহি জগত গুরু তুহি পরমেশ্বর/আদি অনাদি
পিনাকধর শঙ্কর।
গিরিশচন্দ্র সর্বব্যাধিহর ‘তারকনাথ মহাদেবের শরণ নিলেন। কেশ-শ্মশ্রু রাখলেন।
শুরু হল নিত্য গঙ্গাস্নান, শিবপূজা আর হবিষ্যান্ন গ্রহণ। মহাদেব হাসলেন নাকি!
এমন কথা বললেন কি? মনে পড়ে গিরিশ, তুমি কী ভাবে আমাকে অপবিত্র করতে
আমি রেগে যাই কি না দেখার জন্যে। তখন শত্রুভাবে পূজা করতে এখন মিত্রভাবে!
দুটোই তোমার পূজা।
এই সময়কালে গিরিশচন্দ্র প্রতিবছর শিবরাত্রি-ব্রত পালন করতেন। তারকেশ্বরে
গিয়ে শিবের মাথায় জল ঢালতেন। বীরভূমের অট্টহাসে গিয়ে তন্ত্রসাধুন করলেন।
মায়ের দর্শন পেলেন নিজের বাড়িতে। কালীঘাটে গিয়ে হাড়িকাঠের কাছে আসন
পেতে মা কালীর উপাসনা করতেন। সিদ্ধাই এল। খাম না খুলেই চিঠি পড়তে

পারতেন। ওষুধ ছাড়াই ইচ্ছাশক্তিব প্রয়োগে অসুখ ভাল করতে পারতেন। সর্বক্ষণ
মুখে মুখে মা, মা রব। থিয়েটারের কর্মীদের বলতেন, মাকে ডাক, শুধু মাকে ডাক।
বাবা তারকনাথের কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘আমার সংশয় ছেদন কর। গুরু ছাড়া
যদি সংশয়চ্ছেদন না হয়, তাহলে তুমি আমার গুরু হও।
দেখতে দেখতে গিরিশচন্দ্র হয়ে উঠলেন এক মহাসাধক। নাটক ও নাট্যরচনা
হল সাধনার অঙ্গ। সাফল্য যেন ছুটে ছুটে এল। নাটক লিখছেন, অভিনয় করছেন,
পরিচালনা করছেন, অভিনয় শেখাচ্ছেন, স্টেজে নাটক নামছে আর হই হই পড়ে
যাচ্ছে। রাতেব পর রাত ‘হাউসফুল’। ‘দক্ষযজ্ঞে’ দক্ষরূপী গিরিশচন্দ্রকে দেখে
দর্শকদের বুক কেঁপে যেত। কলকাতার দর্শক আর সমালোচকরা ছিলেন অতিশয
বোদ্ধা।গিরিশচন্দ্র তাঁদের শ্রদ্ধা করতেন, সম্মান করতেন। নাটকরচনার সময়ে স্মরণ
রাখতেন। অভিনেতা অভিনেত্রীদের সেই ভাবে তৈরি করতেন। সেকালের
সমালোচকরা ভালোকে ভাল বলতে কুণ্ঠিত হতেন না। খারাপ হলে শুইয়ে দিতেন।
‘দক্ষযজ্ঞ’ নাটক দিয়ে উদ্বোধন হল বিনোদিনীর স্টার থিয়েটার। ১৮৮৩, ২১ জুলাই।
বিনোদিনীর নামে নাম হওয়ার কথা ছিল ‘বি-থিয়েটার’। গুর্মুখ রায় সেই জন্যেই টাকা
ঢেলেছিলেন। শেষ মুহূর্তে কয়েকজনের কলা-কৌশলে সে নাম হল না। অভিনয়কে
ভালবেসে বিনোদিনী মেনে নিলেন এই প্রতারণা।
‘দক্ষযজ্ঞ’ কলকাতার রঙ্গমঞ্চে এক হই হই আলোড়ন। প্রথম রাতের অভিনয়
প্রসঙ্গে বিনোদিনী বলছেন, আমি সতী, গিরিশচন্দ্র দক্ষরাজ। স্টেজে ঢুকে আমি ত
ভয়েই মরি! কি লোক, কি লোক লোকারণ্য। খড়খড়ি দেয়ালে লোক সব ঝুলে
ঝুলে বসে আছে। কলকাতার বড় বড় লোক, বড় বড় সমালোচক। আর দক্ষের
ভূমিকায় গিরিশচন্দ্র। পর্বতের মতো ওই বিশাল শরীর, গলায় রাগী সিংহের গর্জন,
চোখে আগুনের ফুলকি ছুটছে। আর সেই সাংঘাতিক সংলাপ; অপমান-মান আছে
যার, ভিখারীর মান কিরে ভিখারিণী? যজ্ঞস্থলে দক্ষ এই বলে মেয়েকে অপমান
করছেন। দর্শকরা শিউরে উঠছেন। সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেবরূপী অমৃতলালের
হাহাকার-‘কে-রে দে-রে সতী দে আমার’। সাত দিন ধরে কলকাতার পথেঘাটে
মানুষের মুখে মুখে দক্ষরাজের সেই সংলাপ-‘অপমান মান আছে যার…….
গিরিশচন্দ্র জানেন না, তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন গুরুর দিকে নয়,
একেবারে পরমগুরুর দিকে। কোন শুভক্ষণে, কোন অদৃশ্য শক্তির আহ্বানে তিনি
রচনা করলেন ‘চৈতন্যলীলা’। ১৮৮৪ সাল, ২ আগস্ট। স্টারে প্রথম অভিনীত হল
‘চৈতন্যলীলা’। চৈতন্যের ভূমিকায় বিনোদিনী। অকল্পনীয় দুঃসাহস। বিনোদিনীর
জীবন এইবার ঘুরে যাবে।অবতার শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপা প্রথমে তিনি পাবেন। রঙ্গালয়ে
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মাথায় হাত রেখে বলবেন, ‘চৈতন্য হোক’। ১৮৮৪ সাল, ২১
সেপ্টেম্বর।গিরিশচন্দ্র পরে বিনোদিনীর আত্মজীবনীর ভূমিকায় লিখলেন, ‘বিনোদিনী

অতি ধন্যা, অনেক পর্বত গহ্বরবাসী এ আশীর্বাদের প্রার্থী।’ পতিতা বিনোদিনী কোন
সাধনায় সেই রাতে এমন কৃপা পেলেন! অভিনয়ের জন্যে সাধনা। ‘অষ্টপ্রহর
গৌরাঙ্গমূর্তি ধ্যানের ফল বিনোদিনীর ফলিয়াছিল।’ গিরিশচন্দ্র লিখছেন, ‘অভিনয়
দর্শনে অনেক ভাবুক এরূপ বিভোর হইয়াছিলেন যে বিনোদিনীর পদধূলি গ্রহণে উৎসুক
হন।’
সে রাতে গিরিশচন্দ্র থিয়েটারের ম্যানেজার। সে রাতে তাঁর জীবনে মনে রাখার
মতো একটি ঘটনাই ঘটেছিল-ঠাকুর ভক্তদের নিয়ে তাঁর থিয়েটারে এসেছেন শুনে,
গিরিশচন্দ্র তাঁকে ‘রিসিভ’ করতে গেলেন। ঠাকুরই তাঁকে প্রথমে প্রণাম করলেন।
গিরিশচন্দ্র প্রতিনমস্কার করলেন! ঠাকুর আবার নমস্কার করলেন। এইভাবে বেশ
কিছুক্ষণ চলল। প্রণামে গিরিশচন্দ্র পরাস্ত হলেন। এই দিনের এই ঘটনা স্মরণ করে
ভক্ত গিরিশ অপূর্ব একটি কথা বলেছিলেন-‘রাম অবতারে ধনুর্বাণ নিয়ে জগৎ
জয় হয়েছিল, কৃষ্ণ অবতারে জয় হয়েছিল বংশীধ্বনিতে, আর রামকৃষ্ণ অবতারে
জয় হবে প্রণামঅস্ত্রে।’ সেই রাতে অভিনয় দর্শনে মতোয়ারা ঠাকুর এক ভক্তের
প্রশ্নের উত্তরে একটি কথাই বলেছিলেন, ‘আসল নকল এক দেখলাম।’ এটি
গিরিশচন্দ্রের তৃতীয় দর্শন।
‘ঢং দেখ, সন্ধ্যা হয়েছে!’
কেশবচন্দ্র সেনের ‘ইন্ডিয়ান মিরারে’ গিরিশচন্দ্র দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেবের কথা
পড়লেন। গিরিশচন্দ্র সবে কলেরা থেকে বেঁচে উঠেছেন। হীন স্বাস্থ্য, চতুর্দিকেবিভ্রান্তি।
তারকেশ্বর মহাদেবের আরাধনা শুরু করেছেন। গুরুর সন্ধান করছেন। সংশয় মেঘ
কাটছে না কিছুতেই। তাই ভাবছেন, ‘ব্রাহ্মরা কি আবার এক পরমহংস খাড়া করেছে।’
এমন সময় একদিন খবর এল তাঁরই পাড়ায় দীননাথ বসুর বাড়িতে পরমহংসদেব
এসেছেন।আচ্ছা দেখা যাক কেমন পরমহংস। গিয়ে দেখলেন,ঠাকুর ধর্মপ্রসঙ্গ করছেন
আর কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ ভক্তগণ পরমানন্দে আস্বাদন করছেন। ক্রমে সন্ধ্যা হল।
একটি সেজ জ্বেলে ঠাকুরের সামনে রাখা হল। ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘সন্ধে হয়েছে?’
গিরিশচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন, ‘ঢং দেখ, সন্ধে হয়েছে!সামনে সেজ জ্বলছে,
সন্ধে হয়েছে কিনা বুঝতে পারছেন না!’ বাড়ি ফিরে এলেন।
‘চল, আর কি দেখবে?’
কয়েক বছর পরে দ্বিতীয় দর্শন। গিরিশচন্দ্র লিখছেন, ‘রামকান্ত বসুর স্ট্রিটস্থ বলরাম
বসুর ভবনে পরমহংসদেব আসিবেন। সাধুত্তম বলরাম তাঁহাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত
পাড়ার অনেককেই নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। আমারও নিমন্ত্রণ হইয়াছিল-দর্শন করিতে

গেলেম। দেখিলাম পরমহংসদেব আসিয়াছেন, বিধু কীর্তনী তাহাকে গান শুনাইবার
জন্য নিকটে আছে। বলরামবাবুর বৈঠকখানায় অনেক লোকসমাগম হইয়াছে।
পরমহংসদেবের আচরণে আমার একটু চমক হইল। আমি জানিতাম যাঁহারা পরমহংস
ও যোগী বলিয়া আপনাকে পরিচয় দেন, তাঁহারা কাহারও সহিত কথা কন না,কাহাকেও
নমস্কার করেন না; তবে কেহ যদি অতি সাধ্যসাধনা করে, পদসেবা করিতে দেন।
এ পরমহংসের ব্যাপার সম্পূর্ণ বিপরীত। অতি দীনভাবে পুনঃ পুনঃ মস্তক ভূমিস্পর্শ
করিয়া নমস্কার করিতেছেন। এক ব্যক্তি, আমার পূর্বের ইয়ার তিনি পরমহংসকেলক্ষ্য
করিয়াব্যঙ্গ করিয়া বলিলেন, ‘বিধু ওঁর পূর্বের আলাপী,তার সঙ্গে রঙ্গ হচ্ছে।’ কথাটা
আমার ভাল লাগিল না। এমন সময় অমৃতবাজার পত্রিকার সুবিখ্যাত সম্পাদক শ্রীযুক্ত
শিশিরকুমার ঘোষ উপস্থিত হইলেন। পরমহংসদেবের প্রতি তাঁহার বিশেষ শ্রদ্ধা বোধ
হইল না। তিনি বলিলেন, ‘চল, আর কি দেখবে?’ আমার ইচ্ছা ছিল, আরও কিছু
দেখি, কিন্তু তিনি জেদ করিয়া আমায় সঙ্গে লইয়া আসিলেন।’
‘না, না, ঢং নয়-ঢং নয়’
গিরিশচন্দ্র চমকে উঠলেন। প্রথম দর্শনের দিন ঢং শব্দটাই মনে ঢংঢং করে উঠেছিল।
মনের কথা শুনলেন কি করে! আবার বলছেন, ‘বাবু আমি ভাল আছি, বাবু আমি
ভাল আছি।’ বলতে বলতেই সমাধিস্থ। গিবিশচন্দ্র সমাধি দেখেননি। ভাবছেন এ কী
অবস্থা! আজকে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা নয়। বোসপাড়ার চৌরাস্তায় একটা
রকে বসেছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, পূর্ব দিক থেকে ঠাকুর ধীর পায়ে হেঁটে আসছেন।
সঙ্গে কয়েকজন ভক্ত। চোখে চোখ পড়তেই পরমহংসদেব গিরিশচন্দ্রকে নমস্কার
করলেন। গিরিশচন্দ্র প্রতিনমস্কার করলেন। ঠাকুর নমস্কার ফেরালেন না। গ্রহণ
করলেন।ঠাকুর গিরিশচন্দ্রের সামনে দিয়েদক্ষিণ দিকের রাস্তায় চলেছেন। গিরিশচন্দ্রের
মনে হল, ‘যেন কিঅজানিত সূত্রের দ্বারা আমার বক্ষস্থল তাঁহার দিকে কে টানিতেছে।
ঠাকুর কিছুটা দূরে এগিয়ে গেছেন। গিরিশচন্দ্রের মনে হচ্ছে, আমিও যাই। এমন
সময় ঠাকুরের সঙ্গের এক ভক্ত এসে বললেন, পরমহংসদেব ডাকছেন।
‘আমি চলিলাম’
আর ফেরা যাবে না গিরিশচন্দ্র ঘোষ। অজগরের পাল্লায় পড়ে গেলেন। বার বার
তিনবারই হয়তো হত। ঠাকুরকে থিয়েটারের বক্সে বসিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন।
শরীর ভাল ছিল না। আসলে বুঝতে পারেননি কে এসেছেন! এই চতুর্থ দর্শন থেকে
শুরু হবে, আপনার শ্রীরামকৃষ্ণের পথে চলা। আবার সেই বলরাম বসুর বাড়িতে।
গিরিশচন্দ্রের আজ ভাল লাগছে। তিনি এক সময় জিজ্ঞেস করলেন, ‘গুরু কী?’ এ-প্রশ্ন

কেন? এই একটি জায়গায় তাঁর মনে একটি প্রতিরোধ বসে আছে। মানুষকে গুরু
করলেই নির্দ্বিধায় বলতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে- গুরুব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুদেবো
মহেশ্বরঃ। গুরুরেব পরংব্রহ্মা তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।। এই মন্ত্রে প্রণাম করতে হবে।
‘সামান্য মানুষকে দেখিয়া ভণ্ডামি কিরূপে করিব!’ এই গোলমাল আরো বাড়িয়ে দিয়ে
গেলেন এক চিত্রকর। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব। তিনি বললেন, ‘আমি রোজ ভগবানকে
ভোগ দিই, তিনি গ্রহণ করেন। কখনো কখনো রুটিতে দাঁতের দাগ থাকে, কিন্তু
উপযুক্ত গুরুর আশ্রয়ে গুরুকৃপা ছাড়া এমন ভাগ্য হয় না।’ এই কথা শুনে ঘরের
দরজা বন্ধ করে গিরিশচন্দ্র কাঁদতে লাগলেন। ঠিক তিন দিনের দিন ঠাকুরের সঙ্গে
এই তাঁর দেখা।
ঠাকুর তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘গুরু কি জান-যেন ঘটক।’ তার পরেই
বললেন, ‘তোমার গুরু হয়ে গেছে।’ গিরিশচন্দ্র তখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘মন্ত্র কী?’
ঠাকুর বললেন, ‘ঈশ্বরের নাম।’ একটি গল্প বললেন। দৃষ্টান্ত। ‘রামানুজ রোজ প্রাতঃস্নান
করতেন। ঘাটের সিঁড়িতে কবীর নামে এক জোলা শুয়েছিল। রামানুজ নামছেন।
কবীরের গায়ে হঠাৎ তাঁর পা ঠেকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কবীরের শরীরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব
জেগে উঠল। তিনি ‘রাম’ শব্দ উচ্চারণ করলেন। আর সেই নাম জপ করেই তিনি
সিদ্ধিলাভ করলেন।’
বড় আনন্দ নিয়ে ফিরে এলেন। দম্ভের খোলস খুলে পড়ে গেল। ‘চূর্ণ-বিচূর্ণ।
থিয়েটারে প্রথমেই তিনি আমাকে প্রণাম করলেন। তারপরে রাস্তায়ও আমায় প্রথম
নমস্কার করলেন। তিনি যে নিরহঙ্কার ব্যক্তি-এ ধারণা আমার জন্মাল। আমার
অহঙ্কারও খর্ব হল।’

‘বিশ্বাস করো’
পঞ্চম দর্শন। কিছু দিন পরে, ১৮৮৪ সাল, ১৪ ডিসেম্বর। স্টারে ‘প্রহ্লাদ চরিত্র’ দেখতে
এসেছেন ঠাকুর। গিরিশচন্দ্রের অহঙ্কারের কাঠামো তখনো দাঁড়িয়ে আছে। দেবেন্দ্রবাবু,.
ঠাকুরের পরম ভক্ত, ছুটে এসে বললেন, পরমহংসদেব এসেছেন, আপনি অভ্যর্থনা
করে আনবেন না। গিরিশের উত্তর ‘আমি না গেলে তিনি আর গাড়ি থেকে নামতে
পারবেন না!’ গিরিশচন্দ্র লিখছেন, ‘কিন্তু গেলাম। আমি পঁহছিয়াছি এমন সময় তিনি
গাড়ি হইতে নামিতেছেন। তাঁহার মুখপদ্ম দেখিয়া আমার পাষাণ-হৃদয়ও গলিল।’
গিরিশচন্দ্রের পাষাণ হৃদয়। সে-হৃদয় গলছে। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন। এই পরম
শান্ত মানুষটিকে আমি অভ্যর্থনা করতে চাইনি। ঠাকুরকে দোতলায় নিয়ে এলেন।
শ্রীচরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন। পরে বহুদিন তাঁর এই মনে হয়েছিল-কেন তিনি

প্রণাম করলেন! একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ তুলে দিলেন ঠাকুরের হাতে। ঠাকুর হাতে
নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ফুলের অধিকার দেবতার আর বাবুদের, আমি কী
করব?’
সেদিন ঠাকুর গিরিশচন্দ্রকে গিরিশচন্দ্রের ভেতরের খবর দিয়েছিলেন, ‘তোমার মনে
বাঁক আছে।’ গিরিশচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যায় কিসে?’ ঠাকুর বললেন, ‘বিশ্বাস করো।’
‘মনের বাঁক যাবে ত!’
ষষ্ঠ দর্শন। মধু রায়ের গলিতে। ঠাকুরের অন্যতম ভক্ত রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে। ‘তখন
সন্ধ্যা হইয়াছে। রামবাবুর উঠানে, রামবাবু খোল বাজাইয়া পরমহংসদেবে নৃত্যের সহিত
সঙ্গত করিতেছেন। ভক্তেরাও তাঁহাকে বেড়িয়া ত্য করিতেছে। গান হইতেছে, নদে
টলমল টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে।’গিরিশের চোখে জল। রামবাবুর আঙিনা
সত্যই যেন টলমল করছে। ঠাকুর সমাধিস্থ হলেন। ভক্তরা প্রণাম করছেন। গিরিশের
খুব ইচ্ছে হচ্ছে। সকলের সামনে প্রণাম করতে লজ্জা করছে। ঠাকুর পবের বেড়ে
নাচতে নাচতে একেবারে গিরিশচন্দ্রের সামনে এসে সমাধিস্থ হলেন। গিরিশচন্দ্রের
চরণ স্পর্শে বাধা রইল না। কীর্তন শেষে সবাই বৈঠকখানায় এসে বসলেন। ঠাকুর
গিরিশচন্দ্রের সঙ্গে কথা বলছেন। গিরিশচন্দ্র পরপর তিনবার প্রশ্ন করলেন, একই
প্রশ্ন-‘আমার মনের বাঁক যাবে তো?’ ঠাকুর একই উত্তর দিলেন তিনবার-‘যাবে’,
‘যাবে’, ‘যাবে’।
অবশেষে দক্ষিণেশ্বরে
সপ্তম দর্শন। গিরিশচন্দ্র দক্ষিণেশ্বরেএলেন। ঠাকুর দক্ষিণ দিকের বারান্দায় একটি কম্বলে
বসে আছেন। আর একটি কম্বলে বসে আছেন ঠাকুরের পরম ভক্ত ভবনাথ।গিরিশচন্দ্র
ঠাকুরের পাদপদ্মে প্রণাম করলেন। মনে মনে ‘গুরুব্রহ্ম’ স্তবটি আবৃত্তি করলেন। ঠাকুর
বসতে বললেন। বললেন, ‘আমি তোমার কথাই বলছিলুম, মাইরি, একে জিজ্ঞাসা
করো।’
গিরিশচন্দ্র বললেন, ‘আমি উপদেশ শুনব না, আমি অনেক উপদেশ লিখেছি।
উপদেশে কিছু হয় না। আপনি যদি আমার কিছু করে দিতে পারেন করুন।’
তখন ঠাকুর বললেন, ‘পর্বতগহ্বরে নির্জনে বসলেও কিছু হয় না, বিশ্বাসই
পদার্থ।’
গিরিশচন্দ্র ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কে?’
গিরিশের কৌতূহল গিরিশের মতো দাস্তিকের মস্তক কার চরণে অবনত হল।

কে তুমি শ্রীরামকৃষ্ণ!
পরমহংসদেব বললেন, ‘আমায় কেউ কেউ বলেন, আমি রামপ্রসাদ, কেউ বলে
রাজা রামকৃষ্ণ, আমি এইখানেই থাকি।’
গিরিশচন্দ্র ভবিষ্যৎ পথ নির্দেশ চাইলেন, ‘আমি আপনাকে দর্শন করেছি, আবার
কি আমায় যা করতে হয়, তাই করতে হবে।’
ঠাকুর বললেন, ‘তা করো না। তাতে কোনো দোষ নেই।’
পরম আশ্রয়দাতা
শ্রীরামকৃষ্ণ কোনো ব্যাপারে গিরিশচন্দ্রকে নিষেধ করতেন না। ঠাকুর বলতেন, ‘না
গো না, ওকে কিছু বলতে হবে না; ও নিজেই সব কাটিয়ে উঠবে। পরে জীবন
স্মৃতিচারণে গিরিশচন্দ্র লিখলেন, ‘এই যে পরম আশ্রয়দাতা, ইঁহার পূজা আমার দ্বারা
হয় নাই। মদ্যপান করিয়া ইঁহাকে গালি দিয়াছি। শ্রীচরণ সেবা করিতে দিয়াছেন-ভাবিয়াছি
এ কি আপদ!’
মদে চুর হয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোড়ার গাড়িতে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন। ঠাকুর সেবক
লাটুমহারাজকে বলছেন, ‘গাড়িতে কিছু ফেলে এল কি না দেখে আয়।’ মাতাল
গিরিশ আর ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ গভীর রাতে পঞ্চবটীতে হাত ধরাধরি করে আনন্দে
হরিনাম আর নৃত্য করছেন।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কাল। ঠাকুরের রথ আসতে আর দেরি নেই। ১৮৮৫,
২৮ জানুয়ারি-ঠাকুর কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে ‘স্টারে’ এসেছেন ‘নিমাইসন্ন্যাস’
দেখতে। গিরিশচন্দ্র দোকান থেকে গরম গরম লুচি ভাজিয়ে আনলেন। ঠাকুরের
সেবা হবে। পালা শেষ হল। ইতিমধ্যে গিরিশচন্দ্র মদ্যপান করেছেন। ঠাকুর দেড়খানা
লুচি খেয়েছেন, হঠাৎ গিরিশচন্দ্র আব্দার ধরলেন, ‘তুমি আমার ছেলে হবে। বল,
জন্মে ত আর তোমার সেবা করতে পারলুম না, আমার ছেলে হলে তোমায়
খুব সেবা করতে পারব।’ ঠাকুরের হাতে ধরা রয়েছে আর আধখানা লুচি, তিনি
অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি কেন তোমার ছেলে হতে যাব গো?’

গিরিশ নেশার ঘোরে ভীষণ রেগে গেলেন। অকথ্য গালাগাল। ঠাকুরের পাশেই
লাটু মহারাজ-‘হামার বড় রাগ হয়েছিলো, হাতে ডাণ্ডা ছিলো, ডাণ্ডা তুলতে যাব
কি দেবেনবাবু হাত চেপে ধরলেন। বললেন, ‘উনি যখন সয়ে যাচ্ছেন, তুমি কেন
ডাণ্ডা তুলছ?’ ঠাকুর কেবল হাসছেন আর বলছেন, ‘এটা কোন্ থাকের ভক্ত রে?
এটা বলে কি?’ গিরিশের মুখের তোড় থামছে না।
দক্ষিণেশ্বরে ফিরবেন। ঠাকুর গাড়িতে উঠেছেন। ভক্তরাও উঠেছেন। গিরিশচন্দ্রও
নেমে এসেছেন পথে। গাড়ির সামনে কর্দমাক্ত রাস্তার ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে তাঁর

পরমহংসদেবকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন। গাড়িতে ঠাকুর লাটুমহারাজকে বললেন,
‘ও কি রে! গিরিশের গায়ে হাতে তুলতে আছে কি? দেখলি নি, এত গালাগালি
দিলে তবু গাড়িতে ওঠবার সময় মাটিতে শুয়ে প্রণাম করলে। ওর কেমন বিশ্বাস
দেখেছিস? মা, ও নেটো (নট) গিরিশ, তোমার মহিমা কি বুঝবে। ওর অপরাধ নিও
নি মা।’
ঈশ্বর ইচ্ছায় এলুম গিরিশ
নরেন্দ্রনাথ সেদিন গিরিশচন্দ্রের পায়ের ধুলো নিয়ে বললেন, ‘ধন্য তোমার বিশ্বাস
ভক্তি!’ পরেব দিনের ঘটনা। ভক্তরা এসে বলছেন, ‘ওটা পাষণ্ড! ওর কাছে আর
যাবেন না।’ এমন সময় রামচন্দ্র দত্ত মশাই এসেছেন। ঠাকুর বলছেন, ‘শুনেছ গো
রাম! দেড়খানা লুচি খাইয়ে গিরিশ কাল আমার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার কবেছে।’
রামবাবু বললেন, ‘কী করবেন? সে তো ভালই করেছে।’
ঠাকুর বলছেন, ‘শোন, শোন, তোমরা সবাই শোন, রাম কি বলে-এর পরে
আমায যদি মারে?’
‘মার খেতে হবে।’
‘সে কি গো! মার খেতে হবে?’
‘হ্যাঁ, শুনুন তাহলে।কালীয়নাগের বিষে রাখাল বালকদের মৃত্যু হল। শ্রীকৃষ্ণ কালীয়
দমন করে নাগকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী কারণে বিষ উদ্গীরণ কর?’ নাগ
বললে, ‘প্রভু, যাকে অমৃত দিয়েছ, সে তাই দিতে পারে, আমায় যে খালি বিষ দিয়েছ,
আমি অমৃত কোথায় পাব!’ গিরিশকে যা দিয়েছেন, সে তাই দিয়ে আপনার পূজা
করেছে। আমাদের বললে মানহানির মামলা করতে কোর্টে দৌড়তুম। আপনি
পতিতপাবন।’
ঠাকুর বললেন, ‘রাম তবে গাড়ি আন।’
বেলা দুটো। ঠাকুরের গাড়ি বেরলো দক্ষিণেশ্বর থেকে।
আজ বুঝেছি তুমি সেই
বোসপাড়ার বাড়িতে গিরিশচন্দ্র। অনুতপ্ত অথচ নিশ্চিন্ত। আহারাদি ত্যাগ করে বসে
আছেন। গিরিশ চণ্ড কিন্তু ভণ্ড নন। বসে বসে প্রহর শুনছেন। হয় শেষ না হয় শুরু।
সকাল থেকে বন্ধুরা এসে উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেছে। হঠাৎ দরজায় ছায়া
পড়ল। সেই মধুর কণ্ঠস্বর-‘গিরিশ-ঈশ্বর ইচ্ছায় এলুম।’
গিরিশচন্দ্র সপাটে ঠাকুরের পায়ে এসে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘আজ
যদি তুমি না আসতে, ঠাকুর, তাহলে বুঝতুম, তুমি এখনো নিন্দাস্তুতিকে সমান জ্ঞান
করতে পারনি-তোমার পরমহংস নামে অধিকার আসেনি-আজ বুঝেছি তুমি সেই,

তুমি সেই। আর আমায় ফাঁকি দিতে পারবে না। এবার আর তোমায় ছাড়ছি না।
বল, তুমি আমার ভার নেবে, আমায় উদ্ধার করবে।
গিরিশচন্দ্রের পদধূলি নিলেন নরেন্দ্রনাথ-‘ধন্য তোমার বিশ্বাস ভক্তি।’
দে তোর বকলমা
তুই যখন কিছুই পারবি না, দে আমাকে ভার দে। বকলমা দে। তোর হয়ে আমিই
সব করব। তুই লোক শিক্ষা দিয়ে যা। ‘গিরিশ ঘোষ, তুই কিছু ভাবিসনে। তোকে
দেখে লোক অবাক হয়ে যাবে।’
শ্রীরামকৃষ্ণপদে প্রথম অঞ্জলি
১৮৮৫, ৬ নভেম্বর। ঠাকুর অসুস্থ। শ্যামপুকুর বাটিতে। চিকিৎসা চলছে। ঠাকুরও
চিকিৎসা চালিয়েছেন। জীবের উদ্ধার। কলকাতার মানুষের চিকিৎসা। এসো, চলে
এসো। অন্ধকারে আলো নিয়ে যাও। নিজেকে প্রকাশ করছেন। ক্যানসার একটি
উপলক্ষ।
কালীপুজোর রাত। পূজার আয়োজন করিয়েছেন ঠাকুর। প্রতিমা নেই। আসনে
ঠাকুর। সামনে গিরিশাদি ভক্তরা। একদিকে নানাবিধ নৈবদ্যে। এমন কি একপাত্র
বার্লি। বার্লি ছাড়া ঠাকুর অন্য কিছু খেতে পারছেন না। স্তূপাকার জবা ফুল।
রক্তকমল। দুদিকে বড় বড় দুটি মোমবাতি। বাড়ি দীপমালায় সজ্জিত। সবই প্রস্তুত।
একটি প্রশ্ন থমকে আছে-কি পূজা, কার পূজা!
সাহসী গিরিশচন্দ্রকে সামনে এগিয়ে দিলেন জনৈক ভক্ত। গিরিশচন্দ্র এসে
বসলেন ঠাকুরের সামনে। ঠাকুর গিরিশচন্দ্রকে শেখাচ্ছেন ‘আজকের এই পূজা’।
কী করবে, কী ভাবে করবে। যা যা বললেন সেই ভাবেই গিরিশচন্দ্র করে করে
আসছেন। হঠাৎ বললেন, ‘তবে চরণে পুষ্পাঞ্জলি দি।’ জয় মা,জয় মা, রক্ত কমল,
রক্তজবা ঠাকুরের পাদপদ্মে দিতে লাগলেন। সাহস পেয়ে অন্যান্য ভক্তরা ফুলে
ফুলে ঢেকে দিলেন শ্রীপাদপদ্ম। আসনে ‘বরাভয়করা’ শ্রীরামকৃষ্ণ কালী।
সেই রাতে গিরিশচন্দ্রের কাছে ঠাকুরের যে প্রশ্নটি ছিল সেটি নিয়ে ঠাকুর চলে
এলেন কাশীপুর উদ্যানবাটিতে।
১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬
কলকাতা সেদিন ছুটির মেজাজে। দুপুর থেকেই ভক্তদের আগমন হচ্ছে কাশীপুর
উদ্যানবাটিতে। রোদ ঝলমলে বাগান। দোতলায় গুরুতর অসুস্থ পরমহংসদেব। তবু
যেন একটা উৎসব। কেউ বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ বসে আছেন গাছের তলায়।

হঠাৎ সবাই অবাক হয়ে দেখছেন উদ্যানের পথ ধরে স্বয়ং ঠাকুর এগিয়ে আসছেন
ধীরে। বস্ত্রাবৃত। মাথায় সবুজ বমাতের কান-ঢাকা টুপি। তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন গাছতলায়
উপবিষ্ট গিরিশচন্দ্রের দিকে। কালীপূজার রাতে যে-প্রশ্নটা এসেছিল, সেই প্রশ্নটা আজ
গিরিশকে করতে হবে। দিনটি হয়ে রইল, চিরকালের একটি ছবি,
শ্রীরামকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে আছেন। গিরিশচন্দ্র পায়ের কাছে বীরাসনে।
হাত জোড়।
‘গিরিশ! আমি কে?’
গিরিশের দুচোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নামছে, ‘প্রভু! আমার বলার ক্ষমতা
নেই। ব্যাস-বাল্মীকিও পারেননি।’
‘তোমার পাঁচসিকে পাঁচ আনা।’ এই ‘চৈতন্যই’ সকলের হোক।

 

Leave a Comment