অপূর্ব মিলন

‘মা! আমি একটি স্তোত্র রচনা করেছি।’
‘কী স্তোত্র? কার স্তোত্র?’
‘মা, আপনার স্তোত্রগীতি।’
‘বাবা, আমার আবার কী স্তোত্র?’
স্বামী অভেদানন্দজী অতি বিনীতভাবে বললেন, ‘মা, আমার রচনা, আমার দর্শন,
কৃপা করে শুনুন।’
মা চমকে উঠেছিলেন, বিস্মিত হয়েছিলেন। তবু শুনছেন। স্থির, ধ্যানস্থ। স্বামী
অভেদানন্দজী হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে লাগলেন তাঁর সেই বিখ্যাত স্তোত্র। ‘প্রকৃতিং
পরমাং’। অভেদানন্দজী যখন পড়ছেন-‘রামকৃষ্ণগতপ্রাণাং’, মা তখন স্পন্দন হীন।
যখন বলছেন, ‘তন্নামশ্রবণপ্রিয়াং’, তখন মায়ের দু-চোখে জলের ধারা। অভেদানন্দজী
বলছেন, ‘তদ্ভাবরঞ্জিতাকারাং’। হঠাৎ অলৌকিক কিছু ঘটে গেল। আসলে মা নেই।
মা সারদার জায়গায় বসে আছেন শ্রীশ্রীঠাকুর। মা রূপান্তরিত হয়েছেন ঠাকুরে।
এরপরে তাঁর মনে হল দৃশ্যে তিনিই নেই। শুধু স্তোত্রটি আছে।
ঘটনাটি ঘটছে ১৮৮৮ সালে বেলুড়ের নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িতে।
মে মাসের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত-প্রায় ছ’মাস মা ওই বাড়িতে
ছিলেন। স্তোত্রটি শুনতে শুনতে মা চলে গিয়েছিলেন অন্য জগতে। সেখানে আলাদা
ভাবে নারী আর পুরুষের অস্তিত্ব নেই। আছে প্রকৃতি আর পুরুষ। শিব আর শক্তি।
যেমন সাধকের সঙ্গীতে আছে-‘তারা পরমেশ্বরী, কখনো পুরুষ কখনো প্রকৃতি।’
মা রূপান্তরিত হলেন। হয়ে গেলেন ঠাকুর। ঠাকুর হয়ে গেলেন মা। সেই আবেশ
মিলিয়ে গেল। স্তোত্রপাঠক এবং শ্রোতা মুখোমুখি। পূর্বে প্রবাহিত গঙ্গা। মা বসে
আছেন, বসে আছেন গোলাপ-মা, যোগীন-মা। মা স্বামী অভেদানন্দজীকে আশীর্বাদ
করলেন, ‘তোমার কণ্ঠে সরস্বতী বসবেন।’

স্তোত্রের প্রথম দুটি চরণ কি!
প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং, নররূপধরাং জনতাপহরাং।
শরণাগতসেবকতোষকরীং, প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্।।
মা তুমি কে? তোমার পরিচয়? তুমি আদ্যাপ্রকৃতি স্বরূপা। তুমি নরদেহ ধারণ
করেছ। কেন করেছ? লোকের দুঃখ হরণ করবে। তারপর? লজ্জাপটাবৃতে নিত্যং
সারদে জ্ঞানদায়িকে। মা জ্ঞানদান করবেন।
কুটো বাঁধা। ঠাকুর চয়ন করে আনলেন জয়রামবাটীর লোকসমাজ থেকে।
ঊনবিংশ শতকের অন্ধকার একটি গ্রাম। মা এসেছিলেন ১৮৫৩ সালের ২২
ডিসেম্বর। দুর্গম একটি পল্লী। কলকাতা থেকে পৌঁছতে প্রায় আড়াইদিন। যাত্রাপথের
বর্ণনা দিচ্ছেন স্বামী বিরজানন্দ। ১৮৯২ সালের অবস্থা। ট্রেনে বর্ধমান। একটি চটিতে
রাত্রিবাস। পরের দিন প্রত্যুষ অন্ধকার থাকতে থাকতে গোযানে যাত্রা। দামোদর পার
হয়ে একটি চটিতে দ্বিপ্রহরে রান্না করে খেয়ে আবার যাত্রা। উচালন চটিতে রাত্রিবাস।
পরের দিন ভোরে যাত্রা শুরু। দ্বারকেশ্বর পার হয়ে দুপুরবেলা কামারপুকুর। কামারপুকুর
থেকে জয়রামবাটীর দূরত্ব প্রায় দু ক্রোশ। মাঠের আল ধরে হাঁটা। পথে পেরতে
হবে আমোদর নদ।
সুদুর গ্রামের সঙ্কীর্ণ পরিমণ্ডল। কৃষি ও ধর্মাশ্রিত জীবন ও সংস্কৃতি। সংস্কার
আর কুসংস্কারের পীঠস্থান। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নয়। রাজনৈতিক,
সামাজিক উভয় অবস্থাই এলোমেলো। মশার উপদ্রব। ম্যালেরিয়া। পরিসুত পানীয়
জলের অভাব। শিক্ষাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। টোল আর পাঠশালা। মেয়েদের
লেখাপড়ার সুযোগ নেই। নিজের জীবনকথা বলতে গিয়ে মা বলছেন, ‘পরিবারের
ছেলেরা সব পাঠশালে যেত। ওদের সঙ্গে কখনও কখনও একটু-আধটু যেতুম।
তাতেই একটু শিখেছিলুম। কামারপুকুরে লক্ষ্মী আর আমি ‘বর্ণপরিচয়’ একটু একটু
পড়তুম। ভাগনে হৃদয় বই কেড়ে নিলে। বললে, মেয়েমানুষের লেখাপড়া শিখতে
নেই, শেষে কি নাটক-নভেল পড়বে?’
চারিদিকে পুরুষদের তর্জন, গর্জন। রমণীকুলের কণ্ঠস্বর শোনাই যায় না। ঠাকুর
মাকে বলেছিলেন, ‘অবলার অবলায় বৃদ্ধি, অবলার অবলায় সিদ্ধি। স্ত্রীলোক ধীর
নম্রভাবে থাকবে লজ্জাই তার ধর্ম; নইলে লোকে তাকে নিন্দা করবে।’ এ যেন
তুলসীদাসজীর কথা;
ভাটকা ভালো বোল্লা চলনা বহুড়ীকে ভালা চুপ্।
ভেকেক ভালা বর্ষা বাদর, অজকে ভালা ধূপ।।
যারা ভাট তারা বহু কথা বলবে, বহু পথ চলবে, সে ভাল; কিন্তু কুলবধূরা
থাকবে চুপচাপ, সেইটিই হবে তাদের শিক্ষা। ব্যাঙের পক্ষে বর্ষাই ভাল, যেমন
ছাগলের পক্ষে গ্রীষ্মের রোদ।

শ্রীযুক্ত গোলাপ-মাকে ঠাকুর একদিন বলছেন, ‘ও সারদা-সরস্বতী-জ্ঞান দিতে
এসেছে।’ পরে আর একদিন বললেন, ‘ও জ্ঞানদায়িনী, মহাবুদ্ধিমতী। ও কি যে
সে! ও আমার শক্তি।’
শক্তিহীন শিব শব। শিব কি করেন, সকল জীবের প্রভু। তাই তাঁর নাম ঈশান।
তিনি ষড়ৈশ্বর্যশালী তাই তিনি ভগবান, দেবগণবন্দিত, তাই মহাদেব। জীবের
কর্মবন্ধন মোচন অতএব তিনি পশুপতি; তাঁর জন্মদাতা বা জন্মদাত্রী কেউ নেই,
সেই কারণে তিনি স্বয়ম্ভু, তিন ঐশ্বর্যের দাতা, তাই তাঁর নাম মহেশ্বর। তাঁর মতো
বৃহৎ আর কেউ নেই, তিনি সর্বপ্রকাশক তাই তিনি ব্রহ্মা।
এই শিবতত্ত্বে পৌঁছতে হলে শক্তির সাহায্য নিতে হবে। সেই কারণেই ঠাকুরের
তন্ত্রসাধন। মা সারদাকে পরীক্ষা করছেন, ‘তুমি কি আমাকে সংসার পথে টেনে
নিতে এসেছ?’ মায়ের বয়স মাত্র উনিশ। মা উত্তর দিলেন, ‘না, না, আমি তোমাকে
সংসার পথে টানতে যাব কেন! তোমার ইষ্টপথে সাহায্য করতে এসেছি।’ এমন
অসাধারণ উত্তর মা কি করে দিলেন! চারটে বছর ধরে গ্রামের মানুষের কাছে বারে
বারে একই আক্ষেপের কথা শুনেছেন, ক্ষেপা স্বামী। সংসার হল না। জীবনটা নষ্ট
হল। ছেলেপুলে হবে না। বাঁজা রমণীর ধর্ম-কর্মে অধিকার নেই। পুজোর জোগাড়
দিতে পারবে না। শ্যামাসুন্দরী! তুমি করলে কি! মেয়েটার সর্বনাশ! মা ত কোনো
উত্তর না দিয়ে ঘোমটাটি সামান্য সরিয়ে অর্থবোধক মৃদু হাসতে পারতেন। প্রায়
চারদিনের হাঁটা পথ, শেষের কিছুটা নৌকোয় পেরিয়ে, জ্বর গায়ে দক্ষিণেশ্বরে
এসেছেন। পিতার সঙ্গে। তন্ত্রসাধন শেষ করে ঠাকুর ভৈরবী মা ও ভাগিনেয় হৃদয়কে
নিয়ে কামারপুকুরে গিয়েছিলেন। একটানা সাত মাস ছিলেন। মা সারদা সংবাদ পেয়ে
চলে এসেছিলেন। মা তখন ষোড়শী। ঠাকুর তাঁকে নিজের শয্যায় শয়নের অধিকার
দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ, আত্মীয়-স্বজন নিশ্চিন্ত। যাক বাবা খেপা মানুষটি সংসারী
হল! শ্রীরামকৃষ্ণকে কে চিনবে? জহুরীই জহর চেনে। বামুনের ছেলে। কলকাতার
এক ধনী কৈবর্ত (আসলে মাহিষ্য), দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার ধারে কালীমন্দির করেছে।
সেই মন্দিরের পুরুত। শ্রীরামকৃষ্ণ বিভূতিসম্পন্ন সিদ্ধ তান্ত্রিক। শ্রীরামকৃষ্ণ গেরুয়া
ধারণ না করলেও ব্রহ্মবিৎ সন্ন্যাসী। তাঁর ঘন ঘন সমাধি হয়। গ্রামের মানুষ,
আত্মীয়-স্বজন এ-সবের কী বোঝেন! তাঁরা বোঝেন কলাটা-মূলোটা। ভৈরবীও
বুঝতে পারলেন না। চোখের সামনে যোষিৎ সঙ্গে শিষ্যের পতন দেখতে পারবেন
না বলে কামারপুকুর ছেড়ে চলে গেলেন অনিশ্চিত গন্তব্যে।
শাস্ত্রবিদ, জ্ঞানী তন্ত্রসিদ্ধ সন্ন্যাসিনী ভৈরবী তাঁর একনম্বর শিষ্যকে কেন ভুল
বুঝলেন! তন্ত্রসাধনকালে শ্রীরামকৃষ্ণের অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি বিমুগ্ধা হয়েছিলেন।
তাঁরই উদ্যোগে বিচারসভা বসল। একবাক্যে সিদ্ধান্ত হল শ্রীরামকৃষ্ণ অবতার। আবার
এও বললেন, এবার ‘নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব।’ তাঁর হলটা কী? বিশ্রী

একটা কাণ্ড ঘটিয়ে, অপমানিত ও প্রহৃত হয়ে তিনি অদৃশ্য হলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ নীরব
দর্শক। তাঁর সামনে তিন রমণী-মা, গুরু ও স্ত্রী। তিনজনই নারী। সব ছত্রাকার হল
কেন! পরিমণ্ডল রইল না কেন? ঈর্ষা। ইংরেজি করতেই হবে, কারণ এটি মনস্তত্ত্বের
বিষয়। ইংরেজিটি হল, Gender jelousy। এই পরিস্থিতিতে ঠাকুরের সন্ন্যাস গুরু
থাকলে অবশ্যই অন্যরকম ব্যবহার করতেন। তিনি ত বলেইছিলেন, বিবাহ করেছ
ত কী হয়েছে! মুখের কথা নয়, সত্যই তুমি সংযমী হতে পেরেছ কি না বাস্তবে
তার পরীক্ষা হবে। রমণীর সঙ্গে থাকে না করে রমণ।
স্বামী গম্ভীরানন্দজী লিখছেন, ‘শ্রীমায়ের ভৈবরীর প্রতি শ্রদ্ধার অভাব না
থাকিলেও তাঁহার সহিত ঠাকুরের সহজ মিলনকে ভৈরবী কতকটা ঈর্ষার চক্ষে
দেখিতে লাগলেন। বহু পরিবারেই বধূ ও শ্বশ্রুর এই অবাঞ্ছিত সম্বন্ধ পারিবারিক
জীবনকে বিষময় করিয়া তোলে।’ ঈর্ষা কেন? শ্রীরামকৃষ্ণ আমার সম্পত্তি। আমার
অধিকার। সে অধিকারে হাত দেওয়া চলবে না। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সহধর্মিনীকে আদর্শ
রমণী করতে চান; কারণ তিনি পরবর্তীকালে আদর্শ নারী তৈরি করবেন, যাঁরা স্বামী,
পুত্র, কন্যা,শ্বশুর, শাশুড়িকে নিয়ে সুখে সংসার জীবন যাপন করবেন। স্বামী এবং
স্ত্রী উভয়ের মধ্যে সহমর্মিতা না থাকলে, ত্যাগ ও ভালবাসা না থাকলে তা সম্ভব
নয়। ঠাকুর জীবনে যা করেছেন সবই শিক্ষার জন্যে। উদাহরণ। এই ঘটনায় মা
শিখলেন ঈর্ষা ভাল নয়, অধিকারবোধের সীমা থাকা চাই। কর্তৃত্ববোধ ক্ষতিকারক।
মা দেখলেন, মা বুঝলেন। এটাও বুঝলেন, ঠাকুরের ওপর কতটা তাঁর অধিকার।
পরে ঠাকুরের মুখে শুনবেন, ঈশ্বর সবেতেই আছেন, ঈশ্বরে কিছু নেই। তাঁর স্বামী
স্বয়ং ভগবান। দক্ষিণেশ্বরের জীবনে যা ঘটবে তা হল, দু’জনের অবস্থানের ব্যবধান
মাত্র পঞ্চাশ হাত, তবু কখনো কখনো ছ’মাসেও হয়ত একদিন দেখা নেই। অথচ
পরস্পরের ওপর পরস্পরের কি নির্ভরতা! মা বলছেন, ‘কখনো কখনো হয়ত
দু’মাসেও একদিন ঠাকুরের দেখা পেতুম না। মনকে বোঝাতুম, মন, তুই কি এমন
ভাগ্য করেছিস যে রোজ ওঁর দর্শন পাবি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দরমার বেড়ার ফাঁক
দিয়ে কীর্তনের আখর শুনতুম, পায়ে বাত ধরে গেল।’ তিনি বলতেন, ‘বুনো পাখি
খাঁচায় রাতদিন রাখলে বেতে যায়, মাঝে মাঝে বেড়াতে যাবে।’ রাত চারটেয়
নাইতুম। দিনের বেলা বৈকালে সিঁড়িতে একটু রোদ পড়ত, তাহলে চুল শুকাতুম।
তখ মাথায় অনেক চুল ছিল। (বয়স তখন উনিশ। ঠাকুরের বয়স সাঁইত্রিশ)
নহবতের নিচের একটুখানি ঘর, তা আবার জিনিসপত্রে ভরা।’ এ কি! এ যে বন্দী
নারীর চিত্র। ঠাকুর নিজেই বলছেন, খাঁচার পাখি। এ বন্ধন নয়, মনের মুক্তির পথ।
সাধু হব, গৃহ ছাড়ব বললে, ঠাকুর বলতেন, কোথায় ঘুরে ঘুরে মরবে, পথে পথে
ভিক্ষে করবে। গৃহদুর্গে বসেই ত ভাল সাধন করা যায়। মনটা ঈশ্বরকে দিয়ে রাখা।
বহুদকের বদলে কুটিচক হও। পাখির মা ডিমে তা দেয়। ফুটে বেরোয় বাচ্চা। ভগবান

শ্রীরামকৃষ্ণ সাধনার তাপে তাঁর নিজের নারীরূপ তৈরি করছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের
শক্তি। পাওয়ার হাউস। সেই সময় নহবতের দেয়ালে আঙুল ঠেকালে, আঙুলে
ছ্যাঁকা লাগত। অন্ধকারে আলো ছাড়াই আলোকিত-সারদালোক। শ্রীরামকৃষ্ণের
আলোর রিফ্লেকটার মা সারদা। ঠাকুর একটি ঘট ভরছিলেন। মা বলছেন আনন্দের
পূর্ণঘট আমার মধ্যে বসিয়ে দিয়ে গেছেন।
কামারপুকুরের শয্যা তান্ত্রিক ঠাকুরের সাধন-ভূমি। তোতাপুরীর সাধনের
পরীক্ষাভূমি। গীতার জ্ঞানযোগ, সর্বানি ইন্দ্রিয় কর্মাণি প্রাণকর্মাণি চাপরে/আত্মসংযম
যোগ অগ্নৌ জুহূতি জ্ঞানদীপিতে।। কামারপুকুরের শয্যা উভয়ের যজ্ঞস্থল-নির্বিশেষ
ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে জীবাত্মাকে নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে আহুতিদান। সংযম-অগ্নি সাতটি মাস
জ্বলে রইল। বাইবেলের Song of solomon-এ আছে, Set me as a scal
upon thy heart, as a seal upon they arm, for love is strong as death.
স্বামীজী ত সব দেখে, শুনে, বুঝে, সঙ্গ করে একটি কথাই সোনার অক্ষরে লি
গেলেন-Love personified. মা সারদা ঠাকুরের সংসার। ঘটি, বাটি,কাঁথা, কম্বল
নয়। শুধু মা। বিষয়ও মা নির্বিষয়ও মা। গৌরী মা একেবারে পাশে থেকে দেখেছেন,
বলছেন, দু-জনে ভাবই ছিল কত! একবার মায়ের মাথা ধরল। ঠাকুরের কী উদ্বেগ!
বার বার রামলাল দাদাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ‘ওরে রামলাল মাথা ধরল
কেন!’ রামকৃষ্ণ সাধন সরোবরে একটি পদ্ম। তার পাশে একটি কুঁড়ি। সেই কুঁড়িটিকে
ফোটাতে হবে। আবার সাজাতেও হবে। সারদা সাজতে ভালবাসে। গয়না গড়িয়ে
দিলেন। কত চিন্তা! একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিকেলে কখানা রুটি খাও?’ মা
লজ্জায় মাটিতে মিশে গেলেন, খাবার কথা কী করে বলেন! এদিকে বিরতি নেই
ঠাকুরের প্রশ্নের। তখন তিনি বললেন, ‘এই পাঁচ, ছখানা খাই।’ এই প্রশ্নের ত্যাগে
প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমার ক-টাকা হলে হাত-খরচ চলে?’ মা বলেছিলেন, ‘এই
পাঁচ-ছ টাকা।’ পাঁচ-ছখানা রুটি! ঠাকুর মনে মনে কি হিসেব করলেন, করে বললেন,
‘তাহলে পাঁচ-ছ-টাকায় তোমার খুব চলে যাবে।’ এর পরে শ্রীরামকৃষ্ণ কী করলেন!
বলরামবাবুর কাছে পরিমাণমতো কিছু টাকা গচ্ছিত করে দিলেন। বলরামবাবু ওই
টাকা তাঁর জমিদারিতে খাটিয়ে ছ’মাস অন্তর তিরিশ টাকা সুদ শ্রীমাকে পাঠিয়ে
দিতেন। একালের পরিভাষায় ঠাকুর একটি বন্ড কিনলেন। বছরে যার সুদ বারো
টাকা।
কামারপুকুরে সাত মাস কিশোরী সারদা, (বয়েস ১৫) গুরুগৃহে বাস করে
গেলেন। ঠাকুরের শিক্ষা, প্রদীপের সলতেটি কীভাবে রাখতে হবে, বাড়ির প্রত্যেকে
কে কেমন লোক, কার সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করতে হবে। গৃহস্থালির যাবতীয়
কাজকর্ম কীভাবে করা উচিত, দেব-দ্বিজ-অতিথিসেবা, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা,
কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহপরায়ণতা, সেবা। শেখালেন উচ্চ ধর্মজীবন লাভের জন্যে

চরিত্রগঠন। শেখালেন-যখন যেমন তখন তেমন, যেখানে যেমন সেখানে তেমন,
যাহাকে যেমন তাহাকে তেমন। এই নীতির ওপর নির্ভর করে লোকব্যবহার,
পরিবারে প্রত্যেকের রুচি. স্বভাব ও প্রয়োজন অনুযায়ী তার সঙ্গে আদানপ্রদান।
নৌকো অথবা গাড়িতে যাবার সময় জিনিসপত্র সম্পর্কে সতর্কতা। এই সব
উপদেশের সঙ্গে যুক্ত হল ওজন, কীর্তন, ধ্যান। সমাধি ও ব্রহ্মজ্ঞানের কথা।
মা বলছেন, এই সময় থেকে কেবলই অনুভব করতুম হৃদয়মাঝে আনন্দের পূর্ণঘট
স্থাপিত রয়েছে। আদর্শ নারীজীবন গঠনের এই হল ‘সিলেবাস’। ঠাকুর মাকে শেখালেন,
মনেতেই সব, মনেই শুদ্ধ, মনেই অশুদ্ধ। মানুষ নিজের মনটি আগে দোষী করে
নিয়ে তবে পরের দোষ দেখে।
‘এ আর কী করেছে? তোমাকে এর অনেক বেশি করতে হবে।’ সেইভাবেই ঠাকুর
তাঁর শক্তির দিব্য আধার মা-সারদাকে গঠন করার উদ্যোগ নিলেন। মা হবেন
‘নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটার’। স্বামীজীব জ্যান্ত দুর্গা। মহা সন্ধিপূজার জন্যে সকলকে
কোমর বাঁধতে বলছেন। স্বামীজী যেন অগ্নি উদ্ীরণ করছেন-‘ভায়া যীশুখ্রীষ্টকে
জেলে-মালায় ভগবান বলেছিল। পণ্ডিতেরা মেরে ফেললে, বুদ্ধকে বেনে-রাখাল
তাঁর জীবদ্দশায় মেনেছিল। রামকৃষ্ণকে জীবদ্দশায় নাইনটিস্থ সেঞ্চুরির শেষভাগে
ইউনিভার্সিটির ভূত, ব্রহ্মদত্যিরা ঈশ্বর বলে পূজা করেছে। হাজাব হাজার বৎসর
পূর্বে তাঁদের (কৃষ্ণ, বুদ্ধ, খ্রীষ্ট) দু-দশটি কথা পুঁথিতে আছে মাত্র। ‘যার সঙ্গে ঘর
করিনি, সেই ঘর ঘরণী এ যে আজন্ম দিনরাত্রি সঙ্গ করেও তাঁদের চেয়ে ঢের বড়
ব’লে বোধ হয়, এই ব্যাপারটা কি বুঝতে পারো ভায়া?’ এর পরেই স্বামীজী
বলছেন-‘মা ঠাকরুন কি বস্তু বুঝতে পারোনি, ক্রমে পারবে।’ স্বামীজী বলছেন,
‘শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না।’ স্বামীজী শক্তি আর মহাশক্তি দুটি শব্দ ব্যবহার
করেছেন। ঠাকুরের শক্তি মা সারদা। মা এসেছেন মহাশক্তি জাগাতে। সমস্ত
ব্যাপারের একটা শেষ পরিণতি থাকে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘এন্ড রেজাল্ট’। ঠাকুর
এলেন, মা এলেন। ঠাকুর সরে এলেন বুদ্ধিজীবীদের ‘থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক’ মনন কেন্দ্রে।
স্বামীজী যাঁদের বলছেন ইউনিভার্সিটির ভূত ব্রহ্মদত্যি। এসে দেখছেন সমাজ
ঝ্যাটাবার কাজ শুরু হয়েছে। যে সমাজ নারীজীবনের বুকের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে
আছে। স্বামীর চিতায় সতীকে বেঁধে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। মহা পুণ্য।
জীবন্ত দগ্ধ কন্যা স্বর্গবাস করবেন-কত বছর-না মানুষের দেহে যত রোমকূপ আছে
তত বছর। কোথায় পেলেন এই বৃত্তান্ত অপূর্ব। পরাশর সংহিতায়। সাড়ে তিন কোটি
লোম আছে মানবদেহে-তাবৎকাল বস্যে স্বর্গে ভর্তারং সানুগচ্ছতি।রামমোহন রায়
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় বউদি অলকমঞ্জরী তাঁর দাদার চিতা প্রদক্ষিণ
করছেন। এক পুরোহিত একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে
ভাল ভাল কথা বলছেন। অলকমঞ্জরী চিতায় উঠছেন। নির্দেশ এল স্বামীর মাথা কোলে

তুলে দাও। জগমোহনের মাথাটি কোলে তুলে নাও। এইবার সতীর হাতে একটি
আম্রপল্লব ধরিয়ে দাও। অলকমঞ্জরী মরতে ভয় পেও না। সাড়ে তিন কোটি বছর
স্বামীর সঙ্গে স্বর্গবাস। মুখে হাসি আন। পল্লবটি নাড়াতে থাক। দাও আগুন, বাজাও
বাজনা। রামমোহন বউদির চিতা ছুঁয়ে শপথ নিলেন ‘তোমাদের আমি দেখে নেব।’
শ্রীরামকৃষ্ণ এই আগুন থেকে আর একটি আগুন সরিয়ে আনলেন। যে আগুন
বাইরে দেখা যায় না। মৃদু-মন্দ সেই আঁচে চিরকাল ঘরে ঘরে নারীরা দগ্ধ হয় এবং
হবে। সেই আগুনের যত স্ফুলিঙ্গে যত রকমের অপরাধ। চড়া সভ্যতার চওড়া
পুরুষরা নারীর আধুনিক নাম দেবে সেক্স। সভ্যতার ইতিহাস একটা ‘ওয়াটার শেড’
বা আল খুঁজে পেয়েছে। সর্ব অর্থে স্বাধীন নারীরা কেমন করে পুরুষের লোফালুফির
বস্তু হল। আদিমানব যবে থেকে শিকার ছেড়ে কৃষিতে প্রবেশ করল। জমি, জরু
আর গরু পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল অস্ত্র, শস্ত্র, অশ্ব, গজ,
যুদ্ধ। শুধু রাজ্য জয় নয়। সোনা-দানা লুণ্ঠনের সঙ্গে সঙ্গে লুণ্ঠিত হল নারী। তৈরি
হল হারেম। নারী ব্যক্তি ভোগ্যা। নারী রাজভোগ্যা। এল বাই নাচ, সুরাপান।
পাশাপাশি দেহ ব্যবসা। বধূ হবেন বার বধূ। আর এক ধরনের সতীদাহ ব্রতের রূপ
নিল জহরব্রত। ইজ্জত রক্ষার জন্যে আগুনে ঝাঁপ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, আমি পুরুষদের দিকটা দেখছি। সারদা, তুমি মাথায় ঘোমটা
টেনে নিঃশব্দে নারীদের দিকে ঢুকে যাও। নারীর জগৎ তোমার জগৎ। নারীর ওই
অপবাদ ঘোচাও, ‘দিনকা মোহিনী রাতকা বাঘিনী।’ মা হয়ে অনেক অনেক মা তৈরি
কর। অনেক মায়ের শক্তি একত্রিত হয়ে মহাশক্তি হবে। জ্যান্ত দুর্গা। মহাদুর্গা মহা
সরস্বতী। মহাকালী। তরতাজা, সত্যনিষ্ঠ, ত্যাগী যুবক চাই। নারীত্বের মহিমায়
অভিষিক্ত নারী চাই। নরেন্দ্রনাথের স্বপ্নের ভারত তৈরির কাজে লাগবে। সারদা
তুমি মা হয়ে ঢুকে পড় পরিবারে পরিবারে। উঁচু দিকে যাও, নিচু দিকে যাও। ফিরিয়ে
দাও নারীর লুণ্ঠিত সম্পদ। বুঝিয়ে দাও নারী অবলা নয়, সবলা। শক্তি নিয়ে খেলা।
সাবধান। বিদ্যাশক্তি চাই। তা না হলে ভাঙবে। গড়বে না কিছুই। সংসার হল স্টেপিং
স্টোন। ভাঙা সংসার থেকে ভাঙা ছাঁচ থেকে ত্রিভঙ্গ সন্তান বেরোয়।
বিদ্যাসাগর বেরিয়ে এলেন বাল্য বিধবাদের চোখের জল মোছাতে। কাশী ভর,
বৃন্দাবন ভর-চলবে না। মায়েদের ধর্মের নামে জাঙ্কইয়ার্ডে পাঠানো চলবে না।
পরোক্ষ পাপ ব্যবসার মদত দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের
জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘পুণ্যনামা বেণ্টিঙ্কের বহু চেষ্টায় ভারতে
অবলাজাতির জীবন্ত চিতানল নির্বাপিত হইল বটে,তৎপরিবর্তে তুষানলের সৃষ্টি
হইল। দুষ্কর ব্রহ্মাচর্য আসিয়া পূর্ণমাত্রায় সতীদাহের স্থান অধিকার করিল। অনল
আকারান্তর প্রাপ্ত হইয়া দেহের পরিবর্তে হৃদয় দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিল। বালিকা,
বৈধব্যের সূচনা হইতে জীবনের শেষদিন, রেণু রেণু করিয়া দগ্ধ হইতে লাগিল।

সতীদাহ একদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত ব্যাপার শেষ হইত, এ আর চীর জীবনেও
ফুরায় না।
রামমোহন বউদির চিতার সামনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, হিন্দুধর্মের শাস্ত্রকার
পণ্ডিতদের উল্লাস তিনি বন্ধ করবেন, বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্কের সহযোগিতায় সতীদাহ
বন্ধ হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্রও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বিধবাদের পুনর্বিবাহ তিনি সম্ভব
করবেন।
শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি মহাশয় ঈশ্বরচন্দ্র যখন বেদান্ত শ্রেণীর ছাত্র, সেই সময় তাঁর
অধ্যাপক ছিলেন। একেবারে স্থবির। স্থান, আহার, আচমান, শৌচ, সবই করিয়ে
দিতে হয়। ঈশ্বরচন্দ্র দুহাতে তাঁর সেবা করতেন। অধ্যাপক মহাশয় ঈশ্বরচন্দ্রকে
পুত্রাধিক স্নেহ করতেন। বাচস্পতিমশাই ছাতুবাবু লাটুবাবুদের সভাপণ্ডিত ছিলেন। তাঁরা
পরামর্শ দিলেন। বাচস্পতিমশাই আপনি আবার দার পরিগ্রহ করুন। ঈশ্বরচন্দ্রের পরামর্শ
ছাড়া বাচস্পতিমশাই কিছু করতেন না। তিনি এই ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। ঈশ্বরচন্দ্র
তীব্র ভাষায় বললেন, ‘আজ বাদে কাল আপনি মারা যাবেন। বিয়ে করে একটি নিরপরাধ
বালিকাকে চিরদুঃখিনী করবেন না। এ এক মহাপাপ।’ তিনি শুনলেন না।
ছাতুবাবু-লাটুবাবু আর নড়াইলের প্রসিদ্ধ জমিদার বাবু রামরতন রায়ের উদ্যোগে
বারাসতবাসী এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের পরমাসুন্দরী বালিকার সঙ্গে বাচস্পতি মশাইয়ের
বিবাহ হল।
একদিন বাচস্পতিমশাই ঈশ্বরচন্দ্রকে বললেন, ‘ঈশ্বর, তোমার মাকে একদিনও
দেখতে গেলে না!’ অধ্যাপক মহাশয় একদিন জোর করে ঈশ্বরচন্দ্রকে সংস্কৃত কলেজ
থেকে নিজের বাড়িতে ধরে নিয়ে গেলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বালিকার পায়ের কাছে দুটি টাকা
রেখে উদ্দেশে প্রণাম করে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন। অধ্যাপক মহাশয় হাত চেপে
ধরলেন। দাসীকে নববধূর অবগুণ্ঠন উন্মোচন করতে বললেন। সেই মুখ দর্শন করে
ঈশ্বরচন্দ্র হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। বাচস্পতিমশাই ‘অকল্যাণ করিস না
রে’-বলে ঈশ্বরচন্দ্রকে বৈঠকখানায় নিয়ে এলেন। প্রচুর শাস্ত্রীয় উপদেশ দিয়ে ছাত্রকে
শান্ত করার চেষ্টা করলেন, তারপর বললেন, বাবা! একটু মিষ্টিমুখ কর! ঈশ্বরচন্দ্র
বললেন, ‘এ ভিটায় আর কখনো জলস্পর্শ করব না।’ এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই
বাচস্পতি মহাশয় মারা গেলেন।
‘বাল্য বৈধব্যের’ ভয়ঙ্কর চিত্র যুবক ঈশ্বরচন্দ্রকে ভয়ঙ্কর বিচলিত করেছিল।
ছাত্রাবস্থায় দেশের বাড়িতে গিয়ে, বিধবা কন্যাদের হৃদয়বিদারক কাহিনী শুনতেন। একই
পরিবারে পিতা মাতা, ভাই-ভাইয়ের স্ত্রীরা পরিপূর্ণ ভোগের জীবন যাপন করছে।
বিধবা কন্যাটি উপবাসে শীর্ণ।হিন্দুশাস্ত্রের বিধি-বিধানে নিষ্পেষিত। সামান্য পদস্খলনে
গর্ভবতী কন্যা পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র লিখছেন-‘রাক্ষসী গৃহিণী সুতিকা-গৃহে
স্বহস্তে সেই নিরপরাধ শিশুকে টিপিয়া মারিয়া ফেলিল।’

দায়ী কে? বাচস্পতি মহাশয়দের ন্যায় শ্রদ্ধেয় অপরিণামদর্শী কিছু ব্রাহ্মণ।
বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ কণ্ঠে গলকম্বলের মতো ঝুলছে। হৃদয়ে পাষাণ। সুপ্রবীণ পিতা
নিজের অল্পবয়স্কা বিধবা কন্যার বৈধব্যানুষ্ঠানের বিষাদরাশির মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয়
পক্ষের বালিকা পত্নীকে পাইয়া পরম সুখে কালযাপন করিতেছেন। কোমলপ্রাণা
কন্যা ও ভগিনীকে ব্রহ্মচর্য শিক্ষা দিবার ব্যবস্থা কি এইরূপই হইবে।
ঈশ্বরচন্দ্র শাস্ত্র-সমুদ্র মন্থন করে যা খুঁজছেন তা পেয়ে অধীর আনন্দে চিৎকার
করে উঠলেন, ‘পেয়েছি পেয়েছি।’ স্থান, সংস্কৃত কলেজের পুস্তকাগার। সময়
শেষরাত। এই সময় ঈশ্বরচন্দ্র আহার-নিদ্রা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন,
‘শাস্ত্রার্থ উদ্ধার করা, বোধহয় রাবণের প্রহরিবেষ্টিত অশোককাননবাসিনী সীতার
উদ্ধারসাধন অপেক্ষাও গুরুতর ব্যাপার।’ সবে ভোর হচ্ছে। গ্রন্থাগারের জানলা গলে
ভোরের আলো এসেছে। কীটদষ্ট পুঁথির পাতা থেকে ঈশ্বরচন্দ্র সেই শ্লোকটি তুলে
নিচ্ছেন, যে-যুদ্ধ শুরু করতে চলেছেন, সেই যুদ্ধের অস্ত্র। পুঁথিটির নাম ‘পরাশর
সংহিতা’। ভারতচূড়ামণি মহাত্মা ব্যাসদেব পরাশর সংহিতাকেই কলিযুগের সহজ
ধর্মপালনের প্রধান সহায় বলে গেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র পরাশর সংহিতায় এই মন্ত্রটি
পেলেন, ‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ। পঞ্চস্বাপৎসু নারীনাং পতিনাং
পতিরন্যো বিধীয়তে।’ ১৮৫৩ সালে ঈশ্বরচন্দ্র প্রকাশ করলেন ‘বিধবা বিবাহ’।
ঐতিহাসিক লিখছেন, ‘উক্ত গ্রন্থ প্রচার করিবামাত্র ভারতবর্ষের সবত্র অগ্নিকাণ্ড
উপস্থিত হইল। সৈন্যসহ নেপোলিয়নের বিচরণে সমগ্র ইউরোপ যেমন বিপর্যস্ত
হইয়া পড়িয়াছিল, সমগ্র ভারতবর্ষও সেইরূপ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই সংস্কার
সংগ্রামে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিল।’
এই ১৮৫৩ সালের, ২২ ডিসেম্বর মা সারদা পৃথিবীতে এলেন। আর ১৭ বছরের
ঠাকুর এলেন কলকাতার ঝামাপুকুরে, দাদার হতে ধরে। ইংরেজের ইংরিজি শাসন
বহাল হয়েছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত নতুন এক কালবিভাগ করে গেছেন-প্রথম,
বৈদিকযুগ। দ্বিতীয়, মহাকাব্য যুগ। তৃতীয়, দার্শনিক যুগ। চতুর্থ, বৌদ্ধযুগ। পঞ্চম,
পৌরাণিক যুগ। ষষ্ঠ, রামমোহন রায় যুগ। রামমোহন বর্তমান যুগের জন্মদাতা।
১৮২৩ সালে রামমোহন রায় লর্ড আমহার্স্টকে যে চিঠি লেখেন তাকেই ‘এই নবযুগের
প্রথম সামরিক শঙ্খধ্বনি মনে করা যাইতে পারে।’ রামমোহন লিখলেন, আপনারা
সেই ব্যবস্থা করুন cmploying European gentlemen of talent and
education to instruct the natives of India in Mathematics, Natural
Philosophy, Chemistry, Anatomy and other useful sciences,
which the natives of Europe have carried to a degree of perfection
that has raised them above the inhabitants of other parts ofthe world.
ডেভিড হেয়ার, স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট আর রামমোহন রায় এই তিজ্জনের

উৎসাহে হিন্দুকলেজ স্থাপিত হল। সংস্কৃত কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর হিন্দু কলেজের নামে
নিখাত হল ১৮২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। একটা জাগরণের সূচনা। অচলতায়
সচলতা। একদিকে পাথর সরানোর কাজ, অন্যদিকে প্রস্রবণ উন্মোচনের কাজ। আধুনিক
ধারায় শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন, অন্যদিকে কুসংস্কারের চক্রান্ত থেকে জাতিকে উদ্ধার।
আমরা এই কালকে বলছি ‘রেনেসাঁ।’ আর একভাবে বলতে পারি, ‘ইয়ারস অফ
লাইটনিং ডে অফ ড্রামস’। দামামা বেজেছে। যুক্তি তেড়ে আসছে সংস্কারের দিকে।
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। স্বামীর চিতায় স্ত্রীকে কেন পুড়িয়ে মারা হবে। কেন বালবিধবারা
শুষ্ক কণ্ঠে ভূমিতে ছটফট করবে। ওধারে কচি পাঁঠার গা-মাখা ঝোল। এদিকে নির্জলা
উপবাস। মেয়েরা কেন লেখাপড়া শিখতে পারবে না। পূজার জোগাড করতে পারবে,
পুরোহিত হতে পারবে না। ওঁঙ্কারে অধিকাব নেই। পুরুষের তৈবি শাস্ত্রে মেয়েদের
শাসন। সব চুরমার করে দাও।
শ্রীরামকৃষ্ণ কম্পমান কলকাতায়। মা সারদা শান্ত জয়রামাবটীতে। মা এসবের
সঙ্গে তাঁরা কেউই সেভাবে জড়িত নন।কিন্তু কী হচ্ছিল তখন। ঝোড়ো বাতাস বইছিল
কীভাবে। ভারতের জাতীয়তাবাদ প্রকাশিত হচ্ছিল কীভাবে? ‘১৮২৮ সালেব্রাহ্মসমাজের
উদ্ভব অগ্রসর হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের নবোম্মেষিত জাতীয় চেতনার ধর্মীয় রূপ।’ জোড়াসাঁকোয়
চিৎপুর রোডের উপর রামলোচন বসুর একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে রামমোহন রায় স্থাপন
করনে উপাসনা সভা। সাল, ১৮২৮, ৬ ভাদ্র। প্রথমে নাম হল ‘ব্রহ্মসমাজ’, পরে
পবিচিত হল ‘ব্রাহ্মসমাজ’। ঠাকুর পৃথিবীর মঞ্চে প্রবেশ করছেন আরও আট বছর
পরে। আর ১৮৭৫, ১৫ মার্চ বেলঘরিয়ায় জয়গোপাল সেনের বাগানবাড়িতে কেশবচন্দ্র
সেনের সঙ্গে তাঁর দেখা হবে। ২৮ মার্চ কেশবচন্দ্র ‘ইন্ডিয়ান মিররে’ তাঁর সম্পর্কে
লিখবেন। ‘দর্শন করিয়াছি। তাঁহার জ্ঞানের গভীরতা তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি ও অন্তরের সরলতা
দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। তাঁহার কথার মাঝে ব্যবহৃত নিরবচ্ছিন্ন উপমা ও রূপক যেমন
সুসঙ্গত তেমনি সুন্দর।’
১৮৫৫ সালের ৩১মে, রানী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে প্রতিষ্ঠা করলেন মা ভবতারিণীর
মন্দির। দাদার সঙ্গে ঠাকুর এলেন দক্ষিণেশ্বরে। দাদা পুরোহিত,ঠাকুর হলেন মায়ের
বেশকারী। দাদা রামকুমারের স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি। কেনারাম ভট্টাচার্যের কাছে
শক্তিমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে ঠাকুর হলেন পূজারী। ১৮৫৬ সালে রামকুমারের পরলোক
গমন। ঠাকুরের দিব্যোন্মাদ অবস্থা।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ, ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে শুরু হল সিপাহী মঙ্গলপাণ্ডের
বিদ্রোহ। ৮ এপ্রিল তড়িঘড়ি মঙ্গলপাণ্ডেকে ফাঁসি দেওয়া হল। ১০ মে শুরু হল
সিপাহী বিদ্রোহ। ১১ আগস্ট খবর এল কলকাতা আক্রান্ত হতে পারে। আচার্য
কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বিপিনবিহারী গুপ্তকে বলেছিলেন, ‘তোমরা জান না বোধহয়
যে এই বিধবা বিবাহ প্রচলন সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম কারণ। শুধু দাঁত দিয়ে

টোটা কাটা নয়, বিধবাদের বিয়ে দিয়ে ইংরেজ হিন্দুদের সর্বনাশ করছে এইরকম
একটা রব উঠেছিল।’ কলকাতায় ‘সাজ সাজ রব’। প্রায় সব সরকারী বাড়িতে সৈন্য
মোতায়েন করা হয়েছে। সংস্কৃত কলেজের বাড়ি সৈন্যবাহিনীর হাতে তুলে দিতে বলা
হয় অধ্যক্ষ ঈশ্বরচন্দ্রকে। তারিখ ১১ আগস্ট, ১৮৫৭ সাল। ঈশ্বরচন্দ্র আপত্তি জানিয়ে
চিঠি দিলেন। ১৩ তারিখে কলকাতায় এলেন সেনাপতি স্যার কলিন ক্যাম্পবেল।
১৭ তারিখে ভাইসরয় ঈশ্বরচন্দ্রের ১১ তারিখের চিঠির উত্তরে জানালেন, কলেজের
বাড়ি সাময়িক অধিগ্রহণের নির্দেশ তিনিই জারি করেছেন; অতএব কালবিলম্ব না করে
ঈশ্বরচন্দ্র যেন বাড়ি গ্যারিসন কম্যান্ডারের হাতে তুলে দেন।
কলকাতার এমত উদ্বেল সময়ে কলকাতা থেকে মাত্র সাত মাইল দূরে দক্ষিণেশ্বরে
শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসা চলছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, তিনি উন্মাদ হয়েছেন।
চিকিৎসা করেন কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ। জয়রামবাটীতে সারদা মায়ের বয়স মাত্র
চারবছর। হঠাৎ খবর এল বিদ্রোহী সিপাহীরা কলকাতা আক্রমণ করতে আসছে।
উত্তরভারত বিদ্রোহীদের দখলে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফৈজাবাদের মৌলবী, বিধুরের
নানাসাহেব, ঝাঁসির রানী, নানাসাহেবের সেনাপতি তাঁতিয়া টোপী। বিদ্রোহীদের
দখলে দিল্লি। বাহাদুর শাকে আবার সিংহাসনে বসানো হয়েছে।
খবর এল এইবার কলকাতা। বহু ইংরেজ কেল্লার ভেতরে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইংরাজ ফিরিঙ্গি দেশীয় খ্রিস্টানরা সদা সর্বদা অস্ত্র নিয়ে ঘুরছেন। সন্ধের পর
বাজার-দোকান সব বন্ধ। রাস্তাঘাট জনশূন্য। বিদ্রোহীরা এগিয়ে এসেছে। ভারত
আবার স্বাধীন হবে।
‘মা দেখা দে!’ পঞ্চবটীর কান্না। ‘শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দে মা। আমরা অমৃতের
সন্তান।’ সংঘাতের স্বাধীনতা নয়। জীবকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই,
যেখানে ‘পরাধীনতা’ শব্দটি অচল। আত্মার স্বাধীনতা। ‘দেখা দে। দেখিয়ে দে।’
সেনাপতি শ্রীরামকৃষ্ণ। ‘ওয়ান ম্যান ব্রিগেড।’ পঞ্চবটীর ক্যান্টনমেন্টে। কাঁধে বাঁশ
নিয়ে মার্চ করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ‘আয় মা সাধন সমরে।’ বিপরীত মেরুতে কেশবচন্দ্র
নবীন উদ্যমে সাধন শুরু করেছেন। ব্রহ্মকে অঙ্গভূষণ নয় অন্তর্ভূষণ করতে হবে।
ব্রহ্মকে লাভ না করে ব্রাহ্ম হওয়া যায় না। একজন পাথরকে জাগাবার জন্যে পাথরে
মাথা ঠুকছেন, আর একজন সাকারে বসে নিরাকারের হাত ধরতে চাইছেন। চারপাশ
দিয়ে মহাকলরবে বয়ে চলেছে জগৎ স্রোত। শক্তির সংঘাত।
আদিকে ব্রহ্ম, অনাদিতে ব্রহ্ম। শক্তির স্ফুট এই জগৎ দৃশ্য। বৃহৎ আমির ইচ্ছায়
বুদ্বুদ ফুটছে ফাটছে। শক্তির সন্ধান, ধারণ, বিতরণ। আত্মশক্তির পাওয়ার হাউসের
ঢাকনা খুলতে হবে। স্বচক্ষে দেখতে হবে-ব্রহ্মের চৈতন্যে জগৎ কেমনভাবে আছে।
ওদিকে সমাজ সংস্কার, আন্দোলন চলছে চলুক। এদিকে খুলে দেওয়া যাক
আত্মজাগরণের পথ। পৃথিবী যত বড়ই হোক, অনন্তের আকাশে ছোট্ট একটি বিন্দু।

অসীমের দৃষ্টিতে তাকালে ‘আছে কি নেই।’ শ্রীরামকৃষ্ণ হঠাৎ খুঁজে পেলেন সেই
সেতু পথ। ‘এই আছি এই নেই।’নিজের সম্পর্কে রসিকতা করে বললেন, ‘দিনের
মধ্যে সাতবার বাঁচে।’
শ্রীরামকৃষ্ণ একটা শক্তিকুণ্ড তৈরি করতে চাইলেন। করলেনও। কেউ পরাধীন
নয়। সবাই স্বাধীন। আত্মার কোনো বন্ধন নেই। তুমি তোমার মন দিয়ে নিজেকে
বেঁধেছ। মায়ার বন্ধন, মোহের বন্ধন, ভয়ের বন্ধন। কিসের পাপ, কিসের পুণ্য।
নেই, নেই বোলো না। বলো আছে আছে। আমি নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত। চিদানন্দ
সিন্ধু তীরে আমার অবস্থান। যেথা বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দ ধারা।
শ্রীরামকৃষ্ণ বেছে নিলেন ভাবান্দোলনের পথ। তুমিও এসো, তুমিও এসো।
কল্পনার চোখে বেশ দেখতে পাই, একটা গাড়ি চলছে কালের পথ ধরে, যে পথ
চলে গেছে যুগ থেকে যুগান্তরে। চালকের আসনে স্বামী বিবেকানন্দ। পেছনের
আসনের ডান দিকে শ্রীরামকৃষ্ণ, বাঁ দিকে মা সারদা। মুখ দুটি বেরিয়ে আছে।
লোকারণ্য জনপদের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলেছে। প্রেমধন বিলায় গোরা রায়।’ এই
গানটি গাইছেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসের এক দুপুরে
নরেন্দ্রনাথ, শরৎমহারাজ আর শশীমহারাজ হেদুয়ায় বসে আছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে
নরেন্দ্রনাথের পিতৃবিয়োগ হয়েছে। নরেন্দ্রনাথ তখন রামকৃষ্ণময়। প্রেমের নিগড়ে
বাঁধা পড়েছেন। নরেন্দ্রনাথ গাইছেন-‘প্রেমধন বিলায় গোরা রায়। গান শেষ হল।
গভীর ভাবস্থ নরেন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে বলছেন, ‘সত্য সত্যই বিলাচ্ছেন। প্রেম বল,
ভক্তি বল, জ্ঞান বল, মুক্তি বল, গোরা রায়, যাকে যা ইচ্ছা তাকে তাই-ই বিলাচ্ছেন।
কি অদ্ভুত শক্তি।’
পেছনের আসন থেকে মা সারদা চালক নরেন্দ্রনাথকে বলছেন, ‘নরেন চলো,
ঠাকুরকে নিয়ে আমরা আমেরিকা যাই।’

Leave a Comment